কুদ্দুস বহু কষ্টে একদলা থুথু ফেলে বলল, পাঁচটা টাকা দেন বাকের ভাই। পকেট খালি।
বাকের দশ টাকার নোট দিয়ে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেল। এখন বাজছে আটটা। সাধারণত আটটার দিকে কম্পাউন্ডওয়ালা বাড়িতে লোকজন আসে। আজও আসবে হয়ত। কারা আসছে লক্ষ্য রাখা দরকার।
গেটের কাছে জোবেদ আলি দাঁড়িয়ে আছে। বাকেরকে দেখে সে আড়ালে সরে গোল
বাকের উঁচু গলায় ডাকল, এই যে ভাই আছেন কেমন?
ভাল।
ঘর অন্ধকার কেন? লোকজন নাই?
দাওয়াতে গেছে।
দাওয়াত কোথায়?
জানি না কোথায়? এত সব জিজ্ঞেস করেন কেন?
এক পাড়ায় থাকি। খুঁজে-খবর নিতে হয়। নেন সিগারেট নেন।
বাকের সিগারেটের প্যাকেট হাতে এগিয়ে এল। জোবেদ আলি বলল–আমি সিগারেট খাই না। কথাটা সত্যি নয়। উটের মত মুখের এই লোকটিকে দেখেছি খেতে। ভাম কোথাকার!
মাঝে-মধ্যে সিগারেট টানতে দেখি।
জোবেদ আলি গম্ভীর হয়ে গেল। বাকের তার গভীর মুখ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল, মেয়েরা ভর্তি হয়েছে কলেজে?
কি বললেন?
মেয়েরা কলেজে ভর্তি হয়নি? আপনি বলছিলেন ভর্তি হবে।
জানি না কিছু।
বোধ হয় হয়নি। কোথাও তো যেতে-টোতে দেখি না। আচ্ছা ভাই যাই, বিরক্ত করলাম। খাবেন একটা সিগারেট?
না।
বাকের চলে গেল রিহার্সেল দেখতে। নাটকের নাম রাতের পাখিরা। নাম শুনেই মনে হচ্ছে বাজে মাল। টিপু সুলতানটা নামালে হয়, তা না। সামাজিক নাটক। টিপু সুলতানে অনেক শেখার জিনিস ছিল। দেখলে মনটা অন্য রকম হয়। তা না রুন্দিামাল রাতের পাখি।
বাকেরকে দেখে একটা সাড়া পড়ে গেল। বাকের ভাইকে বসতে দে। চায়ের কথা বলে আয়। নাটকটির পরিচালকের নাম বদরুল আলম। বয়স চল্লিশেরর মতো। এই পাড়ায় যে কটি নাটক হয়েছে তার প্রতিটিতে সে পাগল কিংবা পাগলীর ভূমিকায় অভিনয় করেছে। এই একটি অভিনয় সে নিখুঁত করে। রাতের পাখিরা সে একটা চরিত্র আছে যে শুধু অমাবস্যার রাতে পাগল হয়ে যায়। পাগল হলেই পাগলামির ফাঁকে ফাঁকে সে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে। উচ্চমার্গের ফিলসফি।
বদরুল আলম নাটক বন্ধ রেখে বাকেরের কাছে এসে দাঁড়াল। গলা নামিয়ে বলল, আপনার সাথে একটা কথা ছিল। একটু বাইরে আসুন বাকের ভাই।
কি ব্যাপার?
জামান সাহেব আমাকে বলেছেন নাটক-ফাটক বাদ দিতে।
কেন?
তার দোকানের বিকিকিনির নাকি অসুবিধা হয়।
অসুবিধা কি? আপনি ছাড়াও তো আরেকজন কর্মচারী আছে।
এটাই একটু বলে দেবেন।
দেব বলে দেব। নাটক হচ্ছে কেমন?
