কোনো কাজে এসেছেন নাকি?
নাহ। ‘কাজ থাকলে বলেন। এতদিনের সম্পর্ক এক কথাম শেষ কবে দিলেন। এটা একটা কথা হল? শমসের আলি জোর করে তাকে কান্টিনে নিয়ে গেলেন। হঠাৎ করে এই লোকটির এরকম দরদী হয়ে ওঠার কারণ তার কাছে স্পষ্ট হল না।
তারপর বলেন মামলার তদ্বির কেমন চালাচ্ছেন?
চালাচ্ছি।
ঢিল দেবেন না। একটু ও ঢিল দেবেন না। নেন সিগারেট নেন।
শওকত সাহেব সিগারেট নিলেন। শমসের অ্যালি গলা অনেকখানি নিচু করে বললেন ভেতরের খবর, দেই একটা, সাদেক সাহেবের বিবরুদ্ধে মামলা উইথড্র করা হচ্ছে। আগে তে{ দুজনের বিরুদ্ধে চার্জ ছিল। এখন শুধু আপনার বিবরুদ্ধে।
তাই নাকি?
গুজবটা এ রকমই; গত মঙ্গলবারে সাদেক সাহেব অফিসে এসেছিলেন খুব হাসি হাসি মুখ। বিপদ আসে গবিবোর উপরে, বড় ই-কাতলা পার পেয়ে যায়।
শওকত সাহেব কিছু বললেন না। শমসের আলি নিচু গলায় কথা চালিয়ে যেতে লাগলেন। একজনকে উইথড্র করা মানে কেইস দুর্বল করা। চোখ বন্ধ করে ঘুমান, খালাস পেয়ে যাবেন। শুধু খালাস না। চাকরি ও ফেরত পাবেন। নাইন্টি নাইন পারসেন্ট গেরান্টি।
শওকত সাহেব প্রায় তিন ঘণ্টার মত সমযঃ বিন! কারণে অফিসে বসে ক{ট1লেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন সবাই খুব অস্বস্তি বোধ করছে, তবু তার চলে যেতে ইচেছু করছিল না;
তাঁর চেয়ারে নতুন একটি ছেলে এসেছে। প্রথম চাকরিতে ঢুকেছে বোধ হয়। কিছুই জানে না। বার বার চেয়ার ছেড়ে উঠে অন্যদের জিজ্ঞেস করছে। এইসব অল্প বয়সী ছোকড়া দিয়ে কাজ হয়? ফাইলিং শিখতেই এক বছর লাগবে।
উকিল সাহেবের কাছে তাদের ডাক পড়ল একটার দিকে। উকিল সাহেব টিফিন-ক্যারিয়ার খুলে আলু ভাজা এবং পরোটা খাচ্ছেন। এত নামী ডাকি একজন মানুষ আলুভাজা এবং পরোটা দিয়ে লাঞ্চ খায় শওকত সাহেবের ধারণা ছিল না। উকিল সাহেব দরজা গলায় বললেন বসেন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বাকের হাত কচলে বলল, স্যার ভাল আছেন?
ভালই আছি।
আমাদের কেউসটা দেখেছেন?
হ্যাঁ দেখলাম। কনভিকসন হবে না। নিশ্চিন্ত থাকেন। এই কেইসে যদি আমার ক্লায়েন্টের কনভিকসন হয় তাহলে তো আমাকে ওকালতি ছেড়ে কাঠমিস্ত্রি হতে হবে। হা হা হা।
উকিল সাহেবের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বাকেরও হাসল। সে মুগ্ধ। শওকত সাহেব ক্ষীণ স্বরে বলল, চাকরি ফিরে পাব?
