ই। টাকাটা রিকভার না হলে করবে।
তোমাকে তো তাহলে ধরে নিয়ে যাবে হাজতে।
হুঁ।
টাকার ব্যাপারে তুমি কিছু জানো?
না। কিছুই জানি না।
মুনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি জানো না ঠিক না মামা! তুমি জানো। তবে তুমি একা এটা করনি তা ঠিক। এত সাহস তোমার নেই। সঙ্গে অন্য লোক ছিল। তুমি খানিকটা শেয়ার পেয়েছে? কত পেয়েছে?
শওকত সাহেব চুপ করে রইলেন। মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কত পেয়েছ?
দশ হাজার।
আমাকে যে ছ’হাজার দিতে চেয়েছিলে সেটা ওখান থেকেই?
হ্যাঁ।
বাকি চার হাজার কোথায়?
ধার-টার ছিল। শোধ দিয়েছি।
ঐ দিন যে মিষ্টি আনলে সেটা কি এই টাকা থেকে?
শওকত সাহেব জবাব দিলেন না। দ্বিতীয় সিগারেট ধরিয়ে খুক খুক করে কাশতে লাগলেন। মুনা বলল–মামা, তুমি কাল সকালেই অফিসে গিয়ে বলবে, আমি টাকাটা ফেরত দেব, তবে আমাকে দুমাস সময় দিতে হবে।
দু’মাসের মধ্যে কোথায় পাব এত টাকা?
পাবে না। তবে এর মধ্যে আমরা বকুলের বিয়ে দিয়ে দেব। তোমাকে জেলে নিয়ে ঢোকালে ঐ মেয়ের কি আর বিয়ে হবে, না পড়াশোনা হবে? যত সুন্দরীই হোক চোরের মেয়েদের আমাদের সমাজে জায়গা নেই। বুঝলে মামা? তুমি কালই অফিসে যাবে এবং দু’মাস সময় নেবে।
ঠিক আছে নেব।
মুনা উঠে পড়ল। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম এল না তার। সে বুঝতে পারল বকুলও জেগে আছে, কিন্তু সাড়াশব্দ দিচ্ছে না। সে কি কিছু আঁচ করতে পারছে?
বকুল?
কি?
জেগে আছিস তো কথা বলছিস না কেন?
বাবা এতক্ষণ ধরে কি বললেন?
তেমন কিছু না। তোর বিয়ে নিয়ে কথা হল। বুঝলি বকুল, আমি অনেক ভেবে-টেবে দেখলাম অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া খারাপ না। এর কিছু কিছু ভাল দিকও আছে।
বকুল ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল।
এই সময়ে মেয়েদের মনে প্রচুর ভালবাসা থাকে। ভালবাসাটা খুবই জরুরি। সব কিছু অভাবই সহ্য করা যায়, কিন্তু ভালবাসার অভাব সহ্য করা যায় না।
বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, তোমাকে একটা কথা বলব মুনা আপা?
বল।
তুমি রাগ করবে না তো?
রাগ করবার মতো কথা না হলে রাগ করব কেন? বল কি বলবি?
বকুল মুনার কাছে সরে এসে আলতো করে একটা হাত রাখল তার গায়ে। প্রায় ফিসফিস করে বলল, ক্লাস টেনের একটা মেয়ে যদি কোনো ছেলেকে পছন্দ করে তাহলে সেটা কি খারাপ আপা?
মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, ছেলেটা কে?
