আমি সুমিতাকে লিখলাম, তোমাদের আর প্রতিবাদ লিখতে হবে না। আমার কাছে এখন এ সব ক্ষুদ্র সত্যমিথ্যা এক হয়ে গেছে। আমি আর কিছু চাই না, কিছুই নয়, শুধু একবার ওকে দেখতে চাই। এতদিন রেখেঢেকে লিখছিলাম, এখন জানাচ্ছি এই প্রেম পরম সত্য, এর কাছে আমার আজকের বাস্তব জীবন ছায়া হয়ে গিয়েছে—ওর যা খুশি লিখুক, সম্মানই হোক আর অসম্মানই হোক জীবনে এইটুকুই তো স্বীকৃতি দিয়েছে আমায়—ওর দেওয়া অপবাদও আমি মাথা পেতে নিচ্ছি।
তুচ্ছ ভয়টা আমার কেটে গিয়েছে কিন্তু আমি অবসাদে ভুগছি। সমস্ত জীবনটা যেন আমার হাত থেকে খসে পড়ে গেল—আমি শূন্য হাতে বসে আছি। আমি সেরগেইকে লিখলাম—“আমার মনে হয় সময়ের সমুদ্রতীরে এমবারকেশন কার্ড হাতে নিয়ে বসে আছি কিন্তু জাহাজ আসছে না। কতদিন আমি অপেক্ষা করব ভাই, ওকে না দেখে আমি মরতে পারব না।’
সুমিতার চিঠি পেলাম, ও লিখছে—
‘আপনার চিঠি পেয়ে কয়েকদিন এত অভিভূত ছিলাম যে কি লিখব ভেবে পাই নি। সেরগেইয়ের সঙ্গে কথা হল, সেদিন বললাম, truth is stranger than fiction! লেখক যখন ঐ উপন্যাসটি লিখেছেন, তখন কি জানতেন ভবিষ্যতের সত্য বর্তমানের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাবে। ঐ বইটির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ ছিল তুলে নিচ্ছি। সত্যি কথা বলতে কি উপন্যাসের শেষ অংশ ট্র্যাজিক কিন্তু আজকের ট্র্যাজিডি তার চেয়ে বড়। মানুষের জীবনশিল্পীর হাত আমাদের হাতের চেয়ে অনেক পাকা।…
সুমিতা আরও লিখেছে, ‘অনধিকারচর্চা যদি ক্ষমা করেন তো একটা কথা বলতে চাই—আপনি লিখেছেন এই অনুভূতি এত প্রবল যে আপনার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত ভেসে যাচ্ছেন, কিন্তু আপনার অন্তরের মধ্যে বসে যিনি সত্যকে স্বীকার করার নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নন?
বিনিদ্র রাত্রে আমি সেরগেইর সঙ্গে কথা বলি—সত্যিই সেরগেই তুমি কোথা থেকে পাতাল ফুঁড়ে উঠে আমার জীবনটাকে ওলটপালট করে দিলে? যে ক্ষতর মুখটা চল্লিশ বছর ঢাকা ছিল, আমি শান্তিতে, সুখে ছিলাম, আজ তার ঢাকনা খুলে গেল। এখন রক্তক্ষরণ বন্ধই হয় না, রক্তে ভিজে যাচ্ছে আমার বিছানা-বালিশ, আমার বিনিদ্র রাত্রির আকাশ রক্তে লাল হয়ে গেল–
চোখ চেয়ে দেখি আমার স্বামী বিছানায় বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন—তাঁর চোখে জল—“তোমার কি হয়েছে আমায় বলবে না?”
