রাত্রি গভীর হয়েছে, আমি শুনলাম ঢং-ঢং করে দুটো বাজল। আমি দেখতে পাচ্ছি শান্তি আমার পাশে শুয়ে আছে—নিচে পিয়ানো বাজছে তো বাজছেই। বিছানায় এপাশ ওপাশ করছি আমি—“ভাই শান্তি, ঘুম আসছে না রে!”
“আমারও না। ইউক্লিডদা পিয়ানো বাজিয়েই চলেছে।”
“দেখ তো কি অন্যায়।” আমি উঠে বসেছি বিছানায়—
“যাই ওকে বারণ করে আসি—“
শান্তি বলছে—“না না, এখন না কাল কোরো।”
আমি খাট থেকে নেমে পড়েছি, একটা অব্যক্ত আকর্ষণ আমাকে ওর দিকে টানছে বাজনাটা যেন মন্ত্র, আমার সত্তা মন্ত্রাবিষ্ট হয়ে গেছে। আমি একবার এখনই ওর কাছে যাব, যাব, না যেয়ে উপায় নেই, ও ডাকছে, আমাকে ডাকছে, আমি দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শান্তিও উঠে পড়েছে, “কি করছিস রু?”
“একটু বলে আসি বাজনাটা থামিয়ে দিক।”
“পাগল হয়েছিস নাকি, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখ দুটো বেজেছে, এত রাতে কখনো যায়?”
“যদি রাত আটটায় যাওয়া যায় তাহলে দুটোয় গেলে কি হয়?”
“তা যায় না। পুরুষ মানুষের ঘরে রাত্রে কখনো যায় না।”
“তুমি যে যাও?”
“আমি আবার কোথায় যাই, আচ্ছা মেয়ে তো।”
“সব ঘরে যাও, কাকার ঘরে, বাবার ঘরে”
“রাত দুটোয়? কখনো না, তাছাড়া আমরা তো আত্মীয়-” আমার রাগ হচ্ছে, রীতিমত রাগ হচ্ছে, আমি ওর হাতটা সরিয়ে দিয়ে দরজার দিকে এগোচ্ছি—আমি যাবই। একটু গিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলে আসব, এখন বাজিও না। তাতে কি দোষ হবে? শান্তির আস্পর্ধা বেড়ে গেছে। ছড়ি ঘোরাচ্ছে আমার উপর। শান্তি দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছে, আমায় যেতে দেবে না।
“তোমার বাড় বেড়েছে, না? নিজেকে মনে করেছ কি?” আমি ওকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছি। শান্তিরও রাগ হয়েছে, ও বলছে “কি মনে করেছি নিজেকে? দেখবে কি মনে করেছি, ডাকব মামীমাকে?”
সাপের মাথায় মন্ত্র পড়ে গেছে, আমি বালিশে মুখ গুজে কাঁদছি।
“ভাই শান্তি তুই তো জানিস আমাদের মধ্যে কি হয়েছে—এতে পাপ হচ্ছে না তো?”
শান্তি গালে হাত রেখে ভাবছে, “তা হচ্ছে বৈকি।”
“কার হচ্ছে? ওর না আমার?”
শান্তি চিন্তান্বিত, “আমার তো মনে হয় দুজনেরই হচ্ছে।”
“কখনো না কিছুতেই না। আমার কেন পাপ হবে, আমি কত ওকে বারণ করি।”
“তাহলে ওর ঘরে যেও না আর।”
আমার মুখের অবস্থা দেখে শান্তি গলে গেছে—“পাপের ভাবনা ভাবছ কেন ভাই? তোমার যা ইচ্ছা কর, সকালবেলা যেও, আমি কখনও কাউকে বলব না।”
এটা কিন্তু উনিশ শ’ তিয়াত্তর সালের জানুয়ারী মাস, ঘড়িতে দুটো বাজছে ঢং ঢং। আমি বিছানায় উঠে বসেছি, আমার মনে হচ্ছে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে যাই, নৈলে শান্তি আমায় আটকাবে। আমি খাট থেকে নামতে যাচ্ছি–কে বললে, “কোথায় যাচ্ছ?”
“নিচে–” “নিচে কোথায় যাবে, রাত্রি দুটো বাজে”—“দুটোই বা কি আর আটটাই বা কি”, পিছন থেকে শান্তি আমায় ধরেছে—আমি হাত ছাড়িয়ে নিতে গেলাম, আর তখনই বুঝতে পারলাম এটা তিয়াত্তর সাল আর আমাকে ধরে আছেন আমার স্বামী, শান্তি নয়। আমি কাপছি, ভয়ে কাপছি, একি বিপদ হল আমার—সময়হারা হয়ে গেলাম—আমি আমার স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম, “বাচাও, আমাকে বাঁচাও—তুমি ছাড়া আমাকে কে বাঁচাবে, আমার মহাপাপ হচ্ছে—তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি।” উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছেন, “আমার কোনো কষ্ট নেই। শুধু একটি কষ্ট এই যে তোমাকে শান্তি দেবার কোনো উপায় এখন আমার হাতে নেই। তবে যেটুকু আছে আমি করব। তুমি নিশ্চয়ই যাবে, একবার গিয়ে তাকে দেখে আসবে।”
“কি হবে যদি সবাই জেনে ফেলে?”
