বাকের ছুটিল বেবিটেক্সি ধরে আনতে। এই বেবিটেক্সিতেই টিনার যমজ ছেলে হল।
বাকের দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলল, বেকুব মেয়েছেলেদের নিয়ে মুসিবত।
বাচ্চা কার মত হয়েছে বকুল? আমার মত না তো ভাইয়ের মত?
কারো মতই না।
বকুল উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে রইল টিনার দিকে। টিনা ভাবী কেমন অন্য রকম হয়ে গেছে। কী চমৎকার মায়া মায়া চেহারা হয়েছে টিনা ভাবীর।
দু’জনকে সামলাবে কী ভাবে?
টিনা হাসতে হাসতে বলল, একটাকে তুই নিয়ে যা। অরুণকে নিয়ে যা। অরুণ বড্ড জ্বালায়।
অরুণ কোনটি?
বাঁ পাশেরটি।
দু’জনই তো এক রকম।
দূর-দূর এক রকম হবে কেন? চেহারা দুরকম, কাঁদে দুরকম করে। ওদের গায়ের গন্ধও দুরকম।
কী যে তুমি বল ভাবী।
ঠিকই বলি। নে তুই অরুণকে নিয়ে যা।
সত্যি সত্যি। কিন্তু নিয়ে যাব।
নিয়ে যাবার জন্যেই তো বললাম। তুই কী ভাবছিস ঠাট্টা করছি?
বকুল খুব সাবধানে একজনকে কোলে তুলল! কী চমৎকার একটা ঘ্রাণ আসছে গা থেকে। বাসি শিউলী ফুলের ঘ্রাণ এত মায়া লাগে কেন? বকুলের চোখে পানি আসার উপক্রম হল।
তোর ভাই যমজ বাচ্চা হওয়া উপলক্ষে আমাকে যমজ শাড়ি দিয়েছে। বাচ্চা-কাচ্চা হলে বউকে শাড়ি দিতে হয় জানিস তো?
না। জানি না।
দিতে হয়। কষ্ট করে বাচ্চা আনে। সেই জন্যে দেয়া। দেখ তো শাড়ি দুটো কেমন।
দু’টি একই রকম শাড়ি। নীল জমিনের ওপর সাদা ফুল।
খুব সুন্দর ভাবী, তোমাকে দারুণ মানাবে।
একটা শাড়ি তুই নিবি?
বকুল বিব্রত স্বরে বলল, আমি নেব কেন? কষ্ট করবে তুমি, শাড়ি নেব আমি?
দুটাই তো আর নিচ্ছিস না। একটা নিচ্ছিস।
না ভাবী প্লিজ।
না নিলে আমি খুব রাগ করব, ক’দিন কথা বলব না তোর সাথে। তোকে দেবার জন্যেই তোর ভাইকে বলে আমি দু’টি শাড়ি আনিয়েছি। শুধু শাড়ি না, ব্লাউজ-পেটিকোট সবই আছে। যা, কাপড় বদলে আয়।
বকুলকে শাড়ি পরে আসতে হল। টিনা দীর্ঘ সময় তার দিকে তাকিয়ে বলল, এখন যা ঐ ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে পেপসি খেয়ে আয়।
বকুলের মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল। টিনা বিরক্ত স্বরে বলল তুই কী ভাবছিস কেউ কিছু টের পায় না। সবাই সব কিছু টের পায়। তোর ভাইয়ের কাছে শুনলাম। সে দেখেছে তুই ঐ ডাক্তার ছোকরার সঙ্গে বসে কোক না পেপসি কি যেন খাচ্ছিস, আর খুব হাত নেড়ে নেড়ে গল্প করছিস।
বকুলের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। এসব কি বলছে ভাবী। কিন্তু টিনা খুব স্বাভাবিক। বাচ্চার নাভিতে বরিক পাউডার দিতে দিতে বলল, কিছু মানুষই আছে যারা শুধু অল্প বয়সী মেয়েদের সঙ্গে ছোক ছোক করতে চায়। প্রথমে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, তারপর গায়ে-টায়ে হাত দেয়।
কি যে তুমি বল ভাবী।
ঠিকই বলি। ঘাস খেয়ে তো বড় হইনি।
তুমি যা ভাবিছ সে সব কিছু না।
প্রথম প্রথম এ রকম মনে হবে। তারপর দেখবি এক’দিন হঠাৎ হাতের সঙ্গে হাত লেগে যাবে। যেন একটা অ্যাকসিডেন্ট। তারপর এক’দিন আশপাশে লোকজন না থাকলে জড়িয়ে ধরবে। চুমু খাবে।
কি যা তা বলছ?