এঁকে বলতে হবে, অনেকদিন থেকে আমার বন্ধুরা বলছে, ওঁকে বলুন। আমার বন্ধুরা সকলেই আমার স্বামীকে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। তারা বরাবর বলছে, উনি খুব সহানুভূতির সঙ্গেই চেষ্টা করবেন আপনার সন্তাপ দূর করতে। কিন্তু আমি ইতস্তত করছি। আমি ভাবছি ওকে কষ্ট দেওয়া হবে। আমার কি অধিকার আছে এঁকে কষ্ট দেবার। কষ্ট কি না হয়ে পারে? আমাদের আটত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে যার অস্তিত্ব একে এক মুহূর্তের জন্য স্পর্শ করে নি, যার নামটাও ওর জানা নেই—অদেখা অজানা সেই ব্যক্তি কি হঠাৎ কোনো গুহা থেকে বেরিয়ে আসবে, বোতলের মুখটি ফাক হতেই যেন একরাশ কুণ্ডলীকৃত ধোয়া আকাশবিলম্বী হয়ে দৈত্য হয়ে গেল? এ সংসারের সঙ্গে যার কোনো যোগ নেই, যার কোনো চিহ্নই আমার চারপাশে কেউ দেখে নি, তেতাল্লিশ বছর আমি যাকে চোখে দেখি নি, বাল্যকালের সেই স্মৃতি কি আজ এত বাস্তব হয়ে ওর এতদিনের সংসারকে টলিয়ে দিচ্ছে? এটা কি উনি সহ্য করতে পারবেন? এই সব ভেবেই আমি বলি নি। গোপন করার জন্য নয়। কোনো কিছু গোপন করার মতো আমার মনের অবস্থা নয়। বাস্তব সংসার আমার কাছে মরীচিকার মতো হয়ে গেছে।
“আমি তোমাকে বলতে চাই, কিন্তু তোমার কষ্ট হবে।”
“তোমাকে কষ্ট পেতে দেখে, আরও কষ্ট হচ্ছে।”
তখন আমি আমার স্বামীকে সমস্ত বললাম। উনি স্তম্ভিত হয়ে গেছেন, “এই আটত্রিশ বছর আমরা পাশাপাশি আছি আমি কিছু জানতে পারি নি? তুমি আমায় বল নি কেন গো, বল নি কেন? এত কষ্ট পাবার তো কোনো দরকার ছিল না।”
আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। এরকম পরীক্ষায় কি কেউ পড়েছে কখনো। ইনি আমার জন্য এত করেছেন, আমাকে এত ভালোবাসেন, আমার সুখই ওর সুখ আর আজ এই বৃদ্ধ বয়সে আমি কিনা এঁর মাথায় আকাশ ভেঙে ফেলতে উদ্যত। যে সব দিয়েছে, সে কি দেখবে সে কিছু পায় নি, তা নয়, তা কখনই নয়, আমি কাঁদছি “বিশ্বাস করো আমি তোমায় ঠকাই নি।”
“সে প্রশ্নই ওঠে না, সে কি তোমাকে বলতে হবে, আমার কোনো বঞ্চনা কোথাও নেই, কখনো এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় নি যে এর চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে।”
উনি এখন অনেক কথা বলছেন, “আমি যা পেয়েছি তা অতুলনীয় অতুলনীয়, আমার কোনো ক্ষোভ নেই, শুধু দুঃখ এই তুমি এত কষ্ট পেলে। আর সেই ভদ্রলোক তাঁর জন্যই বেশি খারাপ লাগছে আমার।”
“ওর কথা ছাড়, প্রবঞ্চক, উচিত শাস্তি হয়েছিল।”
“ছিঃ, ও রকম করে ভাবলে তুমি শান্তি পাবে? শত হলেও তুমি তোমার মা বাবার কাছে ছিলে—আর বিদেশী একটি ছেলে, ঐ সামান্য বয়স, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাড়িয়ে দিলেন, সে বনেজঙ্গলে ঘুরতে লাগল, কি কষ্ট! তোমার বাবাকে ক্ষমা করা যায় না সত্যি।”
উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, আমি অবাক হয়ে দেখছি উনি কোনো ক্ষয়ক্ষতি অনুভব করছেন না। ক্ষয়ক্ষতি ওর হয়েছে কি?
“বিশ্বাস কর গো আমি এতদিন কষ্ট পাই নি, কষ্ট পেলে কি তুমি টের পেতে না? এই তো, পেলে।”
“তা ঠিক, কষ্ট পাও নি, আমি তো তোমায় কখনো কষ্ট পেতে দেখি নি।”
