উনি কি বকুলের বিয়ের কথা বলতে এসেছিলেন?
বুঝলি কি করে?
আন্দাজ করলাম। ডাক্তার ছেলে?
হুঁ।
তুমি কি বললে?
আমি না-ই করে দিয়েছি। বলেছি মেয়ের বয়স খুবই কম। পড়াশোনা করছে। এখন তুই ভেবে দেখ। তুই যা বলবি তাই। আসল গার্জেন হলি তুই।
মুনা হাই তুলে বলল, বিয়ে দিয়ে দাও।
শওকত সাহেব বুঝতে পারলেন না এটা কি সে ঠাট্টা করে বলছে না। সত্যি সত্যি বলছে। তিনি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন।
বিয়ে হয়ে যাওয়াটাই ভাল।
কেন? ভাল কেন?
বকুল হচ্ছে বউ টাইপ মেয়ে। বিয়ের জন্যে মনে মনে সে তৈরি হয়েছে।
কি বলছিস তুই!
ঠিকই বলছি। ছেলেটাও ভাল। দেখি তো প্রায়ই।
তুই ভালমত চিন্তা করে তারপর বল। ফন্ট করে হ্যাঁ বলার দরকার কি? এমন কোন তাড়া তো নেই।
চিন্তা করেই বলছি। ওরা নিজেরা আগ্রহ করে আসছে সেটা দেখা দরকার। এ রকম আগ্রহ নিয়ে বকুলের জন্যে খুব বেশি ছেলে আসবে না।
আসবে না বেন? বকুল কী দেখতে খারাপ?
খারাপ হবে কেন? বকুলের মতো রূপসী মেয়ে কমই আছে। কিন্তু বিয়ে-টিয়ের ব্যাপার শুধু মেয়েটাকে কেউ দেখে না। সব কিছু মিলিয়ে দেখে। বিয়ে কোন আলাপ হলেই সবাই জানাবে তুমি চুরির দায়ে এক সময় জেলে গিয়েছিলে। চোরের মেয়েদের ভাল বিয়ে হয় না।
শওকত সাহেব মুখ কালো করে ফেললেন। এ রকম কঠিন একটা কথা মুনা এমন স্বাভাবিক ভাবে বলল? মুখে এতটুকু আটকাল না।
বিয়ে দিয়ে দাও মামা; বকুলের ঐ ছেলেকে খুবই পছন্দ।
ওর পছন্দের কথাটা আসছে কেন?
আসবে না কেন? নিশ্চয়ই আসবে। বিয়েটা তো সেই করছে।
পছন্দ করবার জন্যে ছেলেকে সে পেল কোথায়?
পেয়েছে যে ভাবেই হোক। সেটা আমাদের দেখার ব্যাপার না। মামা, আমি উঠলাম।
বোস, আরেকটু বোস।
না মামা, আমার শরীরটা ভাল লাগছে না।
বকুল আড়চোখে মুনার দিকে তাকিয়ে আবার নিজের বইপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যেন পৃথিবীর কোনো দিকে তার দৃষ্টি নেই। বাবু বসেছে তার উল্টো দিকে। সে পড়ছে চেঁচিয়ে। মুনা শুয়ে পড়ল। বাবু বলল, আপা আমরা বসার ঘরে গিয়ে পড়ব? বাতি নিভিয়ে দেব এ ঘরের?
এত সকাল সকাল শুয়ে পড়লে যে আপা?
এমনি, ভাল লাগছে না।
মাথায় হাত বুলিয়ে দেব?
না লাগবে না।
বকুল এবং বাবু বাতি নিভিয়ে বসার ঘরে চলে গেল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আবার এ ঘরে চলে এল। ঘর অন্ধকার। বারান্দা থেকে আলো এসে তেরছা ভাবে মুনার গায়ে পড়েছে। সেই আলোর জন্যেই হোক বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক মুনাকে খুব অসহায় লাগছে। বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, আপা ঘুমিয়ে পড়েছ?
না।
বসি একটু তোমার পাশে?
বোস।
বকুল মাথার কাছে বসল। বেশ কিছু সময় দুজনের কেউ কোনো সাড়াশব্দ করল না। এক সময় বাবু এসে উঁকি দিল।
আপা তোমরা এমন চুপচাপ বসে আছ কেন?
