“কষ্ট যদি পেতাম, তাহলে তুমি কি সুখী হতে পারতে?”
“তা তো ঠিকই—তবে এই অর্ধশতাব্দী পরে তোমার কষ্ট হচ্ছে তার জন্য? কি আশ্চর্য কথা বলছ গো?”
“হাঁ তাই, আমিও কম অবাক হই নি, একেক সময় আমার মনে হয় আমার মাথা খারাপ হয়ে যায় নি তো, এরকম কখনো হয়! আমার খুব অন্যায় হচ্ছে, তাই না? বল বল আমায়।” আমি কাঁদছি, কাঁদছি, অনেক দিন পরে স্বামীর সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে পেরে আমি যেন খোলা বাতাসে এসেছি—আমার কান্নাটা তাই মুক্তি।
“কি বলব তোমাকে ন্যায় কি অন্যায়, এমন ঘটনা কি আমি জীবনে দেখেছি, না শুনেছি, না জানি, আমি এর বিচার করবার কে? আমার দুঃখ শুধু এই যে, তোমার এত কষ্ট আমায় দেখতে হচ্ছে। কিন্তু জানো আমার মনে হয় তোমার ভালোই হবে, আমি বরাবর দেখে আসছি তোমার জীবনের ভিতরে একটা উদ্দেশ্য কাজ করছে।”
আমার স্বামীকে বলে আমি শান্তি পেলাম। কারণ ওর চেয়ে বড় সুহৃদ আমার আর কে আছে? আমার সকল অপরাধের ক্ষমা, সকল দুঃখের সান্ত্বনা ওর কাছে ছাড়া আর কোথায় পাব?
এই সময়ের কথা লেখা খুব কঠিন, কারণ লেখবার কোনো ঘটনা নেই—ব্যাকুলতা শুধু কবিতায় বা গানে প্রকাশ করা যায়, অন্য কোনো উপায়েই নয়। আমি আবার বহুদিন পর কবিতা লিখছি, গভীর রাত্রে যখন ঘুম হয় না আমি পাশের ঘরে বসে কবিতা লিখি। কোনো দিন তো ওর বিষয়ে কিছু লিখি নি। প্রথমে যা লিখেছিলাম ছিঁড়ে ফেলেছি, এখন লিখব, স্বীকৃতি দেব, স্বীকৃতি দিই নি বলেই এই দুর্ভোগ হচ্ছে আমার, আর কিছুই নয়। যার যা পাওনা চুকিয়ে দিতেই হবে।
সেরগেইর একটা চিঠি পেলাম—ওদের চিঠির পথ চেয়ে থাকি আমি, মনে হয় যেন ওরই খবর পাচ্ছি।
প্রিয় অমৃতা দেবী,
আপনি আমার উপর যে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন তাতে আমি এত অভিভূত হয়েছি। যা প্রকাশ করবার সাধ্য আমার নেই। আমি শুধু ভাবছি এ বিশ্বাসের আমি যোগ্য কি না। আমি ভাগ্যের খেলা দেখছি। আমি অবাক হয়ে গেছি, যা হয়ে গেছে আর আমাদের সাক্ষাতের পরে যা হল তাই ভেবে। ভারতে আমার মহত্তম অভিজ্ঞতা আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া। আমি যখন বালকমাত্র আমার ভাগ্যের সূত্রে বাঁধা হয়ে সেই সময়ের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ যুক্ত আছে। ঐ সময়ে আমি দুটি বই পড়েছিলাম— ‘অমৃতা’ ও ‘সাধনা এই দুটি বইয়ের গভীর প্রভাব আমার উপর পড়েছিল এবং ভারতীয় জগৎ আমাকে সারা জীবনের মতো মুগ্ধ করেছিল…আমি আপনাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হলাম—পড়তে লাগলাম, আমার বাকি জীবনটা ভালো বা মন্দ যা কিছু হয়ে উঠেছে তা এই জন্যই হয়েছে। অবশেষে আমি নিমন্ত্রিত হয়ে আপনার দেশে গেলাম—সেখানে আপনার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবার সৌভাগ্য হল। আপনার গভীর বেদনা দেখেই আমি বুঝলাম, আমরা কি, আত্মা কি। আমি এখন স্বীকার করছি যে যদিও আপনার চিঠি পেয়ে আমি অত্যন্ত বিচলিত বোধ করছি তবু তখনও আপনাকে দেখা মাত্রই আমি বুঝেছিলাম, আপনার ভিতরের অবস্থাটা কি।
