কেউ কেউ বলে তুমি যদি একটু স্মৃতি রোমন্থন কর তাতে তো ক্ষতি নেই, কিন্তু যাবে কোথায়? দেখবে কাকে? আবার কেউ বা বলে দেখলে ভালোই হবে তোমার মন মোহমুক্ত হবে, সেই তরুণ যুবার প্রতি যে মোহ তা কেটে যাবে। আমার সংসারের মন, উপরের মনও তাই বলে, আমি ভাবি আমি দেখতে পাব অপরিচিত এক বৃদ্ধকে, অমনি আমার লজ্জা হবে, মনে হবে, এ কাকে দেখতে এলাম। কিন্তু আমার গভীরের মন বলে এ সে বস্তু নয়—যাকে তুমি দেখতে চাও সে চোখে দেখার নয়। তার বয়স হয় না। যেমন তোমার হয় নি। বয়স তো একটা আবরণ মাত্র, সেটা খুলে ফেলা যায়—কেউ সাধনা করে খোলে, কারু উপর করুণা হলে সে নিজের সত্তাকে পায়-কার করুণা? জানি না তো। কিন্তু আত্মার স্বরূপ আমি বুঝতে পারছি। আমার কোনো সংশয় থাকছে না। যে জানে না তাকে এ অনুভূতি বোঝানো যাবে না। অন্ধকে যেমন আলোর অর্থ বোঝানো যায় না। তর্কের অতীত এই উপলব্ধির কথাই বলা হয়েছে যা বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায় না, শাস্ত্র পড়ে জানা যায় না। ‘ন মেধয়া বহুধা ন তেন। আজ বুঝতে পারছি কালজয়ী এই প্রেমকে আর সংসার জয় করতে পারবে না, এ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে, আমাকে সংসারের আবর্ত থেকে বহন করে নিয়ে যাবে দূরে—যথা নদীনাং বহবাহমুবেগাঃ সমুদ্রমেবাভিমুখাদ্ৰবন্তীনদীর বহুমুখী জলস্রোত যেমন সংসারের বিচিত্র আকর্ষণ পার হয়েও সমুদ্রাভিমুখী হয়।।
ওকে একবার দেখে আসতে আমায় হবেই, কিন্তু যাওয়া তো সোজা নয়। অনেক ব্যবস্থা চাই—তাছাড়া আমি তো ওকে আগে জানাতে চাই না, কারণ তাহলে নিশ্চয় ও দেশ ছেড়ে চলে যাবে। আমি বুঝতে পেরেছি ও আমার সঙ্গে দেখা করতে চায় না, বা পারবে না। কেন পারবে না তার সঠিক কারণ আমি বুঝতে পারছি না। আমার বিষয়ে অমন একখানি কাব্য লেখবার পরে অপরাধবোধ জন্মাতে পারে কি? না তা নয়–সে বুঝতেই পারে নি যে এটা অন্যায় হয়েছে, যেমন সেরগেইও পারে নি। ওদের দেশে ওসব কিছু নয়। এখন আমার কাছেও নয়, বাইরের আসঙ্গ জলের উপর হাওয়ার ঢেউ, আমি এত বোকা নয় যে ঠিক সেজন্যই উতলা হয়েছি। আমার ক্ষোভের কারণ ও সত্যের সঙ্গে ভেজাল মিশিয়েছে।
তবে ও আমাকে সারাজীবন এড়িয়ে গেল কেন? আমি ‘জ’-কে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, “বলতে পার তুমি, আমি যদি যাই সে আমার সঙ্গে দেখা করবে?”
“নিশ্চয় করবেন। যিনি আপনার কথা আমায় অমন করে বলেছেন তিনি দেখা করবেন এ কথা আপনার মনে হল কেন?”
“চিঠির উত্তর দেয় না যে!”
“চিঠির উত্তর দেয় নি? সে কি?”
“আচ্ছা, ‘জ’ হতে কি পারে বাবার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, হতে কি পারে সেজন্যই চিঠির উত্তর দেয় না?”
“তা হতে পারে বৈকি।”
“কি আশ্চর্য! এ কি একটা রাখবার মত প্রতিজ্ঞা?”
