আমি ওকে দেখছি, ওর সঙ্গে কথা বলছি, ওর সঙ্গে ঝগড়া করছি—আমার ঝগড়ার কারণ রিণা আমাকে বইটা শোনাচ্ছে। বইটাতে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যা। আমাদের জগৎটা ও বুঝতেই পারে নি। আমি ওকে বলছি তুমি মনেও করো না মির্চা, যে তোমার বই পড়ে তোমার স্মৃতি জেগে উঠেছে বলেই পড়ছি তা একেবারেই নয়, আসলে স্মৃতি প্রাণ পেয়েছে বলেই তোমার লেখা পড়লাম। না হলে আগেও তো কতবার শুনেছি, কখনো ইচ্ছেও হয় নি পড়বার। এই বই পড়ে স্মৃতি তো জাগবে না, স্মৃতি বিভ্রান্ত হবে, কারণ বইটা সত্যের মুখোশ পরা কল্পনার বিকার। ও ধরেই নিয়েছিল আমার মা বাবা ওর মতো একটি পাত্র ধরবার জন্য ফাদ পেতেছেন। আমিও সেই ফঁাদের একজন কারিগর, এরকম, একটা কথা প্রথমেই ধরে নিয়েছে বলে ও আমাকেও বুঝতে পারে নি। বুঝেও বুঝতে পারে নি আমার মন। আমি তো কোনো দিন বলিই নি ওকে আমার মনের কথা। তা তো বলাই হল না, সময় পাওয়া গেল না, তাই ও আমার মুখে এমন সব কথা ঢুকিয়েছে যা আমি বলতেই পারি না, যা আমার ভাষাই নয়। ওর অতৃপ্ত মন যা পায় নি বইতে তারই আয়োজন করেছে। সাইকোলজিতে এর একটা নাম আছে, কি নাম তা জানি না, আমি ঐ বিদ্যাটার অনুরাগী নই—মানুষের অপার রহস্যময় মনের নাবিক হতে চাওয়া স্পর্ধা মাত্র। তবু আমি বুঝতে পারছি ওর মন, এ মন আমার বিপরীত, মিথ্যার দরজা দিয়ে কখনো সত্যের সামনে পৌঁছনো যায় না। মিথ্যার জজ্ঞাল দিয়ে সত্যের মুখ ঢাকা থাকে, তাকেই তো অপাবৃত করতে হবে। সেইজন্যই এই কলম ধরেছি।
বই পড়ছি আর ওকে সমালোচনা করছি, আমি জানি বাবার উপর রাগ করবার ওর সঙ্গত কারণ আছে, কিন্তু যার এত নিন্দা করছে এই বইতে, যে নিন্দা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়, তাকেই আবার গুরু বলে বই উৎসর্গ করছে, তার শিষ্য বলে গৌরব করছে কি করে? এরকম মন আমি চিনি না, এ ‘ইউটিলিটেরিয়ান’ মন কিংবা কি রকম আমি জানি না। এই সমস্ত আলোচনা আমি ছোট্ট ছোট্ট বিষাক্ত তীরের মত ছুঁড়ে মারছি—কি আশ্চর্য সে তীর শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে, লক্ষ্যে পৌঁছচ্ছে না, ওর প্রতি আমার ক্রোধ যেন ছোট ছোট ঢেলা, আমার এই হৃদয় তরঙ্গের উপর স্থির থাকছে না, এক মুহূর্তে গড়িয়ে পড়ে তা ফসকে যাচ্ছে, সরে যাচ্ছে, তলিয়ে যাচ্ছে।
এতকাল যার কথা কিছু জানতাম না চারদিক থেকে যেন একটা চক্রান্ত হয়েছে, আমি নানা লোকের কাছে থেকে বার বার ওর খবর পাচ্ছি। এমন একটা, যোগাযোগের সৃষ্টি হয়েছে যে এই সময়টায় ভাগ্য আমাকে ওর কথা শোনাবে, জানাবে।‘স্মরণে’ একটা কবিতা আছে, মৃত পত্নীকে উদ্দেশ্য করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এ সংসারে একদিন নব বধূবেশে তুমি যে আমার পাশে দাঁড়াইলে এসে, রাখিলে আমার হাতে কম্পমান হাত, সে কি অদৃষ্টের খেলা সে কি অকস্মাৎ, শুধু এক মুহূর্তের নহে এ ঘটনা, অনাদিকালের এই আছিল মন্ত্রণা।
আমরা নিজেরা কি কিছু করি? না আমরা সূত্রবদ্ধ ক্রীড়নক? এতদিন যার চিহ্নমাত্র ছিল না, হঠাৎ সে কি করে এত বড় হয়ে দাঁড়াল, আর ঠিক এখনই কেন বার বার ওর খবর পাচ্ছি।
আমার বন্ধুর স্বামীর সঙ্গে ওর দু বছর আগে দেখা হয়েছে, আর আমি এখন সে কথা শুনলাম। তিনি বলেছেন, অধ্যাপক ইউক্লিড খুব চমৎকার মানুষ আর কলকাতার কথায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। কলকাতার অনেক রাস্তা ওর চেনা, আমাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘বকুলবাগান রোডটা’ দেখেছি কিনা। চল্লিশ বছর আগে তিনি কলকাতায় ছিলেন কিন্তু তার সব মনে আছে, কলকাতা তাঁর স্বপ্নের দেশ।।
