কার, এ করুণা বুঝিনা বুঝিনা আর
কার হাতে আছে অফুরাণ ভাণ্ডার
জল নেমে যাওয়া ভাটার কাদার পরে
গান কে জাগায় জল কল্লোল স্বরে
কী সৌভাগ্য কী সৌভাগ্য হায়
কে পাঠায় ডাক অজ্ঞাত মোহানায়—
এই অজ্ঞাত মোহানার দিকে তাকিয়ে আমি আর কাউকেই নয় আমাকেই লাভ করছি—যাজ্ঞবল্ক্য যা বলেছেন, মানুষ অন্য কাউকে কিছু দিতে পারে না, নিজেকেই দেয়—আত্মনস্তু কামায় পুত্রঃ প্রিয়ঃ ভবতি—পতির প্রতি প্রেম, পুত্রের প্রতি প্রেম সব আমাদের নিজের জন্যই, আমার আত্মাকেই তা পূর্ণ করছে। ওকে মনে পড়ে আমি আর কাকে কি দিলাম—এ জগতকে দেখবার একটি তৃতীয় নয়ন আমিই লাভ করলাম।
আমার আত্মীয়দের মধ্যে কারু কারু ধারণা যে, যে-স্মৃতি আমি এই চল্লিশ বছর ভুলে দিব্যি ঘরসংসার করেছি আজ এই বয়সে হঠাৎ তা মনে জাগিয়ে তুলবার কি হল—এবং কেনই বা আমি মনের জোর করে তা ভুলে যাচ্ছি না। এর কোনো উত্তর আমার জানা নেই। শুধু আমি অন্তরে বুঝতে পারছি কায়াহীন এই প্রেম আমার দেহে মনে এমন আশ্চর্য সঙ্গীত বাজাচ্ছে যা আমি এতদিন জানতাম না, যা পথে কুড়িয়ে পাবার বস্তু নয়। কৃষ্ণপ্রেম কি চাইলে মেলে, অনুরাগ না হলে হৃমলে—কৃষ্ণপ্রেম কিন’কড়া ছ’কড়া, কুড়িয়ে নেবে যারা তারা?
সেরগেইর কথা ঠিকই, এর মধ্যে অমরত্বের সংবাদ আছে, সুরের মধ্যে অশ্রুজলের আভাসে, প্রেমের মধ্যে চির অতৃপ্তি বসে থেকে যে অশেষের সংবাদ দেয় আমি তাই পাচ্ছি। আমি কোনো মতেই আর ভুলে যেতে চাই না।
তাছাড়া আর অন্য যে যাই বলুক আমার স্বামী তো বলেন না। তার সঙ্গে আমার কথা হয়, তিনি আমাকে বলেছেন সেদিন যে, সংসারে ঠিক একই ঘটনা দু জায়গায় ঘটে না, প্রত্যেকটি ব্যাপারকে আলাদা বিচার করতে হয়—“এটা তো সত্যিই যে তোমার জীবনের সব অংশের সঙ্গে আমার যোগ নেই, তুমি যখন কবিতা লেখ কি ভাব আমি জানি না, তোমার লেখার জগও আমার পরিচিত নয়, তোমার কর্মের জগৎও সবটা আমি জানি না, তেমনি এও তোমার একটা ভাব, এতে আমর ক্ষতি কি?” আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি যে উনি কোনো ক্ষয়ক্ষতি অনুভব করছেন না। যদি করতেন তাহলে আমার ভারি মুশকিল হত। আমি তো ওকে দেখতে যাবার কথা ভাবতেই পারতাম না। কারণ আমার স্বামীর মনে কষ্ট দিয়ে আমি কখনো কোনো মূল্যবান বস্তু পেতে পারি না, তাহলে যে ভালোবাসা লাঞ্ছিত হবে তার মতো আর পাপ নেই—সেই পাপের পসরা মাথায় নিয়ে আমি কি তীর্থযাত্রায় যেতে পারি?