ঠিকই বলছি। না জেনে বলছি?
ওনার সম্পকে এরকম বলাটা ঠিক না। সব মানুষ তো এক রকম নয়।
সব মানুষই এক রকম। সবারই দুটো করে চোখ, দুটো কান, একটা নাক। খবরদার আর কোনুন। এখানে যাবি না। দরকার হয় সে আসবে, তুই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরারি।
ছিঃ।
এত ছিঃ করতে হবে না। যা বলছি মনে রাখিস।
খুব মন খারাপ করে বাড়ি ফিরল বকুল। নতুন শাড়ি পরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতে কেন জানি তার লজ্জা করছিল। ফার্মেসির পাশ দিয়ে আসবার সময় খুব ইচ্ছা হল একবার তাকিয়ে দেখে ডাক্তার আছেন কি না। কিন্তু কিছুতেই তাকাতে পারল না। তার কেন জানি মনে হল ডাক্তার সাহেব আছেন এবং তিনি তাকে দেখছেন অবাক হয়ে। এক্ষুণি বেরিয়ে এসে ডাকবেন–এই বকুল, এইভাবে পালিয়ে যাচ্ছ কেন?
কিন্তু কেউ ডাকল না। কেউ ডাকেনি শুধুমাত্র এই কষ্টেই তার চোখ ভিজে উঠছিল। কেন তার এ রকম হচ্ছে? এটা কি কোন অসুখী? না অন্য কিছু?
শওকত সাহেব সুন্দর শাড়ি পরা এই মেয়েটিকে কাঁদতে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। এটি তারই মেয়ে এটা বুঝতে সময় লাগল।
বকুল মা, কাঁদছিস কেন?
কাঁদছি না। কাদর কেন শুধু শুধু।
বকুল তাকে পেছনে ফেলে তার তার করে এগিয়ে গেল। শওকত সাহেব অনেকক্ষণ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রইলেন একই জায়গায়। তার মেয়েটি এত বড় হয়ে গেছে। এটি কেন এতদিনেও তার চোখে পড়েনি?
কাঁদছিস কেন? পাড়ার ছেলেরা কিছু বলেছে? মেয়েটির জন্যে তার নিজের মন কেমন করতে লাগল। এদেরকে অসহায় ফেলে রেখে দীর্ঘ দিনের জন্যে তাকে জেলে ঢুকে পড়তে হবে। উকিল সাহেব যদিও বলছেন কিছুই হবে না, কিন্তু তিনি জানেন ব্যাটা মিথ্যা কথা বলছে। উকিলরা সত্যি কথা বলতে পারে না।
শওকত সাহেব মাথা নিচু করে বুড়ো মানুষের মত হাঁটতে লাগলেন।
মামলার আবার একটি ডেট পড়েছে। এ রকম কি অনন্তকাল ধরেই চলতে থাকবে? উকিল সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, একেকটা মামলা চার-পাঁচ বছর ধরে ঝোলে। ঝোলাটাই ভাল। যত ঝোলে, মামলা তত দুর্বল হতে থাকে। সামনের মাসে আসেন দেখা যাবে।
শওকত সাহেবকে বেশ খুশি খুশি মনে হয়। তিনি যেন সমস্ত ব্যাপারটাকেই এড়াতে চাইছেন। তাঁর মুখ দেখে মনে হচ্ছে বুক থেকে পাষাণ ভার নেমে গেছে। তিনি উল্লসিত কণ্ঠে বললেন, চল রে মুনা বাড়ি যাই।
আমি যাব না, তুমি যাও। বাকের ভাইকে নিয়ে যাও।
তুই এখন কি করবি?
অফিসে যাব।
তিনটার সময় অফিসে গিয়ে কি কারবি?