“কি করে জানবে, জানবে কেন?”
“আমিই হয়তো বলে ফেলব, আমার কিছু মনে থাকছে না, কিছু না, কে আমাকে ডাকছে বল তো, কে ডাকছে? সে কি একজন আগন্তুক হতে পারে? আজ বেয়াল্লিশ বছর যাকে আমি দেখি নি সে তো stranger একজন। মির্চা নিমিত্ত মাত্র, অন্য কেউ আমার সমস্ত মনটাকে বদলে দিচ্ছেন, আগুন যেমন জলকে বদলে বাষ্প করে দেয় তেমনি সম্পূর্ণ পরিবর্তন অনুভব করছি। সে বলছে সত্যকে দেখ, সত্যকে দেখ, জানি আমার এ ভাবটা বেশি দিন থাকবে না। আমি সংসারে ফিরে আসব, আসতেই হবে, কিন্তু আজ এই মুহূর্তে তুমি বিশ্বাস করবে আমি কতখানি বদলে গেছি? আমি রমাকেও ক্ষমা করে দিয়েছি, ওর উপর একটুও রাগ নেই আমার। ওর অল্প বয়সের কথা মনে পড়ছে, তখন ও খুব মিষ্টি মেয়ে ছিল, ও আমার মার সব কেড়ে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু নিজেও কষ্ট পেয়েছে। শুধু বাইরের জিনিস পেল বলে ও ক্রমাগত অসঙ্গতভাবে পাগলের মত বাবার। বইগুলোর মধ্যে নিজের নাম ঢোকাচ্ছে—যে ব্যক্তির আমাদের মত ছ’টা সন্তান চোখের সামনে দপ দপ করছে, যার প্রতিপ্রাণা স্ত্রী বর্তমান, তার কতটুকু বেচারা পেয়েছিল বল তো? ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গিয়ে এসব ভাবি, জানো রমাকেও হয়ত এখন ভালোবাসতে পারি, বিশ্বাস করো, ওকে ভালোবাসছি আমি। রমাকে একদিন আমি বলেছিলাম, যাকে ভালোবাসা যায় তাকে কি কেউ নিন্দিত, অপমানিত করতে পারে? কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে রমা তো নিমিত্তমাত্র—এ কার খেলা খেলছি আমরা? যা বাইরে থেকে ক্ষতি মনে হয়, অন্তরের দিক থেকে তাই হয়ত লাভ। হেথায় যা মনে হয় শুধু বিফলতাময় অনিত্য চঞ্চল, সেথায় কি চুপে চুপে অপূর্ব নূতন রূপে হয় সে সফল? বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বাবাকে বলেছিলেন, তোমার পতন হবে’, পতনের বীজ বাবা সঙ্গে করেই এনেছিলেন, সে তার আকাশস্পর্শী অহং—আমরা সর্বরকমে সেই অহংটাকেই রক্ষা করতে চেয়েছি—আমরা কত সময় ভেবেছি, বাবা কেন এ দেশের প্রেসিডেন্ট হলেন না, তার কি ক্ষমতা কম ছিল? শুধু ওরই জন্য সর্বস্ব খুইয়ে ওরই আশ্রয়ে তার নামহীন, যশহীন অবস্থায় প্রাণ গেল। কিন্তু আজ আমি ভাবছি প্রেসিডেন্ট হলেই কি চুড়ান্ত লাভ হত? হয়ত তার চেয়ে বড় লাভ হয়েছে—হয়ত যাবার আগে সম্পূর্ণ অহংশূন্য হয়ে, মাথা নিচু করে গিয়েছেন, বাইরের দিক থেকে সমস্ত হারিয়ে হয়ত অন্তরের দিক থেকে উন্নত হয়ে তার সত্তার পূর্ণতা হয়েছে, তাঁর বিরাট প্রতিভার মধ্যে যে ত্রুটিটুকু ছিল হয়ত চোখের জলে তা ধুয়ে তিনি মহিমান্বিত হয়ে গেছেন। রমা এর নিমিত্ত হয়েছে, আমরা নয়। আজকে আমি বুঝতে পারছি এ জগৎটা আমরা যেমন দেখি এ তেমন নয় বুঝতে পারছি ‘ঢাকনা খোলার অর্থাৎ ‘অপবৃণু’ কথাটার অর্থটা কি—সত্যের মুখটা যে দেখাচ্ছে আমাকে সে কে? সে কখনো আমার পূর্বপরিচিত অর্ধবিস্মৃত একজন মানুষ মাত্র হতে পারে না।”
