বুড়ো বাজার করে ফিরছিল। দুহাতে দুটো ব্যাগ। ব্যাগের ভারে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। রীতিমত ঘামছে। বাকের এগিয়ে গিয়ে বলল, কেমন আছেন ভাই?
বুড়ো দারুণ চমকে উঠল। হাত থেকে বাজারের ব্যাগ পড়ে যাবার মত অবস্থা। ব্যাগ নামিয়ে কপালের ঘাম মুছল।
গোটা বাজারটাই কিনে এনেছেন দেখি। এত কি কিনলেন?
আমাকে বলছেন?
আপনাকে ছাড়া আর কাকে বলব? আর কেউ কি আছে। আশপাশে? এত বাজার যে–ব্যাপার কি? পার্টি-ফার্টি নাকি?
সপ্তাহের বাজার।
চলে যাচ্ছেন কেন? দাঁড়ান দুটো কথা বলি। এই পাড়ায় নতুন এসেছেন আলাপ-পরিচয় হয় নাই। আমার নাম বাকের। নেন সিগারেট নেন।
আমি সিগারেট খাই না। অন্যদিন আপনার সঙ্গে কথা বলব। আজ আমার একটু তাড়া अজি।
নামটা বলে যান।
জোবেদ আলী।
মেয়ে দু’টির কে হন। আপনি?
চাচা। দূর সম্পর্কের চাচা।
জোবেদ আলী হাঁটা ধরল। এবং দুবার পেছন ফিরে তাকাল। চোখের দৃষ্টি মাছের মত। খুবই সন্দেহজনক।
তালাবদ্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বাকের দ্বিতীয় সিগারেটটি ধরাল। সাড়ে দশটা বাজে। চড়াচড় করে রোদ বাড়ছে। রোদের মধ্যে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। সানগ্নাস সঙ্গে নেই। মাথা ধরে যাবে। বাকের গেটের ভেতর উঁকি দিল। বাড়িটা ভাল সাজিয়েছে। ফুলের টব দিয়ে ছয়লাব করে ফেলেছে। একটা কুকুরও আছে। এ পাড়ায় কুকুরওয়ালা বাড়ি তাহলে দু’টা হল। বদরুদ্দীন সাহেবের বাড়িতেও কুকুর আছে। সেই কুকুরটা অবশ্যি দেশী। এদেরটার মত না। এই বাড়ির কুকুরটা উলের বলের মত, দেখলেই লাথি দিতে ইচ্ছা করে। এক’দিন নিৰ্ঘাৎ লাথি বসাবে। এখনই পা নিশপিশ করছে।
বাকের দেখল মুনা হনহন করে যাচ্ছে। আজও সে দেরি করল অফিসে যেতে। রিকশা পেতে আরো আধঘণ্টা লাগবে। অফিসে পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে এগারটা বেজে যাবে। কেউ অবশ্যি কিছু বলবে না। মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মানোর অনেক অসুবিধা আছে।
মুনা। এই মুনা।
মুনা থমকে দাঁড়াল।
অফিসে যাচ্ছে নাকি?
হ্যাঁ।
চল, রিকশা ঠিক করে দেই।
রিকশা আমি নিজেই ঠিক করতে পারব।
চল না, আমার চেনা রিকশাওয়ালা আছে। হাফ ভাড়ায় নিয়ে যাবে।
বাকের সঙ্গে সঙ্গে আসতে লাগল। মুনা কিছু বলল না। বলে লাভ নেই। সে আসবেই। সারা পথ বকবক করতে করতে মাথা ধরিয়ে দেবে।
এগার নম্বর বাড়ির ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছ?
কি ব্যাপার?
দু’টি মেয়ে মাকে নিয়ে একা থাকে।
তাতে অসুবিধা কি?
না কোনো অসুবিধা নাই। মেয়েগুলি স্কুল-কলেজ কোথাও যায় না বাড়িতেই থাকে। গাড়ি করে নানান কিসিমের লোকজন আসে প্রায়ই। আজ সকালেই একজনকে দেখলাম।
পরের ব্যাপার নিয়ে এত মাথা ঘামান কেন, বাকের ভাই?
