আম্মা ঝামেলা করতাছে।
গেট খুলে দে।
ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে মধুর গলায় বললেন, এস বাবা। এস। নতুন লোক, কার সঙ্গে কি ব্যবহার করতে হয় জানে না। বাকের খাতির-যত্বের বহরে হকচকিয়ে গেল।
বসার ঘরটি সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালে তিনটা জলরঙ ছবি। ঝুলন্ত হ্যাংগারের অর্কিড। নিচু নিচু সোফা। তরমুজ আকৃতির ছটা বাতি রুপালি শিকলে ঝুলছে।
বাবা, তোমাকে তো চিনতে পারলাম না।
আমার নাম বাকের।
ও আচ্ছা। জোবেদ আলী বলেছে তোমার কথা।
নতুন এসেছেন। খোঁজ-খবর নিতে আসলাম।
ভাল করেছি। খুব ভাল করেছ। মেয়েগুলিকে নিয়ে একা একা থাকি। বস বাবা কি খাবে?
কিছু খাব না।
তা কি হয়? প্রথম এসেছি।
তিনি নিজেই উঠে গিয়ে মিষ্টি নিয়ে এলেন। রুপোর গ্রাসে পানি। কিন্তু মেয়েগুলি আসছে না, উকি-কুঁকিও দিচ্ছে না।
তুমি করে বলছি। রাগ হচ্ছে না তো।
জি না।
জোদেব আলী বলছিল, তোমরা নাকি নাটক করছ?
জি একটা হচ্ছে।
কি নাম নাটকের?
নাম ঠিক হয় নাই।
নাটক তো খুব খরচান্ত ব্যাপার। টাকা-পয়সা জোগাড় হচ্ছে কীভাবে?
চাঁদা তুলে। সবাই দিচ্ছে।
কই আমার কাছে তো তোমরা কেউ আসনি?
বাকের অত্যন্ত অস্বস্তির সঙ্গে সন্দেহে ভেঙে মুখে দিল। সুন্দর একটা গন্ধ সন্দেশে। বাকের কান খাড়া করে রাখল। যদি ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়। কোনো রকম সাড়াশব্দ নেই।
বাকের উঠে আসার সময় ভদ্রমহিলা তাকে এক হাজার টাকা দিলেন নাটকের খরচের জন্য। বাকেরের মুখ শক্ত হয়ে গেল। রহস্য পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।
আবার এস বাবা।
জি আসব।
নাটকে আমার খুব সখ্য ছিল। এখন কিছুই নেই।
বেরুবার সময় দারোয়ান সালাম দিয়ে গেট খুলে দিল। বাকের এই প্রথম দেখল মেয়ে তিনটি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে তাকে। তার দিকে চোখ পড়তেই দু’টি মেয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। বেটেটা শুধু দাঁড়িয়ে রইল। এদের কারো নাম জানা হল না। জিজ্ঞেস করা দরকার ছিল।
দারোয়ান গেটে তালা লাগাচ্ছে। বাকের ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল, মেয়েগুলির নাম কী জান? দারোয়ান এমন ভাবে তাকিয়ে রইল যেন প্রশ্নটা বুঝতে পারছে না।
নাম জান না ওদের?
জি না।
কী ডাক?
বড় আফা, ছোট আফা, মাইঝা আফা।
ও আচ্ছা।
বেঁটে মেয়েটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। বাকের গেটের কাছে দাঁড়িয়েই সিগারেট ধরাল। এই সিগারেটটা সে এখানে দাঁড়িয়েই শেষ করবে। দেখবে মেয়েটা কি করে। মেয়েটি ভেতরে ঢুকে গেল। শুধু দারোয়ান গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে।
আমার নাম ফজলু
শওকত সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।
আমার নাম ফজলু। ফজলুর রহমান।
আমি আপনাদের পাশেই থাকি। ঐ যে লাল দালানটা। লোহার গেট। গেটের পেছনে কামিনি ফুলের গাছ আছে। আমি আগেও কয়েকবার এসেছি আপনার বাসায়।
শওকত সাহেব খুব লজ্জা পেলেন। একই পাড়ায় পাশাপাশি থেকে চিনতে না পারাটা লজ্জার ব্যাপার। এক সময় সবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এখন একেবারেই নেই। অফিসে যান। অফিস থেকে ফিরে এসে বারান্দায় বসে থাকেন। এ রকম হয়ে যাচ্ছেন্ন কেন?