আমি ওর কথা আরও শুনেছি, ও এক কল্পনার জগতে বাস করে। ভারতই ওর ধ্যানের বস্তু। ওর লেখার মধ্যেও বাস্তব জগতের চেয়ে কল্পনার ও অলৌকিকের স্থান বেশি। ও নিজেকে ভারতীয় বলে।
আমি যত ওর খবর পাচ্ছি তত আরো উতলা হয়ে উঠছি। আমি ভালো করে বুঝতে পেরেছি ওর সঙ্গে একবার দেখা না হলে আমার এ যন্ত্রণা কিছুতে দূর হবে না। অথচ আমি এও ভাবি, আমি দেখব কাকে? সেই তেইশ বছরের ছেলেটি কোথায়! আর সে-ই বা দেখবে কাকে? কোথায় সেই যোড়শী কন্যা! ও তো আমাকে দেখতে চায় না, কাজেই ও কাকে দেখবে তা নিয়ে আমি ভাবি না কিন্তু আমি যাকে দেখতে চাই, তাকে পাব কোথায়? আমি কি একজন তেইশ বছরের বালককে দেখতে চাই? বালক? নয়তো কি? আজকের আমার কাছে বালক, আমার নাতি হতে পারে। যদি আজ তেইশ বছরের মির্চাকে দেখতে পেতাম তাহলে নিশ্চয়ই তার সঙ্গে আমার সৌহার্দ্য হতে পারত না। অন্যদিকে আমি আজ যাকে দেখতে পারি সে মির্চা তো বৃদ্ধ, তাকে তো চিনিই না—সে তো একজন অপরিচিত, আগন্তুক, তাকে দেখে আমি কি করে শান্তি পাব? আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না আমার অতন্দ্র রাত্রির এই ব্যাকুলতা যা অহরহ কোনো অকারণ বেদনায় অনির্দেশ্য অভিসারে বেরিয়ে পড়তে চায় সে কি কোনো অপরিচিত একটি ব্যক্তির জন্য হতে পারে? না এ আর কোনো অবস্থান থেকে আর কোন শক্তি আমায় ডাকছে, অজ্ঞাত ভবিষ্যতের দিকে? এমন কি কেউ থাকতে পারে, যিনি সব জ্ঞান, সব প্রেমের কারণ। সেখান থেকেই বার্তা আসছে? আমার চিরসংশয়ী মন এসব কথা মানতে চায় না, অথচ সন্দেহও ছাড়ে না।
আমার এই জীবনসায়াহ্নে প্রত্যুষের আলো এসে পড়েছে। সকাল সন্ধ্যা এক হয়ে গেছে, সময় যেন চিরস্থির।
মাঝে মাঝে সেরগেইর কথা আমার মনে হয়—এই কি অমরত্বের আস্বাদ? আমার সেই ছোটবেলার কবিতাটা আমি এতদিনে বুঝতে পারছি—কি মনে করে তখন লিখেছিলাম তা জানি না—‘কালের যবে হারিয়ে যাবে মুহূর্ত নিমেষ—’ সেই সর্ব অভিজ্ঞানশূন্য কালের স্পর্শহীন আলিঙ্গনে আমি বিধৃত, আমার অতীত ও বর্তমান এক হয়ে গেছে—এ তো অমরত্বই। তাই যদি হবে, তবে এত কষ্ট পাচ্ছি কেন? চোখের জলে দিশাহারা? আমি বুঝতে পারি না সত্যই এটা কষ্ট না অমৃতের স্বাদ। যদি কষ্ট হয় তবে তো নিষ্কৃতি চাইব—আমি কি নিষ্কৃতি চাই? আমি কি ভাবতে পারি এই কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা শূন্যে মিলিয়ে যাক, আমি আবার আমার ঘর-সংসার বিষয় সম্পত্তি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকি? আমার বয়সে লোকেরা সকলেই তো তাই আছে। তারা কল্পনাও করতে পারে না, নাতি নাতনী পরিবৃত হয়ে, বাস্তব সংসারে বসে কেউ এমন একটা স্বপ্নের জগতে চলে যেতে পারে—দেহহীন, স্পর্শহীন শুধু একটা অস্তিত্বের সংবাদ তার চারপাশের দেওয়ালগুলো তুলে নিয়ে যেতে পারে। সংসারের ঘর্ষণে মানুষের মনে কড়া পড়ে যায়—বৈষয়িক মন তখন হিসাব কষে, আমারও তো তাই ছিলবাড়িঘরই তো করলুম এত দিন, কাণাকড়ির হিসাব করেছি, আর আজ? এখন এই মুহূর্তে যদি কেউ বলে সব ছেড়ে শূন্য হাতে চলে এস তাকে দেখতে পাবে, আমি কি যাব না? আমায় যদি কেউ বলে থিয়েটার রোডে একটা চারতলা বাড়ি চাও, না ওকে একবার দেখতে চাও, আমি কি বলব তাতে কোনো সন্দেহ আছে? এই যে অদ্ভুত পরিবর্তন হয়েছে, এতে আমি অসুখী নই, আমি কখনো চাই না এটা নষ্ট হয়ে যাক। আমার বয়সের কোনো মানুষের মন অনুভূতির এই তীব্রতা ফিরে আসা আমি সৌভাগ্য বলেই মনে করি।