বেচাল কিছু কিনা তাই ভাবছি। পাড়ার একটা ইজতের ব্যাপার আছে না? ভেসে যেতে দেয়া যায় না।
পাড়ার ইজ্জতের দায়িত্বটা আপনাকে দিল কে?
না, তা না। দায়িত্ব কিছু না।
বাকের খানিকটা বিষগ্ন হয়ে পড়ল। মুনার সঙ্গে দেখা হলেই তার এ রকম হয়। মন কেমন খারাপ হয়ে যায়। বাকের ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে রিকশার খোঁজে। লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেল। এই সময় রিকশা পাওয়া মুশকিল। বড় রাস্তা পর্যন্ত যেতে হবে।
মুনা অফিসে ঢুকতেই পাল বাবু বললেন, আজ এত দেরি করলেন যে? বড় সাহেব তিনবার আপনাকে খোঁজ করেছেন। যান। তাড়াতাড়ি যান। ভাল একটা এক্সকিউজতৈরি করুন। বলবেন রিকশা এক্সিডেন্ট হয়েছে। মুনা হাসল। বড় সাহেব কাউকে ডাকলেই পাল বাবু অস্থির হয়ে পড়েন। কত রকম অদ্ভুত সাইকোলজি থাকে মানুষের। বেশির ভাগ মানুষই কি অন্যের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায়? পাল বাবু উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, যান। অপেক্ষা করছেন কেন?
যাচ্ছি।
যাচ্ছি বলেও মুনা তার চেয়ারে বসল। টেবিল ভর্তি ফাইল। একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিমছাম টেবিল বোধ হয় তার কখনো হবে না। রোক একগাদা ফাইল জমা হয়ে থাকবে। বড় বড় ফিগার ভর্তি ফাইল। প্রতি পাতায় দশটা করে ভুল থাকবে। ক্যালকুলেটর টিপে টিপে ফিগার চেক করতে করতে মাথা ধরে যাবে এবং বমি বমি ভাব আসবে। কুৎসিত ব্যাপার। পাল বাবু বললেন, আবার বসে পড়লেন কেন?
শরীরটা বিশেষ ভাল না পাল বাবু। ফাইল দেখে মাথা ঘুরাচ্ছে। বমি আসছে। মনে হচ্ছে বমি করে দেব।
মুনা মুখ বিকৃত করল।
স্যারের সঙ্গে দেখা করে আসেন। তারপর রেস্ট নেন। এক গ্লাস লেবুর সরবত খান। শরীর ফ্রেশ হয়ে যাবে। ভিটামিন সি আছে। খুব এফেকটিভ। যান যান দেরি করবেন না, স্যারের সঙ্গে ঝামেলাটা সেরে আসুন। আমি সরবতের ব্যবস্থা করছি।
ঝামেলা করতে হবে না। আমি অফিসে বেশিক্ষণ থাকব না। এক্ষুণি চলে যাব।
কেন?
বলেছি তো আপনাকে, আমার শরীরটা ভাল না। মাথা ঘুরছে।
বড় সাহেব কাকে যেন টেলিফোন করছিলেন। হাত ইশারা করে মুনাকে বসতে বললেন। টেলিফোন নিশ্চয়ই খুব ব্যক্তিগত। তিনি নিচু গলায় কথা বলছেন এবং মনে হচ্ছে মুনার উপস্থিতিতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছেন। মুনার একবার ইচ্ছে হল বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বড় সাহেব হাত ইশারা করে বসতে বলেছেন। মুনা ইতস্তত করতে লাগল। কথাবার্তা শুনতে ইচ্ছে করছে না, তবু শুনতে হচ্ছে। অফিসের এত বড় একজন মানুষ কেমন অসহায় গলায় কার যেন রাগ ভাঙবার চেষ্টা করছেন। নিশ্চয়ই তার স্ত্রীর।
বসুন। দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
মুনা বসল। এই লোকটির অফিসে অনেক বদনাম আছে। কিন্তু মুনা কোনোটিই বিশ্বাস করে না। তার ধারণা ছোটখাটো এই মানুষটি নিতান্তই ভাল মানুষ। শুধু ভাল না, বেশ ভাল।