ভাল। এক নম্বর; ফাসিক্লাস জিনিস হবে বাকের ভাই।
বদরুল আলমের চোখ চকচক করতে লাগল। নাটকের ব্যাপারে তার উৎসাহ সীমাহীন।
আসুন বাকের ভাই, রিহার্সেল দেখুন। থার্ড সিনটা দেখাই আপনাকে। মারাত্মক সিন।
না চলে যাই।
চলে গেলে হবে না। থার্ড সিনটা দেখতেই হবে।
থার্ড সিনে দরিদ্র স্কুল মাস্টার বাড়ি ফিরে দেখে তার ছোট মেয়ে মারা যাচ্ছে। সে ছুটে যায় ডাক্তারের খোঁজে। ডাক্তার একজনকে পাওযা যায়। কিন্তু সে ভিজিটের টাকা না নিয়ে যেতে রাজি না। মাস্টার বহু কাকুতি-মিনতি করল কোন লাভ হল না। সে আবার ফিরে গেল। ঘরে। চিৎকার করে বলল, কোথায় আমার নয়নের মণি। কেউ জবাব দিল না। কারণ নয়নের মণি মারা গেছে। মাস্টার চেঁচিয়ে বলতে লাগল? হায় টাকা, হায় রে টাকা।
বাকের মুগ্ধ হয়ে গেল। তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। গলা ভার ভার হয়ে গেল। দুঃখের সিন দেখলেই তার এ রকম হয়। চোখে পানি এসে যায়। নাটক দেখতে দেখতে তার ইচ্ছা! করছিল থাবড়া দিয়ে ডাক্তার হারামজাদাটার দাঁত ফেলে দিতো। শুয়োরের বাচ্চা। মানুষ মারা যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল নাই। টাকা আর টাকা। দেশটার হচ্ছে কি?
সে আবার কম্পাউন্ড ওয়ালা বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। বাড়ি অন্ধকার। শুধু সিঁড়ির বাতি জ্বলছে। এরা কখন ফেরে লক্ষ্য রাখা দরকার। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। মাথা ধরেছে।
বাকের ভাই!
বাকের চমকে তাকাল। ইউনুস মিয়া। সিগারেটের টাকা পায় বোধ হয়। নানান দিকে বাকি পরে গেছে।
কি খবর ইউনুস মিয়া?
সিদ্দিক সাহেবের বাড়িতে একজন ভাড়াটে যে থাকে তার জিনিসপত্র সব টেনে তুলে বাইরে ফেলে দিচ্ছে।
আমি কি করব? সিদ্দিক সাহেব। আর তার ভাড়াটে মামলার।
তা তো ঠিকই। বাচ্চারা কান্নাটি করছে দেখে মনটা খারাপ হল।
কথা কথায় মন খারাপ হলে সংসার চলে না। এই জিনিসটা মনে রাখবেন। আর শোনেন,
আপনি টাকা-পয়সা কিছু পান নাকি?
জি।
সামনের মাসে দিব। এখন একটু অসুবিধা আছে।
জি আচ্ছা ঐটা কোন ব্যাপার না। যখন ইচ্ছা দিবেন।
বাকের ঘরের দিকে রওনা হল। রাত নটার মতো বাজে। খেয়ে-দোয়ে শুয়ে পড়তে হবে। শরীরটা জুত লাগছে না। আরেকটু দেরি কবে গেলে ভাল হত ভাই-ভাবীরা খেয়ে শুয়ে পড়ত। কারো মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা থাকত না। এখন যাওয়া মানেই ভাবীর সামনে পড়ে যাওয়া। যদি তাদের খাওয়া না হয়ে থাকে তাহলে এক সঙ্গে খেতে হবে; ভাইয়া বসবে ঠিক তার সামনের চেয়ারটায়। একটি কথাও বলবে না। একবার তাকাবেও না। নিজেকে মনে হবে চোরের মত। গলা দিয়ে ভাত নামতে চাইবে না। বারবার পানি খেতে হবে।
বাকেরদের বাড়ির সামনের বারান্দায় একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। বাকেরকে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন। বাকের তাকে চিনতে পারল না। ত্রিশ-পযত্ৰিশ বছরের রোগা কিছু মেয়েরা আসে প্রাযাই। যাদের মুখ দেখলেই মনে হয় এরা বাড়িতে প্রচুর ঝগড়া করে কর্কশ গলায় ছেলে।পুলেদের ধমকায। এবং এদের অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে।
