যে, এ আলোচনা আপনার কাছে প্রীতিপদ হবে না। আপনার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মধারায় জগতে নানারকম চরিত্র দেখা অভ্যাস আছে—নিজগুণে মার্জনা করে নেবেন। আপনি খুব বিচলিত অবস্থায় চিঠিটা লিখেছিলেন বুঝতে পারছি-স্বাভাবিক।…সেরগেই যাই বলুন এখানকার দু একজন সাহিত্যিক বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করেছি, তারা আমার সঙ্গে একমত যে আপনার identity disclose করাটা অসঙ্গত হয়েছে। চল্লিশ বছর হয়ে গেছে, ও বই আর কারু মনে নেই। আপনার পরিবারের কারুর পক্ষেই ঐ বইয়ের বিষয়বস্তু জানার সম্ভাবনা নেই।
সুমিতার চিঠিটা হাতে করে আমি ভাবছি এই মেয়ে আমায় সান্ত্বনা দিয়েছে—কারণ এ বই জীবন্ত—চল্লিশ বছর আগে লেখা হলেও এখনও জীবন্ত। সুমিতা আরো লিখেছে, এখন নূতন করে এ বিষয়ে কিছু লিখতে গেলে কাদা ঘোলানো হবে। কোনটা কাদা এর মধ্যে? কাদা তো ছিল না সেই নির্মল বালিকাহৃদয়ে, কোনো কাদা ছিল না-কাদা যা তা ঐ ব্যক্তি তার কল্পনায় সৃষ্টি করেছে।
দিনের পর দিন রাতের পর রাত আমি ভাবছি কি করে আমি এই অসত্যের গ্লানি থেকে আমার নামকে মুক্ত করব। সত্যের দায় আমি বইতে প্রস্তুত কিন্তু মিথ্যার দায় কেন নেব? আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করছি—তাদের না বলে আর উপায় নেই। তারা চমৎকৃত হয়ে গেছে, আমার জীবনে এ ঘটনা অপ্রত্যাশিত। আমি ওদের বলছি, অদৃষ্টের পরিহাসটা দেখো, এতদিন ধরে যে সংসার আমি গড়ে তুলেছি আমার স্বামী সন্তান আত্মীয় পরিজন নিয়ে, যারা আমার জীবনের সঙ্গে এক হয়ে গেছে তারা তো কোথায় চলে যাবে, আমার এই সত্যকার জীবনটা ছায়া হয়ে মিলিয়ে যাবে। সমস্ত সামাজিক বন্ধন এমন কি রক্তসম্পর্কও তো মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায়, শূন্যে মিলিয়ে যায়, কিন্তু ও যে বন্ধন সৃষ্টি করেছে তা অচ্ছেদ্য। কি হবে পার্বতী, যে আমার কেউ নয় কিছু নয়, দীর্ঘ জীবনের যাত্রাপথে দু দণ্ডের দেখা হয়েছিল যে-আগন্তুকের সঙ্গে, তার পরিচয়টাই সবচেয়ে সত্য হয়ে থাকবে। জীবনে যে কোথাও নেই, মরণে তার সঙ্গে বাঁধা পড়ে থাকব—‘পরপুরুষের সনে বাঁধা পড়ে রবে নাম মৃত্যুর মিলনে।‘
অল্পবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমি টের পেলাম এ জগৎটা কত বদলে গেছে। এরা সত্যকে দেখতে শিখেছে। আমি যে ভেবেছিলাম আমার এই অসামাজিক এবং অসময়ের মনোবিকারে এরা আমায় দূষিত বস্তুর মত পরিত্যাগ করবে তা তো হলোই না, এরা আমায় ধারণ করে রইল, আমার জীবনের সত্যের আলোকে এদের কাছে আমি প্রিয়তম হলাম। আমাদের সময় এমন হত না। আজকের এই পরিবর্তন ভালো না মন্দ, আগে সমাজ বেশি পরিচ্ছন্ন, নারী বেশি সতী, প্রেম আরো পবিত্র ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে—আমারও সন্দেহ ছিল, মনে হত স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলিকে কঠিন সংযমের নিবর্তনে নিয়মিত করা মনুষ্যত্ব বিকাশের পক্ষে অপরিহার্য, তা না হলে পশুত্বের আক্রমণ থেকে তার উত্তরণ হবে না। একথার সবটা হয়ত ভুল নয়, কিন্তু প্রথা সংস্কার ও কঠিন নিয়মের নির্দেশেও যে মনুষ্যত্ব বিভ্রান্ত হতে পারে এদেশের সামাজিক জীবনে তার তো দৃষ্টান্তের অন্ত নেই, যে দেশে সতীত্বের প্রমাণ সহমরণে দিতে হয়েছে।
