সেরগেই বলেছে, জীবনে আপনাকে কিছুই দিতে পারলেন না বলেই সাহিত্যের মধ্যে তিনি তার অবিনাশী প্রেমকে অমর করতে চেয়েছেন। হায় ভগবান, মিথ্যা কি কখনো অমর হয়, মিথ্যা দিয়ে কি অমরত্ব সৃষ্টি হয়? আমি ভাবছি ঐ ব্যক্তি, যার স্মৃতি আমি মনের গভীরে গোপনে গচ্ছিত ধনের মতো রক্ষা করেছিলাম, যার নাম কেউ কোনোদিন আমার মুখে উচ্চারিত হতে শোনে নি, সেই আমাকে লোকের চোখের সামনে উলঙ্গ করে ফেলেছে। এবং যদিও আমার চিঠির উত্তর দেবার তার সাহস নেই, গত চল্লিশ বছর ধরে আমার মাংস বিক্রি করে টাকা করেছে। এই হচ্ছে পাশ্চাত্য দেশ! কিন্তু আমি কি করে তোমাদের বোঝাই যে এই ভয়টা ভাবনাটা মনের একটা স্তরের, এটাই আমার প্রকাশ্য মন নাড়াচাড়া করছে—আর গুহায়িত গহ্বরেষ্ঠ আর একটা ভাব আছে সেটা একেবারে অন্য।
দিনের পর দিন কাটছে, রাতের পর রাত আমি বিনিদ্র। আমার এত দিনের সংস্কার সম্ভ্রমবোধ সমস্ত যেন পুড়তে শুরু করেছে। একটা ভয়ের শিখা অন্তস্থল থেকে উঠে চারদিক দগ্ধ করতে করতে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আমি একটু একটু করে গলে যাচ্ছি, মোমবাতির মতো গলছি, আমার দেহমন জুড়ে আলো ছড়িয়ে পড়ছে আর বিন্দু বিন্দু করে গলে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমার অহং, আমার দর্প, সাধুতার গর্ব, আমার সম্মানস্পৃহা—এতদিন যা কিছু মূল্যবান বলে ভেবেছি সবই ঐ শিখার মুখে জ্বলছে— এই অনির্বচনীয় অবস্থা শুধু গানেই বলা যায়—‘সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে। আমি বুঝতে পারছি যুগযুগান্তরের সংস্কার দিয়ে গড়া আমার এই অহংটা সত্যিই একটা মোমবাতির মতো ছিল, শক্ত ঋজু অনমনীয়, আজ ভয়ের ঐ তীব্র শিখাটা তাকে একটু একটু করে গলিয়ে ফেলেছে কিন্তু ওটা কি ভয়ের শিখা? পাছে আমার অখ্যাতি হয় সেই ভয়? আমি কি লোকনিন্দার ভয়ে কাতর? গভীর রাত্রে উর্ধ্ব আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি আমি বুঝতে পারছি তা নয়, তা নয়, ভয়ের পিছনে যে নিশ্চল দাঁড়িয়েছিল সেই ভয়কেও গলিয়ে দিচ্ছে, সে প্রেম, অবিনাশী প্রেম, ও তারই জ্যোতির্ময় শিখা, সে আমার ভয়কেও গলিয়ে ধ্বংস করে দিয়ে দীপ্যমান হয়ে রইল। মাসের পর মাস আমি জ্বলতে লাগলাম, সব পুড়ছে আমার, এমন কি বয়সও। আমি যেন একেবারে উনিশ শ’ ত্রিশ সালে ফিরে গেছি। তেমনি প্রত্যক্ষ, তেমনি সত্য হয়ে উঠেছে আমার অনুভূতি। প্রেমের আলো আমার অন্তরের গভীরে প্রবিষ্ট হচ্ছে, তার সমস্ত কোণায় কোণায় অন্ধকার গলিতে গলিতে আলো জ্বলে উঠেছে, আর ভয়ের গর্বের সংস্কারের অন্ধকার দূরে হয়ে যাচ্ছে। যা কিছু ভান করেছি, নিজেকে বড় করতে চেষ্টা করেছি, যা কিছু নিয়ে আমার অহংকার, সব মিলিয়ে