মুনা শীতল স্বরে বলল, আমি কিন্তু তোমার সঙ্গে যাচ্ছি না।
কেন?
ইচ্ছা করছে না? আমার অনেক রকম সমস্যা আছে, এখন আমি তোমার সঙ্গে বসে। ফ্রায়েড চিকেন খেতে পারব না।
ফ্রায়েড চিকেন না খেলে অন্য কিছু খাওয়া যাবে।
আমি বাসায় যাব, মাথা ধরেছে।
রিকশায় দুজনের কোনো কথা হল না। মামুন দু’একবার কথা শুরু করতে চেষ্টা করল, লাভ হল না কিছু।
মাথা খুব বেশি ধরেছে নাকি?
হুঁ।
আমার সঙ্গে গ্রামে গিয়ে থাকতে তোমার অসুবিধা হবে না তো? মুনা জবাব দিল না।
প্রথম কিছুদিন ফাঁকা ফাঁকা লাগবে, তারপর দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। কি, কিছু বলছ না কেন?
বললাম তো মাথা ধরেছে। মুনা গলির মাথায় নেমে পড়ল। সহজ ভাবেই বলল, থাক তোমাকে আসতে হবে না। আমি নিজে নিজেই যেতে পারব। রাস্তার আলো আছে।
আমি সঙ্গে এলে অসুবিধা আছে?
আছে। তুমি এলেই তোমার সঙ্গে বসতে হবে, কথা বলতে হবে। রাতে খাবার দিতে হবে। আমার এখন এসব করতে ইচ্ছা করছে না। মাথা ধরেছে খুব।
তোমার সঙ্গে আমার অনেক পরামর্শ আছে মুনা।
পরামর্শ পরে করা যাবে। সময় তো ফুরিয়ে যাচ্ছে না।
মুনা লম্বা লম্বা পা ফেলে এগুতে লাগল। মামুন তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে।
লতিফা ছটফট করছিলেন
লতিফা ছটফট করছিলেন সন্ধ্যা থেকেই–মুনা এসেছে? মুনা এসেছে? বকুল বিরক্ত হয়ে বলেছে এলে তো তোমাকে বলতাম মা। একশো বার এক কথা বলছ কেন?
আজ সমস্ত দিন লতিফার শরীর খারাপ গেছে। দুপুরে একবার বিছানা থেকে নামতে গিয়ে মাথা ঘুরে উঠল। শরীরটা একেবারেই গেছে। দুপুরে কিছুই খেতে পারেননি। বমি করে উগড়ে ফেলেছেন। সন্ধ্যাবেলা তার বুক কাঁপতে লাগল। পুরনো শ্বাস কষ্ট নয়, অন্য এক ধরনের কষ্ট। তাঁর ভয় করতে লাগল। তিনি চাপা স্বরে কয়েকবার বাবুকে ডাকলেন। কেউ এল না। হয়ত শুনতে পায়নি। কিংবা শুনেও আসছে না। আজকাল সহজে তার কাছে কেউ আসে না।
এক সময় সখিনা এসে ঘর ঝাঁট দিতে শুরু করল। কি অলক্ষুণে ব্যাপার। সন্ধ্যাবেলা কেউ গৃহস্থ বাড়িতে বাট দেয়? তিনি অনেকক্ষণ উঁচু গলায় বকাঝকা করলেন। তার বুকের ধরফরানি আরো বেড়ে গেল। এক সময় মনে হল ঘরের আলো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। চোখে বিধছে। অনেক রাতের দিকে মাঝে মাঝে এ রকম হয়। আলো হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য বেড়ে যায়। তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মুনার জন্যে। মিনিটে একবার করে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, দেখ তো মুনা এসেছে নাকি?
মুনা এসে তার অবস্থা দেখে বড়ই অবাক হল। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। ব্যাপার কী? মুনা উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, মামা ফেরেননি?
বাবু বলল–ফিরেছিলেন, আবার কোথায় যেন গেছেন।
মামি কি রকম করছে তোরা দেখছিস না? যা দৌড়ে ডাক্তার নিয়ে আয়।
লতিফা হাঁপাতে শুরু করলেন। ঘরের আলো এত উজ্জ্বল যে চোখ মেলে রাখা যাচ্ছে না।
মামি খুব খারাপ লাগছে?
