উনিশ শ’ বাহাত্তর সালের আগস্ট মাসে সেরগেই সেবাস্টিয়ান কলকাতায় এসেছিল, এই কাহিনীর আরম্ভে যার কথা বলেছি। ১লা সেপ্টেম্বর সকালে যখন তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, মনে একটা কৌতূহল মাত্র, দেখি ওর কথা কি বলে—এইটুকু, কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলে আমি অবাক হয়ে গেছি। মির্চা সম্বন্ধে আমার সংশয় অনেক আছে—কিন্তু ও যে এমন ভয়ানক মিথ্যাবাদী তা তো আগে বুঝতে পারি নি।
“কি জঘন্য মিথ্যা—ছি ছি, এত নীচ তোমার বন্ধু আর তারই গুণগান করছ?”
“আমি তার শিষ্য, সে আমার গুরু, আমি তার চেয়ে অনেক ছোট।”
“ভালো গুরু তোমার, নিজে অপরাধ করে পালিয়ে গিয়ে আবার আমার উপর প্রতিশোধ নিয়েছে, আমায় কলঙ্কিত করেছে।”
সেরগেই বলছে, “তুমি তো জানো না সে কি কষ্ট পেয়েছে, যদি তুমি ওর লেখা পড়তে তবে বুঝতে ওর যন্ত্রণা। কল্পনায় সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি খুঁজেছে। বইটা ছুঁলে রক্ত পড়ে।”
“এ সমস্ত কোনো ব্যাখ্যাতেই তার দুষ্কীর্তির ক্ষমা হয় না, জীবনে যে আমাকে কিছুই দেয় নি, সে শুধু কলঙ্ক দিয়েছে! নাম করে কেউ লেখে সেরগেই?—সেটা তো libel হয়ে যায়!”
“ওটা তো গল্প—গল্পের জন্য কিছুটা তো বানাতে হয়—অবশ্য ঠিকই যে ভারত এখনও এসব বিষয়ে একই আছে!”
“নাম করে লিখল কেন, আমাকে অপমান করবার জন্য?”
সেরগেই দুঃখ পাচ্ছে—“তুমি ওকে ভুল বুঝছ—ওর ভালোবাসাটা ভুলে গেলে? উনি এখনও তোমায় ভালোবাসেন, ওর অধিকাংশ লেখাতেই কোথাও না কোথাও তোমার ঘেঁয়া আছে-উনি যে ভারতীয় হয়ে গেলেন সে কি তোমার জন্য নয়? তিনি কি তোমার নামের বন্ধন কাটাতে পারেন?”
“এতই যদি ভালোবাসত তবে চিঠির উত্তর দেয় না কেন?”
সেরগেই চমকে উঠেছে—“দেয় না? তুমি চিঠি লিখেছ-“উত্তর পাও নি? ক’টা লিখেছ?”
“আমি তিনটে চিঠি লিখেছি। প্রতি কুড়ি বছর অন্তর একবার করে আমার অস্তিত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। উত্তর পাই নি।”
সেরগেই মাথা নীচু করে ভাবছে—“সে আত্মপীড়ন করে, he works against his heart—যা তার ইচ্ছা করে তার বিপরীত কাজ করেন, এই তাঁর স্বভাব। নিশ্চয় ওঁর খুব ইচ্ছে হয়েছে তাই লেখেন নি।”
আমি চুপ করে আছি। আমার ওর চরিত্রের এই দিকটার কথা মনে পড়ছে—কি জানি ওর মনে কি আছে, রহস্যময় মানুষ—যে তার দেশের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়েছে সে আমার এই মিথ্যা পরিচয় দিল কেন—একদিকে অসহ্য রাগ হচ্ছে, অন্যদিকে মনে পড়ছে তার অস্তিত্ব, তার স্মৃতি। আমি বলছি, “সেরগেই তার সঙ্গে আর কোনোরকমে দেখা হয় না?”
“হবে না কেন? এই পৃথিবীতে তোমরা দুজনেই বেঁচে আছ—কোনো না কোনো দিন দেখা হবেই হবে।”
আমি ভাবছি হা ঈশ্বর ওকে যে আবার দেখতে ইচ্ছে করছে।
“আচ্ছা সেরগেই আমি যদি ওর সঙ্গে দেখা করতে যাই ও দেখা করবে?”