যাচ্ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে, সত্যের পূর্ণ মূর্তি দেখতে পাচ্ছি আমি। আমার জীবন এক নূতন অর্থে অর্থবান হচ্ছে। আমার ওকে মনে পড়ছে, ওর অধবিস্মৃত মুখ, ওর কথা, ওর অনেক দুর্বোধ্য ব্যবহার, ওর রাগ, ঈর্ষা, সর্বোপরি ওর প্রেম। ক্রমে ক্রমে আমি যেন এক অন্য স্তরে চলে গেলাম, এ এক অন্য অস্তিত্ব, যেখান থেকে এ জগতের ভালোমন্দ সত্যমিথ্যা কল্পনা ও ঘটনা এই বর্হিজগতের সমস্তই এক হয়ে যায়। আমার মন বলছে এ সবে কি এসে যায়, নিন্দা প্রশংসা সবই সমান, তার চেয়ে সত্য কিছু আছে। আমি ভাবছি কেন সে এমন করে এই মৃত্যুহীন প্রেমকে বিফল করল? চলে যেতে হয়েছিল তাতে কি? শরীরে কাছে পাওয়াই কি একমাত্র পাওয়া? যদি দশ বছরেও আমরা একটা চিঠি আদানপ্রদান করতে পারতাম—তাহলে? তাহলেই যথেষ্ট হত, যথেষ্ট। সেই একটা চিঠি দিয়েই আমরা পার হয়ে যেতাম আমাদের মধ্যের মহাদেশের ব্যবধান, বিচ্ছেদের অতলান্ত মহাসাগর। সেই একটা চিঠি দিয়েই আমরা অর্ধনারীশ্বর হয়ে যেতাম, আমাদের যুগ্মসত্তা একটি মিলিত বৃত্তে পেত সম্পূর্ণতা। কিন্তু ওরা কি এসব বোঝে? বোঝে না, বোঝে না, ওদের দেশে প্রেমকে পূর্ণ করবার জন্য এক বিছানায় শুতেই হবে! হা ঈশ্বর!
কিন্তু ও তো জানত জানতই ঠিক, আমি আমাকে একটা দরজার মাঝখানে ছবির মতো ওর বক্ষলগ্ন দেখতে পাচ্ছি, ও বলছে, “তোমার শরীরকে নয় অমৃতা তোমার শরীরের ভিতরে তোমার আত্মাকেই আমি ধরতে চেয়েছি–”
একথা সত্য, সত্য, শরীরের স্থায়িত্ব নেই, আত্মা অমরন হন্যতে হন্যমানে শরীরে। কোথায় সেই শরীর আমার? সেই যৌবননিকুঞ্জ শুকিয়ে গেছে—জীর্ণ বৃদ্ধ এই মাথায় বরফ পড়েছে, মুখে বলিরেখা—অথচ আমি তো এই জীবনের পরম অনুভূতিকে তেমনি অক্ষয় দেখতে পাচ্ছি। একে কেউ ধ্বংস করতে পারে নি, না আমার পিতা, না ও নিজে, না কাল, না আমার অহংকার, না আমার জীবনের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। অমরত্বের অনুভব হচ্ছে আমার–
য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম্
ঊভৌ তৌ ন বিজানীতে নায়ং হন্তি ন হন্যতে।
যে কথা কোনো দিন কোনো শাস্ত্র পড়ে বুঝতে পারতাম না, পারি নি, সে কথা এত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—মরে না, মরে না, প্রেম মরে না, ভবানীপুরের বাড়ির দরজার কাছে ওর দুই হাতে বিধৃত আমার আত্মা এখনও স্থির আছে, এই তো অসীম সীমার মধ্যে তরঙ্গিত, এই তো আমি দূরে এবং নিকটে, এখানে অথচ এখানে নয়!
আমি অবিশ্বাসী। আমি নাস্তিক। কোনো কুসংস্কারে আমার আস্থা নেই—কিন্তু আমার শরীর মনে যা ঘটছে আমার অবিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দিচ্ছে—কেউ আমাকে বলুক আমি কি? আমার সেই ষোল বছরের সত্তার দেহহীন অস্তিত্ব কোথায় বাস করছিল এতদিন?