বকুল জবাব না দিয়ে দুহাতে মুনাকে জড়িয়ে ধরল। মুনা লক্ষ্য করল বকুল থারথার করে কাঁপছে।
ভোরবেলা সূর্য ভালভাবে ওঠার আগেই বাড়িতে পুলিশের ওসি এবং তিনজন কনস্টেবল এল। তাদের সঙ্গে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তারা টাকা খুঁজল।
লতিফা রক্তশূন্য মুখে দরজা ধরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। মাঝে মাঝে কিছু একটা বলতে চেষ্টা করলেন। কেউ তা বুঝতে পারল না। শওকত সাহেব বসে রইলেন বেতের চেয়ারে। তিনি খুব ঘামতে লাগলেন। তার ঠিক সামনেই বসেছেন ওসি সাহেব। এ জাতীয় দৃশ্য তিনি তাঁর জীবনে অনেক দেখেছেন। কাজেই এ দৃশ্য তার মনে কিছুমাত্র রেখাপাত করল না। তবু তিনি একবার লতিফার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভয়ের কিছু নেই, আপনি শান্ত হয়ে বসুন।
এই ভোরবেলাতেও বাড়ির সামনে এবং তার লাগোয়া রাস্তায় প্রচুর লোক জমে গেল। এ বাড়িতে একটি মেয়ে খুন হয়েছে। এ রকম একটা গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। রোদ বাড়তে লাগল কিন্তু কৌতূহলী মানুষের ভিড় কমল না।
সার্চ শেষ হতে হতে আটটা বেজে গেল। ওসি সাহেব বললেন, শওকত সাহেব আপনার নামে একটা ওয়ারেন্ট আছে, আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। ভয়ের কিছু নেই, জামিনের ব্যবস্থা হবে। মুনা বলল, আমি কি যেতে পারি আপনার সঙ্গে?
হ্যাঁ নিশ্চয়ই পারেন। একজন পুরুষ মানুষ হলে ভাল হত। উকিল-টুকিলের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক ছোটাছুটির ব্যাপার আছে।
মুনা বাবুকে পাঠাল পরিচিত। যদি কাউকে পাওয়া যায়। আশপাশের বাসার অনেকের সঙ্গেই এদের চেনা-জানা। তবু কেউ আসতে রাজি হল না। সাবধানী মানুষ, ইচ্ছা করে কোনো বাজে ঝামেলায় জড়াতে চায় না।
বাকেরকে শুধু পাওয়া গেল। সে ঘুমুচ্ছিল। খবর পেয়েই ছুটে এসেছে। তার মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। সিগারেট ধরিয়ে দায়িত্বশীল মানুষের মত সে মুনাকে বলল, নো প্রবলেম, এক ঘণ্টার মধ্যে জামিনে ছাড়িয়ে আনব। ছেলেখেলা নাকি। তোমরা সব দরজা বন্ধ করে বসে থাক। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর দেবে না। ঘরে টাকা-পয়সা আছে তো?
বকুল তার ঘরে একা একা বসে ছিল। শওকত সাহেবকে বের করে নিয়ে যাবার সময় সে শুধু বেরিয়ে এল। অত্যন্ত কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল, আমার বাবাকে আপনারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? ওসি সাহেব সে প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেন না। শওকত সাহেব অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মত চারদিকে তাকাতে লাগলেন। উপদেশ দেবার মত ভঙ্গিতে বললেন, ঠিকমত পড়াশোনা করিস মা। দু’দিন পর মেট্রিক পরীক্ষা।
বাসার সামনে অসম্ভব ভিড়, সেই ভিড় ঠেলে তারা এগুতে লাগল। শওকত সাহেব শিশুদের মত শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন। বাকের তাঁর একটা হাত ধরে আছে। সে মৃদু স্বরে বলল, মামা কাঁদবেন না। কিছু হবে না, এক ঘণ্টার মধ্যে জামিন হবে। আমার চেনা লোকজন আছে।
বাসার সামনে লোকের ভিড় বাড়তেই লাগল।
উকিল ভদ্রলোক দেখতে পান-বিড়ির দোকানদারের মত।
রোগা দড়ি পাকানো চেহারা। কথাও ঠিকমত বলতে পারেন না–জড়িয়ে যায়। কিন্তু তিনি নাকি ফৌজদারী মামলায় একজন মহা ওস্তাদ আদমি। তার হাতে মামলা গেলে নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো যায়।