আমি বুঝতে পেরেছিলাম এবং আপনাকে বলেছিলামও যে সময় ও বিস্মৃতি কেবল আমাদের চেতনার উপরের আচ্ছাদনটাই স্পর্শ করে কিন্তু আমাদের যথার্থ স্মৃতি এক পরমসস্তু (absolute) কাজেই আমরা এক ভাবে অবশ্যই অমর। আমার এই কথায় চিরকালই দৃঢ় বিশ্বাস কিন্তু মানুষ হিসাবে আমাদের প্রত্যেক জ্ঞেয় বিষয়ের প্রত্যক্ষ প্রমাণ দরকার হয়। আপনি আমাকে অমরত্বর অলঙ্ঘ্য ও বিপুল প্রমাণ দিয়েছেন। প্রমাণ পেলাম যে আমাদের চৈতন্য খুবই বাহ্যিকভাবে কালের দ্বারা আক্রান্ত হয়, ইচ্ছা করলে আমরা কালের প্রভাব কাটিয়ে কালজয়ী হতে পারি। বিস্মৃতিই মৃত্যু—এই বিস্মৃতিকে সরিয়ে রাখলেই অমরত্ব লাভ হতে পারে, আমরা ‘অমৃতা’ হতে পারি।
আপনার কষ্ট যতই প্রবল হোক আপনাকে বুঝতে হবে যে এ সংসারের সমস্ত কর্তব্য সুসম্পন্ন করে আপনি এখন ঈশ্বরের করুণার মধ্যে বাস করছেন (grace condition) এ অবস্থা দুঃখ সুখের অতীত অবস্থা। কেবল প্রেমই কালকে ও বিস্মৃতিকে জয় করতে পারে। মানুষের ধ্বংস হয়ে যায়, মানুষ কালের কাছে পরাজিত হয় যখন তার ভালোবাসার শক্তি, প্রেমের কালজয়ী শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। আপনার চিঠি পাওয়ার চেয়ে আনন্দ আমার আর কিছু নেই।…আমি সর্বদা আপনার বিশ্বস্ত বন্ধু থাকব।।
সেরগেইর চিঠিটা আমাকে ভাবাচ্ছে, সত্য কি, অমরত্ব কি? অমরত্বর আস্বাদ আমি পাচ্ছি কারণ যা মরে গিয়েছিল তার সঞ্জীবিত রূপ আমি মন দিয়ে ছুঁতে পারছি। ঐ যে অমল একগাদা কাগজ নিয়ে ঘরে ঢুকছে এটা কি বেশি সত্য, ঐ যে দেখতে পাচ্ছি লাইব্রেরী ঘরে ক্যাটালগের বইয়ের উপর ঝুঁকে আমরা ক্যাটালগ করছি তার চেয়ে? অতীত কি বর্তমানের চেয়ে মিথ্যা? সে কি কোথাও চলে গেছে, না কি এইখানে স্তব্ধ হয়ে আছে? মনের ঢাকনাটা খুলে গেছে—একে একে ছায়ামূর্তিরা উঠে এসে তাদের অস্তিত্ব বাস্তব করে তুলছে। এক এক সময় ভয় হয় আমার এই আবেগ যেন এক উষ্ণ তপ্ত প্রস্রবণ পৃথিবীর গহ্বর থেকে উঠে এসে চারিদিকের মাটিতে যা ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি যেন এক অজ্ঞাত গভীর থেকে এই দাহকারী প্রেম হঠাৎ উঠে এসে আমার চারিদিকের সযত্নরক্ষিত বাগানের উপর ছড়িয়ে পড়ছে। আমি ভয়ে ভয়ে আছি, হে ঈশ্বর এর ফুল পাতা শুকিয়ে যাবে না তো!
কখনো কখনো উনিশ শ’ ত্রিশ সাল আর উনিশ শ’ বাহাত্তর সাল এমন ভাবে মিশে যায় যে আমি বিপদে পড়ি—অনুভূতির এই প্রত্যক্ষতাকে আমি কিছুতেই ভাষা দিতে পারি না। কারণ এই ধরনের অভিজ্ঞতার জন্য হয়ত ভাষাই তৈরী হয় নি। এরকম তো সচরাচর ঘটে না, এক বছর আগেও আমাকে কেউ বললে আমার বিশ্বাস হত না। তবু আমি বলবার চেষ্টা করছি, যদি কোনো দিন এই জীবনোপন্যাস প্রকাশিত হয় তাহলে হয়ত মনোবিজ্ঞানীরা এর কারণ, উৎপত্তি সবই নির্ণয় করতে পারবেন।