হুঁ। তুই আমার হাত ধরে বসে থাক।
মুন্না হাত ধরে পাশে বসল। বকুল অবাক হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছে, লতিফা তাকালেন বকুলের দিকে। কি সুন্দর একটি মেয়ে, কে বলবে তার মত অতি সাধারণ একটি মায়ের কোলে এত সুন্দর একটি শিশু আসবে।
মুনা বলল, দাঁড়িয়ে দেখছিস কি? একটা ন্যাকড়া ভিজিয়ে এনে কপাল মুছিয়ে দে। বকুল ছুটে গেল রান্নাঘরে। লতিফা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, যত তাড়াতাড়ি পারিস বকুলের বিয়ে দিয়ে দিবি। এত সুন্দর মেয়ে ঘরে বেশিদিন রাখবি না। অনেক সমস্যা হবে।
ঠিক আছে দেব।
পড়াশোনা কপালে থাকলে হবে, না থাকলে হবে না। তুই ওর বিয়ে দিয়ে দিবি। যত তাড়াতাড়ি পারিস।
বিয়ে দিলেই সব সমস্যা সমাধান হয় নাকি মামি?
লতিফা কিছু বললেন না। বকুল মাথায় ভেজা ন্যাকড়া বুলোতে লাগল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন–আহ ঠাণ্ডা লাগে।
ডাক্তার এল সাড়ে সাতটায়। তারও ঘণ্টা তিনেক পরে দীর্ঘ ছবছরের রোগ যন্ত্রণার অবসান হল। ডাক্তার ছেলেটি বড় অবাক হল। সে এমন ভাবে সবার দিকে তাকাতে লাগল যেন ঘটনাটি সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছে না। তার হাতে এটিই কি প্রথম মৃত্যু?
কিছু কিছু ঘটনা মানুষ দ্রুত ভুলে যেতে চেষ্টা করে। সেই চেষ্টা সচেতন ভাবেই করা হয় এবং সে কারণেই সে লজ্জিতও বোধ করে। মৃত্যু এমন একটি ঘটনা। অতি প্রিয়জনের মনে হয় না সেই প্রিয়জন কোনো কালে আমাদের মধ্যে ছিল। কেন এ রকম করা হয়? আমাদের নিজেদেব ব্যবহারে নিজেরাই অবশ্য লজ্জিত হই, যার জন্যে প্ৰিয়জনটির একটি বড় ছবি যত্ন করে দেয়ালে টাঙানো হয়। এবং এক’দিন কেউ খুব রাগারগি করে ফ্রেমে মাকড়শার জাল, কেউ দেখছে না, ধ্যাপারটা কি?
লতিফার মৃত্যুর পর তার কোনো ছবি দেয়ালে টাঙানো হল না। তবে তার বিয়ের একটি ছবি মুনা বের করে খুব কাদাল। সেই ছবিতে তাকে দেখাচ্ছিল একটি দুষ্ট বালিকার মত। শওকত সাহেবের চোখে চশমা। কেমন ভয় পাওয়া চেহারা। ছবিটি স্টুডিওতে তোলা। সন্ট্রডিওতে তোলা সব ছবিই কেমন মূর্তি মূর্তি হয়। এই ছবিটি সে রকম নয়। প্রাণের একটা ব্যাপার আছে কোথাও। কিংবা এও হতে পারে মানুষের মৃত্যুর পর তাদের সব ছবিতে কিছু প্ৰাণ সঞ্চার হয়।
লতিফার ঘর আগের মতই আছে। মৃত মানুষদে বা ঘর দীর্ঘদিন একই রকম থাকে। সহজে সে ঘরের কোনো কিছুতে কেউ হাত দিতে চায় না। তবু ঘবটা কেমন যেন আগেবা মত থাকে না! সূক্ষ্ম। একটা পরিবর্তন হয় কোথাও। সে পরিবর্তন সূক্ষ্মণ হলেও যে-কেউ ধরতে পারে।