“তা কেন, সত্যবাদী কি কেউ হয় না?”
৩.২ বিদেশে যাবার কথা আমি ভাবি
যাবার কথা আমি ভাবি, দিনের বেলা আমি নানা চেষ্টা করি, সোজা তো নয় আজকাল বিদেশে যাওয়া। কিন্তু রাত্রে আমার ভয় করে। মনে হয় কোথায় যাব একলা? রাস্তার মাঝখানে যদি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই, যদি স্ট্রোক হয়। পার্বতীর স্বামীও তাই বলেছেন, “সে ভদ্রলোকের যেরকম বর্ণনা শুনছি, তিনি যে কি রকম ব্যবহার করবেন তাও তো জানা নেই, তোমরা যে অমৃতাকে একলা ছেড়ে দিচ্ছ, অসুস্থ হলে কি হবে?” সবাই ভাবছে, আমিও। কেবল আমার স্বামী আমাকে আশ্বাস দিচ্ছেন, “কিছু হবে না, কোনো ভয় নেই, কেউ তোমাকে কষ্ট দেবে না অসুস্থ হবে না। সব ব্যবস্থা হবে তুমি নির্বিঘ্নে ঘুরে আসবে। আমার অসুখ সম্বন্ধে আমার স্বামী সর্বদা চিন্তিত কিন্তু এখন ওঁর চিন্তা নেই। আমি অবাক হয়ে গেছি, আমি যদি ‘দশ পা পিছাই উনি ‘বিশ পা এগিয়ে দেন। আর এটা এত অবলীলাক্রমে করছেন যে আমরা সকলেই বিস্মিত। “যাবে, তুমি যাবে, সেখানে গিয়ে তোমার এই fairy tale-টা শেষ করে আসবে।”
সেদিন Air India-র আপিসে বসে আছি, আমাদের সাহায্য করছেন যে ব্যক্তি তার নাম পুরোহিত। এয়ার ইণ্ডিয়ার আপিসে বসে আমার ভয় করছে। এত অজ্ঞাত দেশে কি করে যাব? এর আগে যখন বিদেশে গিয়েছি হয় কোনো দলের সঙ্গে, নয় নিমন্ত্রিত হয়ে। বিদেশে তারাই আমার সব ভার নিয়েছে, তা না হলে একলা কি যেতে পারি? নিমন্ত্রণের অপেক্ষা করছি, যদি নিমন্ত্রণ আসে তবেই যাওয়া হবে—নৈলে একা একা শুধু ওকে দেখতে যাওয়া অসম্ভব। আমি বললাম, “আজকে টিকিট করা থাক।”
আমার স্বামী বললেন, “কেন? টিকিট করা হোক না, নিমন্ত্রণ আসবে, ঠিক আসবে দেখো।”
“না, না, আজ থাক, আমার ভয় করছে।”
“তোমার ভয় করছে কেন, আমারই তো ভয় করবার কথা!”
“তোমার আবার ভয় করবে কেন?”
“করবে না?” উনি খুব হাসছেন, “তুমি পুরোহিতের সাহায্য নিচ্ছ।”
অনেক দিন পরে খুব হাসছি, মন হাল্কা হয়ে গেছে, স্বচ্ছ, উদার, শুভ্র হাস্যধারা এই নিরভিমান ব্যক্তিটি উৎসারিত করতে পারেন।
নিমন্ত্রণ আসবে কি আসবে না, এই নিয়ে সংশয়ে আছি। আমি যাদের সঙ্গে নানা রকম কাজে এদেশে যুক্ত আছি তারাই আমার নিমন্ত্রণ করবে। তবে যদি সম্মেলন হয় তবেই করবে, তা না হলে সামনের বছর আমায় নিয়ে যাবে ঠিকই। তারা তো জানে না আমার তাড়াটা কি। সম্মেলন কবে হবে কে জানে। সেরগেই আসার পর ছ’মাসের উপর হয়ে গেল, কম দিন নয়। এই ছয় মাস আমি কোনো রাত্রে এক ঘণ্টার বেশি ঘুমোই নি, কিন্তু তাতে আমার শরীর খারাপ হচ্ছে না, বা দিনেও ঘুম পাচ্ছে না।