মুনা হালকা গলায় বলল, ইচ্ছে করলে তুইও এসে বোস। বাবু এল না। চলে গেল এবং আবার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান পড়তে লাগল। মুনা বলল–হঠাৎ এমন চেঁচিয়ে পড়া ধরেছে কেন বল তো? এ রকম মাইক লাগিয়ে কেউ পড়ে? বুকল হেসে ফেলল। মুনার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ওদের কোন স্যার নাকি চেঁচিয়ে পড়তে বলেছেন। এতে নাকি পড়া তাড়াতাড়ি মুখস্থ হয়।
তোর পড়া কেমন হচ্ছে রে বকুল?
হচ্ছে।
ভালমত পড়। বিয়ে যদি হয় তারপরও পড়াশোনা চালিয়ে যাবি।
বিয়ের কথা উঠল। কেন?
ভাল করেই জানিস কেন উঠল। তুই তো আড়ি পেতে শুনছিলি।
বকুল চুপ করে গেল। মুনা হালকা গলায় বলল, অল্প বয়সে বিয়েটা খারাপ না। মন কোমল থাকে। সংসারের খারাপ দিকগুলি চোখে পড়ে না।
তুমি হঠাৎ এমন কথা বলছ কেন আপা? আগে তো এ রকম বলতে না।
মানুষ তো সব সময় এক রকম থাকে না।
তুমি বদলে যাচ্ছ আপা।
হ্যাঁ বদলে যাচ্ছি। বয়স হচ্ছে। খুঁজে দেখলে দু’একটা পাকা চুলও বোধ হয় পাবি।
বকুল নিচু গলায় বলল, আপা তুমি কাঁদছ?
কি বলছিস পাগলের মত? কাঁদব কেন শুধু শুধু?
তোমার গলাটা অন্য রকম শুনাল।
অন্য রকম মানে?
কেমন যেন ভারী ভারী। কান্না চেপে রাখলে যেমন লাগে।
মনে হচ্ছে খুব কান্না বিশারদ হয়ে গেছিস।
মুনা নিচু গলায় হাসল। বকুলও হেসে ফেলল।
বকুল এক কাপ চা বানিয়ে আন তো। মাথা ধরেছে। আদা থাকলে আদা দিস। না থাকলে লিকার চা। আর দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে যা। আলো চোখে লাগছে।
বকুল চা বানিয়ে ফিরে এসে, একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। মুনা ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। কান্নার দমকে সে বারবার কেঁপে উঠছে। মুখে শাড়ির আঁচল গুঁজে সে কান্না চেপে রাখবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। বকুল হতভম্ব হয়ে দরজার পাশেই দাঁড়িয়েই রইল। একবার শুধু বলল, চা এনেছি আপা। মুনা কিছুই বলল না। বকুল নিজেও তার চোখ মুছতে লাগল। কাউকে কাঁদতে দেখলেই তার কান্না পায়। সে ভাঙা গলায় ডাকল, আপা।
কি?
তোমার কি হয়েছে আমাকে বলবে? কিছুই হয়নি। তুই এ ঘর থেকে যা। চায়ের কাপ টেবিলের উপরে রেখে চলে যা।
বাকের একটা মোটর সাইকেল জোগাড় করেছে
বাকের একটা মোটর সাইকেল জোগাড় করেছে।
মটর সাইকেলটা মজিদের। তাকে বলেছে–দশ মিনিটের জন্যে দে তো গুলিস্তান যাব। আর আসব। মজিদ কিছুক্ষণ গাইগুই করলেও শেষটায় বিরসমুখে চাবি দিয়েছে। সেটা মঙ্গলবারের কথা। আজ হচ্ছে বৃহস্পতিবার। এর মধ্যে মজিদ। দশবারের মত বাকেরের বাসায় এসেছে। নোট লিখে গেছে। জলিলের চায়ের দোকানে খবর দিয়েছে কোন লাভ হয়নি। বাকেরের কোন হদিস নেই।
মোটর সাইকেল জিনিসটা বাকেরের বেশ পছন্দ। কেনা সম্ভব নয়। এক সঙ্গে এতটা টাকা তার হাতে আসে না। ভাগ্যক্রমে মজিদেয় জিনিসটা যখন সঙ্গে আছে যত দূর সম্ভব ব্যবহার করা যাক। এর মধ্যে পেছনের একটা ল্যাম্প ভেঙে চুরমার। এটা ঠিক না করে মজিদের জিনিস তার কাছে ফেরত দেয়াও এক ঝামেলা। সে ল্যাম্প সারাতে দুশ টাকার মত লাগে। এও আরেক যন্ত্রণা। দুশ টাকা তার সাথে নেই। ইয়াদের কাছে চাওয়া যায়। কিন্তু ঐ শালা খচ্চরের কাছে যেতে ইচ্ছা করছে না।