মানুষের সবচেয়ে বড় দিক তার সত্যানুসন্ধানী মন। তার অন্যান্য অনেক মনোবৃত্তি পশুরও আছে কিন্তু সত্যকে খুঁজছে কেবল মানুষই। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে সত্যানুসন্ধান তাকে আজ দুশো বছর বিচিত্র পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে, তার আলো কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের অরণ্যের মধ্যে পথের নিশানা দিচ্ছে। আজ আমার একটা চরম উপলব্ধির মুহূর্তে দেখছি সমাজের মধ্যেও এক অভাবনীয় পরিবর্তন। শাস্ত্রবাক্য, গুরুর বিধান, বহু পুরাতন ধারণা ও বিশ্বাসের আবর্জনা সরিয়ে এরা সত্যকে দেখতে চাইছে। এজন্য আমি বন্দনা করি এই যুগকে। এক অর্থে এ সত্য যুগ।
দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে, আমি জানি না কার কাছে এ বিপদে সাহায্য চাই—আর সেই দুর্ভেদ্য লোকটি বেশ চুপ করে কচ্ছপের ঢাকনায় হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন চিরটা কাল। তা থাক, কিন্তু কি করে ঠিক এই সময়ে অর্থাৎ তার অন্তর্ধানের চল্লিশ বছর পরে এত যোগাযোগ হচ্ছে কে জানে—আমার এক নিকট আত্মীয় ওদের দেশে গেল। খবরটা শুনেই আমি ভয় পেয়েছি—ভয়টা অকারণ নয়, ওখানে গিয়েই সে শুনেছে এবং খুব রেগেছে, কোনো ভদ্রলোক একাজ করে না দিদি, কোন জন্মে কি একটু ঘটনা ঘটেছিল তাই নিয়ে এরকম বই লেখা।
আমি শুনছি আর বুঝছি এ বই মৃত নয়, চল্লিশ বছর জীবিত আছে—এই দীর্ঘায়ু গ্রন্থ ক্রমে আরো বলবীর্য লাভ করবে যখন পৃথিবী আরো ছোট হয়ে যাবে। হায় হায় কতদিন থেকে আমি শুনেছি, কেন আমি এতদিন একবারও খোঁজ করলাম না কি আছে ঐ বইতে। নিজের নাম খ্যাতি ও অখ্যাতি সম্বন্ধে আমি যথেষ্ট সজাগ, কেউ যদি আমাকে বলে অমুক কাগজে আপনাদের সম্বন্ধে বা আপনার সম্বন্ধে এই খবর বেরিয়েছে বা অমুক মিটিঙে আপনি ছিলেন কাগজে ছবি দেখলাম তাহলে আমি তখনই সে কাগজ আনিয়ে দেখি।
দেখে আমার স্বস্তি হয় না। আর যদি কোনো মন্দ কথা দেখি তাহলে রেগে অস্থির হয়ে যাই, প্রতিবাদ লেখাবার জন্য লোকজন ডাকি। সেই আমি বার বার শুনে আসছি এই বইয়ের কথা, একবার আমার জানবার ইচ্ছাই হল না ওতে কি আছে? বাবা বেঁচে থাকতে জানলে এর বিহিত করতাম। বাবা তো জানতেনই, কিছুই করলেন না। বাবার তো ঐ, বই লিখেছে, ভালোই। বহুদিন পরে আমি বাবাকে উনিশ শ’ ত্রিশ সালের মতো ভালোবাসছি। তাঁকে ডেকে বলছি, দেখ বাবা তোমার শিষ্যর কাণ্ড দেখ, যে একলব্যর মত দূরে থেকে তোমায় গুরু বলে সাধনা করে গেল, সে আমার কি অবস্থা করেছে দেখ—তখন তুমি চেয়েছিলে এর হাত থেকে আমায় বাচাতে, পারলে কি?