কনভিকসন না হলে নিশ্চয়ই ফিরে পাবেন। কনভিকসন না হওয়ার মানে হল আপনি অপরাধী নন। যে অপরাধী না তার চাকরি থাকবে না কেন? তবে ওলা যদি কোর্টে না এসে ডিপার্টমেন্টাল অ্যাকশন নিত, তাহলে চাকরি থাকত না। ওরা সেটা নেয়নি। কোর্টে এসেছে। আপনার জন্যে শাপে বর হয়েছে। কোনো রকম দুঃশ্চিন্তা করবেন না। ভরসা রাখেন আমার ওপর।
বাকের দাঁত বের করে বলল, আপনার ওপরই স্যার ভরসা। নব্বই পারসেন্ট ভরসা আপনার ওপর। আর দশ পারসেন্ট আল্লার ওপর।
উকিল সাহেব বাকেরের কথা পছন্দ করলেন বলেই মনে হয়। তিনি তার পান খাওয়া কালো কালো দাঁত বের করে হো হো করে হাসতে লাগলেন। যেন খুব-একটা মজার কথা।
বকুল অনেকদিন পর টিনা ভাবীর বাসায় এসেছে। আড়াইটা বাজে। বেড়াতে আসার মত সময় নয়। কিন্তু টিনা ভাবীর বাসায় তার অসময়ে আসতেই ভাল লাগে। বকুল কড়া নেড়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। দরজা খুলল এক অপরিচিত মেয়ে। টিনা ভাবীর বোন হবে। তার মত দেখতে।
টিনা ভাবী আছে?
আছে। ঘুমাচ্ছে।
বকুল সরাসরি শোবার ঘরে ঢুকে গেল। টিনা ঘুমাচ্ছিল না। শেষ পর্যায়ে এসে সে খুব কাহিল। হয়ে পড়েছে। চিৎ হয়ে ছাড়া ঘুমুতে পারে না। কাত হয়ে শুলেই মনে হয় পেট শরীর থেকে খসে আসবো। সে বিরক্ত স্বরে বলল, বকুল তুই কী মনে করে?
কেমন আছ ভাবী?
জিজ্ঞেস করতে লজ্জা লাগে না? এত দিন পর তুই কী মনে করে এলি?
আসতে ইচ্ছা করছিল না ভাবী। কোথাও যাই না। আমি স্কুলেও যাই না।
তোব বাবা দোষ করেছে, তুই তো করিসনি?
বাবা কিছু করেনি।
তোদের আচার-আচরণে তো এরকম মনে হয় না। ঐ দিন বাবু যাচ্ছিল বাসার সামনে দিয়ে। আমি এত ডাকলাম, সে ফিরে ও তাকাল না। এ রকম ভাব করল যেন শুনতে পায়নি।
বকুল প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বলল, তোমার পেট তো ভাবী হিমালয় পর্বতের মত হয়ে গেছে।
তা হয়েছে। আগে ভেবেছিলাম যমজ এখন মনে হচ্ছে। যমজ না, তিনজন বাস করছে। তিন বাচ্চাকে কী বলে ত্রিমজ?
বকুল খিলখিল কবে হেসে ফেলল। বহুদিন এমন প্ৰাণ খুলে সে হাসেনি। সে সন্ধ্যা পর্যন্ত টিনা ভাবীর সঙ্গে থাকল। বাচ্চাদের জন্যে কাঁথা বানানো হল খানিকক্ষণ। খানিকক্ষণ ছাদে বসে গল্প হল। তেঁতুল এবং কাঁচা কলার ভর্তা বানিয়ে মহানন্দে খাওয়া হল। এ বড় সুখের সময়।
টিনা একসময় বলল, তুই একবার আমার সঙ্গে সারাবাত থাকবি। রাত জেগে গল্প করব।
কী গল্প?
কিছু কিছু গল্প রাতেই করতে হয়; সেই সব গল্প।
টিনা রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসতে লাগল। বাড়ি ফেরার আগে বকুল হঠাৎ নিচু স্বাবে বলল। আচ্ছা ভাবী, যদি কোনো মেয়ের কোনো ছেলেকে ভাল লাগে তাহলে তার কী করা উচিত? ধর ছেলেটাব মেয়েটাকে ভাল লাগছে না। শুধু মেয়েটারই লাগছে।
টিনা বেশ কিছু সময। চুপ চাপ থেকে বলল মেয়েটা যদি তোর মত সুন্দরী হয় তাহলে তার উচিত এক’দিন ভাল লাগার ব্যাপারটি ছেলেটিকে বলা;
আর যদি আসুন্দধ হয়?
টিনা জবাব দিল না। সহজ ভাবেই অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে এল।
তোর বিয়ের কী হল?
কিছু হয়নি। এর জন্যে কী তোর মন খারাপ?