আমার স্ত্রীর সঙ্গে বকুলের খুব ভাব। ওরা প্রায়ই গল্পগুজব করে। আমার স্ত্রীর নাম হচ্ছে টিনা।
ও আচ্ছা। বসুন্ন ভাই বসুন। বয়স হয়ে গেছে কিছু মনে থাকে না।
আমাকে নাম ধরে ডাকবেন। বকুল আমার স্ত্রীকে টিনা ভাবী ডাকে। আমি বলতে গেলে আপনার ছেলের মত। বকুলের সঙ্গে আমার ভাই সম্পর্ক।
তাই নাকি?
জি। কাজেই আপনিও যদি ভাই ডাকেন তাহলে ঝামেলা হয়ে যাবে। সম্পর্কটা ঠিক থাকা দরকার।
ফজলু উঁচু গলায় হাসতে লাগল। শওকত সাহেব অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। কি কথাবার্তা চালাবেন? কথা বলতে ইচ্ছাও হচ্ছে না। ক্লান্তি লাগছে। শরীর ভাল না, শুয়ে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছে। তার আবার মনে হল বয়স হয়ে গেছে। তিনি দ্রুত বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন।
আপনি বসুন আমি বকুলকে ডেকে দিচ্ছি।
ওকে ডাকার দরকার নেই। আমি আপনার সঙ্গেই কথা বলতে এসেছি। দরকারে এসেছি।
একটা দরকারি কথা বলব।
বলুন।
তার আগে এক কাপ চা খাব। বাসা থেকে চা না খেয়ে বেরিয়েছি। টিনা বলল, তুমি চাচার সঙ্গে কথাটা সেরে এসেই চা খাও। আমি ভাবলাম মন্দ কি!
শওকত সাহেব চিন্তিত মুখে চায়ের কথা বলে এলেন। তার সাথে এমন কি কথা থাকতে পারে? পাড়ার কোনো ব্যাপার কি? হতে পারে। মাঝে মাঝে হঠাৎ দু’একজন মানুষ এসে পাড়া দরদী হয়ে যায়। ক্লাবট্রিাব করে। একবার কি একটা পরিচ্ছন্ন কমিটি হল। তিনি হলেন সেই কমিটির মেম্বার। সপ্তাহখানিক এর-ওর বাড়িতে চা খাওয়া ছাড়া সেই কমিটি কিছু করেনি। একদিনের জন্যে একজন মেথর ভাড়া করে এনেছিল সে ঘণ্টা তিনেক কোদাল দিয়ে নর্দমা নাড়াচাড়া করে কুড়ি টাকা নিয়ে ভোগে গেল। পরিচ্ছন্ন কমিটিরও সমাপ্তি।
আমি বকুলের বিয়ের একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
শওকত সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। ইতস্তত করে বললেন, বকুলের বিয়ে? আমি তো ঠিক…
আগে সবটা শুনে নিন। তারপর আপনার যা বলার বলবেন। আমি এবং আমার স্ত্রী দু’জনই বকুলকে খুব পছন্দ করি। আমি ওকে দেখি নিজের বোনের মত। ওর যাতে ভাল হয় তাই আমরা দেখব–এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
ফজলু থামল। কারণ রকুল চা নিয়ে ঢুকেছে। অবাক হয়ে তাকাচ্ছে তার দিকে। বকুলের চোখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ।
বকুল, কেমন আছ?
জি ভাল।
তোমার ভাবী জলপাইয়ের একটা আচার বানিয়েছে, একবার গিয়ে চোখে আসবে। নিজ দায়িত্বে রাখবে। হাহা হা।
