সেদিন একজন অধ্যাপক দেখা করতে এসেছেন, তিনি একটা বড় কাজের ভার নিয়েছেন। নানা কথার মধ্যে হঠাৎ বললেন, “আমার এক জ্যোতিষী আছেন তার কথাতেই আমি এই কাজের ভার নিয়েছি।”
আমি বিস্মিত, অনেক জ্যোতিষী দেখেছি আমি, ঠিকমত কাউকে কিছু বলতে শুনি নি, সবাই আন্দাজে ঢিল ছোড়ে। আর তারপরই, স্বস্ত্যয়ন কর—যেন এখানে দুটো ফুল ফেলে বিশ্বের অমোঘ নিয়মকে বদলে দেবে।
আমি বললাম, “আপনি এসব বুজরুকিতে বিশ্বাস করেন?”
“বুজরুক অনেক আছে, সবাই নয়।”
“আমাকে একবার নিয়ে যাবেন?” হাসি পাচ্ছে আমার, মানুষ যখন দুর্বল হয়ে যায় তখন তার মেরুদণ্ডও বেঁকে যায়। আমার তাই হয়েছে। এখন অলৌকিকে নির্ভর করতে হচ্ছে। এসব ভাবছি, আরো ভাবছি দেখাই যাক না। ক্ষতি তো কিছু নেই। অধ্যাপকের সঙ্গে জ্যোতিষীর বাড়ি গেলাম। তিনি আমায় পৌঁছে দিয়ে চলে গেলেন। জ্যোতিষী নিবিষ্ট মনে আমার রাশিচক্র দেখছেন। আমি ভাবছি কার সাধ্য আছে, আমার কি হচ্ছে তা বলতে পারে? আমার বয়সই আমার বর্ম।
জ্যোতিষী বললেন, “আপনি কি জানতে চান?”
“আমার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কিছু বলুন—অতীত শুনতে চাই না—অবশ্য জীবনের আর বেশি বাকি নেই, তাই ভবিষ্যৎও নেই।”
“তা নয়, আপনি অনেক দিন বাচবেন। আর খুব শীঘ্র, আমি তারিখ বলছি, লিখে দিচ্ছি, ১১ই এপ্রিলের মধ্যে আপনি সমুদ্র পার হবেন—বিদেশ যাবেন।”
“কি করে যাব, আমার কাছে তো টাকা নেই?”
“চেষ্টা করুন, নিমন্ত্রণ আসবে, টাকা আসবে।”
“আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি, একে আমার পরিচয়টাও দিই নি, এত কথা বলে কি করে? “তারপর? বিদেশে গিয়ে আমার লাভ কি হবে?”
“সেখানে গিয়ে একজনের সঙ্গে আপনার দেখা হবে, সারাজীবন আপনি যার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।”
আমি যথাশক্তি নির্বিকার থাকতে চেষ্টা করছি—গম্ভীরভাবে বললাম-“সে লোকটি কি রকম?”
“ম্লেচ্ছ।” চমকে উঠেছি আমি, সাবধানে কথা বলছি।
“ম্লেচ্ছর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বিশেষত্বটা কি?”
ভদ্রলোক এবারে একটি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করলেন, “রোমান্টিক”।
“হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ” —আমি হাসছি—“জ্যোতিষীমশায়, আপনি কাকে কি বলছেন? আমার চুলের দিকে দেখুন, বরফ পড়েছে সেখানে।”
আমার হাস্যোচ্ছাসে তিনি বিরক্ত, “আমি কারু চুল, দাঁত বা নখ দেখি না, আমি তার গ্রহনক্ষত্রের দিকে দেখি।”
এবার আর সন্দেহ নেই—‘অনাদিকালের এই আছিল মন্ত্রণা’ তেতাল্লিশ বছর পরে মির্চা ইউক্লিডের সঙ্গে অমৃতার দেখা হবে। এ গভীর রহস্যের অর্থ বোঝার সাধ্য কি আমার, সামান্য আমার?
“জ্যোতিষীমশায়, আপনি তো এক ভয়ানক কথা বলছেন”, হালকা সুরে কথা বলছি আমি, “যদি এমন ঘটনা ঘটেই তাহলে অপমান হবে না আমার। নিন্দা হবে না?”