“নিশ্চয়, তোমার সঙ্গে দেখা করবে না, ওর মন তো এদেশেই পড়ে আছে।”
সেরগেইর সঙ্গে কথা বলছি আর এবার বুঝতে পারছি সূক্ষ্ম শরীর আমার স্থূল দেহ থেকে বেরিয়ে গেছে—আমি আর এখানে নেই—অর্থাৎ আমি আমাকে পরিষ্কার দ্বিধাবিভক্ত দেখতে পাচ্ছি।
আমি বাড়িতে ফিরে সেই উৎসবের দিনটি কোনো রকমে পার করে দিলাম, সে কথা আগেই বলেছি কিন্তু ক্ষণে ক্ষণেই আমি বর্তমান থেকে অতীতে প্রবেশ করছি। একটি একটি দিন আবার পার হচ্ছি, প্রত্যেকটি ঘটনা যেন আবার ঘটছে। আমি এতক্ষণ যা লিখলাম তার প্রত্যক্ষ অনুভূতি হয়েছে আমার। এটা সহজে হয় নি। একই সময়ে দুই অবস্থায় বাস করার মানসিক যন্ত্রণাকে বাক্যে রূপ দেবার ভাষাই আমার নেই! একদিকে আমার বর্তমান জীবন তার পরিপূর্ণ দাবী নিয়ে উপস্থিত—অন্যদিকে আমার আর একটা অস্তিত্ব যেন এক ছায়ামূর্তিতে আমার সত্তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, আমার প্রত্যেক মুহূর্তকে স্পর্শ করছে। আমার মনটা যেন একটা তারের বাজনার মতো হয়ে গেছে একটু ছোয়া লাগলে ঝন ঝন করে বেজে উঠছে। ক্রমে ক্রমে এমন হচ্ছে যে পিছনটাই সামনে আসছে—আমি নিজেকে নিয়ে কি করব ভেবে পাচ্ছি না।
একেক দিন এমন অবস্থা হয় যে সকলের কাছে অপ্রস্তুত হয়ে যাই। ছেলে এসে একটা কিছু জিজ্ঞাসা করছে শুনতেই পেলাম না। একদিন আমার স্বামীর সঙ্গে একটা কর্মস্থলে যাচ্ছি, কুড়ি মাইল পথ গাড়িতে চলেছি—সচরাচর আমিই কথা বলি উনি উত্তর দেন, সেদিন উনি হয়ত দু’একটা কথা বলবার চেষ্টা করেছেন, উত্তর না পেয়ে চুপ করে গেছেন। যখন গন্তব্যস্থলে পৌঁছেছি, বুঝলাম আমি কোনো কথাই বলি নি—আমার স্বামীকে বললাম, “এতদিন তুমি চুপ করে থাকতে, এবার আমি চুপ করলাম।”
তিনি বললেন, “তাই তো দেখছি, কম্পিটিশনে হারিয়ে দিলে!”
একেক দিন সকাল হচ্ছে আবার কখন রাত্রে পৌঁছে যাচ্ছি বুঝতেই পারি না। রাত্রিটা ভয়ঙ্কর, অতি ভয়ঙ্কর—ভয়ঙ্কর এই অগ্নিদাহ—আগুন জ্বলছে, ক্রোধের আগুন, একটা কিছু প্রতিকার আমায় করতেই হবে। আমি যখন জেনেছি তখন মুখ বুজে অন্যায়কে সহ্য করে নেব না। ওদের দেশে আমার এক বন্ধু থাকে তাকে আমি লিখেছি—চিঠিটা এই রকম—
সুমিতা, তুমি নিশ্চয় ইউক্লিডের লেখা পড়েছ, এতদিন আমায় জানাও নি—সেগগেইর কাছে সব শুনলাম। ঐ ব্যক্তি আমার বাবার ছাত্র হয়ে আমাদের বাড়িতে ছিলেন, আমাদের কাছে উপকৃতও হয়েছিলেন, তারই শোধ নিয়েছেন—তুমি এর একটা প্রতিবাদ লিখবে। ভারতীয় নারীর মর্যাদা যাতে নষ্ট না হয় সেটা দেখা তোমারও কর্তব্য। এই চিঠিটা আমি লিখেছি কিন্তু আমি জানি অভিযোগটা বাহ্যিক, আমার মনের গভীরে যে পরিবর্তনটা চলেছে তার রূপ তার প্রকৃতি অন্য। সুমিতা লিখল,..‘আমি সেরগেইকে বার বার অনুরোধ করেছিলাম আপনার কাছে বইটির নাম উল্লেখ না করতে। তিনি অত্যন্ত fixed idea-র লোক তাকে কিছুতেই বোঝাতে পারি নি এখনো, অর্থাৎ আপনার সঙ্গে দেখা হবার পরেও