ক্রমে ক্রমে এমন অবস্থা হচ্ছে যে আমার কাজকর্ম করাই মুশকিল হচ্ছে। বাইরের লোকজনের সঙ্গে নানা বিষয়ে আমি কথা বলব কি করে? দিল্লী চলেছি কাজে, এখন, সেখানে গিয়ে ডেপুটি-সেক্রেটারীর ঘরে বসে যদি আমার চোখে জল আসে তাহলে উপায় হবে কি? আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি স্বাভাবিক মন ফিরিয়ে আনতে। আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকি, আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে, ভৃত্যরা ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে যায় আমার এ বয়সে চোখ দিয়ে জল পড়ার একমাত্র কারণ হতে পারে পুত্রবধূর সঙ্গে কলহ! আমার বয়সী শ্বমাতাস্থানীয় সমস্ত বঙ্গমহিলার সেটি একটি কর্তব্য, ভৃত্যকুল সে রকম তো কিছু দেখছে না। তাছাড়া কোনো দুঃখজনক ব্যাপার ঘটলে তার, আলোচনা শোনা যায়। বাড়ির সকলকেই তা স্পর্শ করে, কিন্তু তাও নয়। সকলেই তো মানুষ, ওরাও আমার অস্বাভাবিক অবস্থা লক্ষ্য করছে এবং কিছু বুঝে উঠতে পারছে না—আমিও লজ্জা পাই কিন্তু আমার মন আমার বশে নেই, একেবারে নেই। যেতে যেতে সামনে দেখি একটা গাড়ি চলেছে, আমার মনে হয় নেমে যাই। ওর মধ্যে হয়ত সে আছে, আর কেউ বিদেশে যাচ্ছে শুনলে আমার মন হু হু করে ওঠে। এই অসহ বিরহভার আমার বৃদ্ধ শরীর বহন করতে পারবে না বলে আমার ভয় হয়—অসুস্থ হতে আমার ইচ্ছা নেই তাহলে ওর সঙ্গে আর দেখা হবে না। কিন্তু আশ্চর্য আমার শরীর ভালো হয়ে গেছে—এই ক’মাসই না আমার হার্টে কষ্ট হয়েছে, না ব্লাড প্রেসারের।
যারা আমাকে বলে একটু চেষ্টা করলেই তুমি এই স্মৃতির প্রকোপ থেকে উদ্ধার পেতে পার, তাদের সঙ্গে আমি মনে মনে তর্ক করি, প্রশ্নোত্তর করি। কারণ এ প্রশ্ন আমারও। তারা বলে তুমি যত ভাববে তত তোমায় এ-চিন্তা পেয়ে বসবে তুমি কষ্ট পাবে। অজ্ঞ জনের বিজ্ঞের মতো এ কথা সাধারণভাবে সত্য হলেও এ ক্ষেত্রে সত্য কি? চল্লিশ বছর যা আমাকে উদ্বিগ্ন করে নি, যখন আমার বয়স কম ছিল, যখন হয়ত কোনো সম্ভাবনাও ছিল, তখন যার স্মৃতি মনের উপর ছায়ার মতো ভেসে গেছে আমাকে তার বজ্রমুষ্টিতে ধরে নি, যেমন প্যারিসে যখন শুনলাম ও দুটো ব্লক ওদিকে থাকে তখন আমি পোপেস্কুর সঙ্গে ওকে দেখতে যেতে পারতাম—তারপর? তারপর কি হত কে জানে। আমার তখন বয়সই বা কত ছিল? যদিও আমি ভাবছিলাম আমার মেয়ের বিয়ে দিয়ে এসেছি আমি তো বৃদ্ধা একজন—আমরা বাঙালী মেয়েরা ঐ রকমই ভাবতে অভ্যস্ত কিন্তু আমার বয়স ছিল চল্লিশ মাত্র। এখন ষাটের ঘরে পঁড়িয়ে বুঝতে পারি যে ও বয়সটা বেশি নয়।
অথচ তখন তো এমন করে হৃদয় মন্থন হল না, এখন কেন হচ্ছে তবে এই বৈতরণীর ঘাটে দাঁড়িয়ে? বৈতরণীর ঘাট? এটা আমি বলছি, জানি বলেই বলছি, এটা কথার কথা, বয়সের অনুভূতি আমার হচ্ছে না, আমার বার্ধক্যের খোলস ঝরে পড়ে গেছে। এ কি কেউ ইচ্ছে করে করতে পারে? বা ইচ্ছে করেই বন্ধ করা যায়? মির্চা ইউক্লিড যেদিন আমার বাবার টেবিলের সামনে বসেছিল, বাবা বললেন, এই আমার ছাত্র, এখানে থাকবে, সে কি তিনি ঘটিয়েছিলেন? আর ১লা সেপ্টেম্বর যে সেরগেই সিবাস্টিয়ান এল তাকে কি আমি ডেকে এনেছিলাম?—“অনাদিকালের এই আছিল মন্ত্রণা’—যেদিন পৃথিবী নেবুলা ছিল, তখনকার সঙ্গে কার্যকারণে যুক্ত এই ঘটনা! এই কথাই ডি প্রফাণ্ডিস কবিতায় আছে—“Where all that was to be in all that was.’