“না, না, নিন্দা হতে যাবে কেন?”
“কেন নয়? এ বয়সে রোমান্টিক দেখা হওয়া ভালো?”
“কেন নয়? কেন নয়?” ভদ্রলোক বিরক্ত, “অপমান হবে কেন? মানহানি যোগই যে নেই।”
আমার নিমন্ত্রণ এল, টাকাও। একে একে সব জটিল গ্রন্থি খুলে যাচ্ছে, যাবার পথ সহজ হয়ে আসছে। কি আশ্চর্য—কে আমাকে হাত ধরে এই অজ্ঞাত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? সাধারণ একটি বাঙালী ঘরের মধ্যবিত্ত সংসারের মধ্যে বসে জীবন এত বদলে যেতে পারে? আমার বন্ধুরা বলছে এই জীবনোপন্যাসটা লিখতে। মির্চা যা লিখেছে সেই অসমাপ্ত কাহিনী সমাপ্ত করা উচিত। জীবনে যখন সমাপ্ত করতে চলেছি সেই উনিশ শ’ ত্রিশ সালের আরম্ভকে, সাহিত্যেই বা হবে না কেন? এই তো এসেছে সেই ‘last of life for which the first was made
জীবনী লেখার কথা হলেই আমি রবীন্দ্রনাথের কথাই ভাবি।
বার্ধক্যে বাল্যকালের কথা স্পষ্ট করে মনে পড়ে। তাকেও দেখতাম সর্বদা অল্পবয়সের গল্প করতেন। সেই থেকেই তো ছেলেবেলা লেখার সূত্রপাত। আমি তখন অনেকবার তাঁকে বলেছি, আপনার জীবনটা লিখুন—এখন না হোক পরে প্রকাশিত হবে। বার বার বলছি অন্তৰ্জীবনটা লিখুন। তিনি বলতেন “অন্তৰ্জীবনই তো লিখছি—আর কি শুনতে চাও, আমার রোমান্টিক লাইফ? “আমি শুধু নয়। অনেকেই শুনতে চাইবে। আপনার এই দীর্ঘজীবনে কত মানুষ আপনাকে ভালোবেসেছে, বাসবে না কেন? ভালোবাসার যোগ্য আপনি, আপনি সামনে থাকলে তো আর ও বাড়ির পঞ্চাননকে ভালোবাসা যায় না। কিন্তু সেই ভালোবাসাকে আপনি যে ভাবে মর্যাদা দিয়ে, তাকে যথাস্থানে রেখে তার মাধুর্য বিকাশ করে, তার থেকে যতটুকু গ্রহণীয় তা নিয়ে তাকে সার্থক করেন এও একটা কবিতা এবং এ কবিতা আপনার রচনার চেয়ে কম সুন্দর নয়। কম আশ্চর্য নয়। এ যদি আপনি না লেখেন—এ তো হারিয়ে যাবে।” আমি তাকে আরো বলতুম—“এর পরে আপনার জীবনের বহু অর্থবহ ঘটনা যেমন তেমন লোক তাদের নিজের মনের মাপে বুঝবে–ইতরজনের জন্য ইতরভাবে লিখবে যার নাম রিসার্চ-আপনি মানুষটি কি তা যারা কিছুই জানে না, তারাই আপনার জীবন লিখবে— এবং লিখবে তাদের খাট কলমে, ছোট মনের ছোট ছোট ছায়া ফেলে। আপনার সবচেয়ে বড় কাব্যটি হারিয়ে যাবে।”
তিনি বলতেন, “যা যাবার তা যাবেই, আমার কতটুকু রাখতে পারবে তুমি? রাখতে পারবে এই শরীর? আমার এই হাতখানা কি রাখা সম্ভব হবে? যা যাবার তা চলে গিয়ে যা থাকবার তা রইল আমার গানে কবিতায়।”
তিনি আরো বলতেন,-যে পথ দিয়ে চলে এসেছি সে পথে আর ফেরা যায় না, সে বড় বেদনা।আজ বুঝতে পারছি সে কথার অর্থ, যখন পিছনের দিকে তাকিয়ে আমার বর্তমান বেদনার ভারে দিশাহারা।
