এই সময়ে আমাদের অনেক কাজ। বাংলাদেশের যুদ্ধ চলছে—সারা পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল, সকলেই কর্মব্যস্ত, আমরাও। এর মধ্যে এই হালকা কথা কোথায় ভেসে গেল কে জানে। মানুষের চূড়ান্ত দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে শৌখীন সুখদুঃখগুলি কি অর্থহীন বোধ হয়! হাজারে হাজারে, লক্ষে লক্ষে গৃহহীন, অন্নহীন, বস্ত্রহীন মানুষ ছুটে আসছে আশ্রয়ের সন্ধানে, তাদের যন্ত্রণার উত্তাপ আমাদের গায়ে লাগছে। সীমান্তে আমরা রোজ যাই, সেখানে কলেরা। লেগেছে। আশ্রয়শিবিরের আশেপাশে মৃতদেহ পড়ে থাকে রোজই। একদিন একটি শিবিরের সামনে পথের উপরে আমার বয়সী একটি নারীর মৃত্যুশয্যা দেখলাম। গাছের তলায় ছিন্ন কাঁথার উপর পড়ে আছে প্রায় স্পন্দনহীন দেহ। মাঝে মাঝে খিচুনি উঠছে। কর্মীরা ঐ। পথের মাঝখানেই তাকে স্যালাইন দিচ্ছে—একটু পরেই সব শেষ হয়ে যাবে। তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে—পশ্চিমের আকাশে রঙীন রক্তরেখা—উদাসীন এই বিশ্বসৌন্দর্যের মাঝখানে একটা মানুষের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, দীপটা নিবে যাবে। কাল এসময় কোনো চিহ্ন থাকবে না, এ যে একদিন পৃথিবীতে এসেছিল, এর যে কেউ ছিল, এ যে কাউকে ভালোবেসেছিল, ভালোবাসা পেয়েছিল, তার কি কোনো অর্থ আছে তাহলে? ঐ মৃত্যুপথযাত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে আমি যেন আমার নিজের মৃত্যুশয্যা দেখতে পেলাম। যত দূর মনে হয় আমি পথের মধ্যে শুয়ে থাকব না, পালঙ্কে আত্মীয়-স্বজনবেষ্টিত হয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করব। কিন্তু তার পরে? ঐ দেহও যা আমার দেহও তাই, কোনো চিহ্নই থাকবে না। শ্মশানবৈরাগ্য আমার মনকে অভিভূত করেছে। আমার চোখ জ্বালা করে জল আসছে–সবাই ভাবছে আমি..করুণায় কাতর। রশিদ বললে, “মাসীমাকে এখান থেকে নিয়ে যা—আপনি বনগাঁয় চলে যান।”
এদিকে আমি কাঁদছি আমার নিজের মৃত্যুশোকে, এই তো ফুরিয়ে যাব। যা পেয়েছি, যা পাই নি সবই এক হয়ে যাবে—সোনা আর ধুলো এক। এই ক’দিনের জন্য পৃথিবীতে এসে মানুষ মানুষকে কত কষ্টই দিচ্ছে, সুখ কতটুকু দিতে পারে—যন্ত্রণা দেয় সীমাহীন। হঠাৎ যেন আমার মৃত্যুশয্যার পাশে ওকে দেখতে পেলাম। গাড়িতে ফিরতে ফিরতে সেই অদ্ভুত পরিবেশে আমাকে ওর চিন্তা পেয়ে বসল। এই তো ঠিকানা পাওয়া গেছে, লিখিই না একটা চিঠি, এতদিন হয়ে গেল এখন তো আর অন্য কিছু নয়, পুরানো বন্ধুকে একটা চিঠি লেখা যায় না? কিন্তু পার্বতীর কাছে ঠিকানা কি করে চাইব? সে কি ভাববে? যা খুশি ভাবুক, কি এসে যায়! মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে সব লজ্জাসঙ্কোচ আঁকড়ে ধরে এতদিন পড়ে আছি, সব অলীক বোধ হল। কেউ নিন্দা করলে বা মন্দ ভাবলেও আমি দুঃখিত হব না। পরদিন চিঠি লিখলাম, ‘ভাই পার্বতী, তোমার কাছে অধ্যাপক ইউক্লিডের ঠিকানাটা থাকলে দিও।’ ঠিকানা এল, সঙ্গে ‘জ’র চিঠি। সে লিখেছে, “ইনি অত্যন্ত ভালো লোক এবং ভারতেই ওর জীবন পড়ে আছে, কলকাতা ওর স্বপ্ন এবং এর বিদ্যার খ্যাতি ভুবনজোড়া। বিদ্যার খ্যাতি শুনে আমার মনটা বিকল হয়ে গেল। নিছক পাণ্ডিত্যে আমার শ্রদ্ধা নেই—এই সব লোভেই তো…যাক গে সেসব কথা, পরে কি হয়েছে তা দিয়ে আমার দরকার কি, আমি যাকে চিনি তাকে চিঠি লিখি না কেন, একটা চিঠি লিখে দেখি উত্তর দেয় কি না। আমি লিখলাম—
মির্চা ইউক্লিড, তুমি ‘জ’র কাছে আমার কথা জিজ্ঞাসা করেছ শুনলাম—আমি জানতে চাই তুমিই সেই ব্যক্তি কিনা, যাকে আমি চল্লিশ বছর আগে চিনতাম—যদি তাই হও তাহলে চিঠির উত্তর দিও। ইতি—অমৃতা
চিঠির উত্তর এল না। আমি অপেক্ষা করলাম, সন্দেহ হল ঠিকমত পোস্ট হয়েছে কিনা—ঐ সঙ্গে লেখা বিদেশ থেকে অন্য চিঠির উত্তর এল, ও চিঠিটার উত্তর এল না। যাকগে। অনেক কাজ আছে। অনেক চিন্তা আছে। অনেক সমস্যা আছে, যা আমাকে ভাবতে হচ্ছে, এই একটা বাজে কথা ভেবে লাভ নেই।
এই উনিশ শ’ একাত্তর সালেই আবার একবার ওর বইয়ের কথা শুনলাম। ইয়োরোপ থেকে সে সময়ে অনেকেই আসছেন বাংলাদেশের যুদ্ধ দেখতে, সমবেদনা জানাতে, সাহায্য করতে ও কৌতূহল মেটাতে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের কাজও দেখছেন অনেকে। একটি বাঙালী দম্পতি ঘুরছেন আমাদের সঙ্গে, এঁরা ইয়োরোপে থাকেন। আমি এদের তেমন চিনি না, মেয়েটির নাম রিণা, অল্পবয়সী মেয়ে অনেক ভাষা জানে, ওদের ভাষাও জানে। মাঠের মধ্যে বসে আছি আমরা, সঙ্গীরা এদিক ওদিক-হঠাৎ রিণা আমায় বললে, “একটা বই পড়েছি তাতে আপনার নাম আছে, সে কি আপনারই নাম?” আমি চকিতে চারদিকে দেখে নিলামবঁাচা গেল কেউ নেই কিন্তু রিণার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলাম না—সেও আর কথা বাড়াল।
আমাদের কর্মস্রোত উত্তাল হয়েছে। বিবিধ বিচিত্র সমস্যার সামনে পড়েছি। প্রতিদিন নূতন নূতন লোকের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। ঘর এবং বাহির এক হয়ে গেছে, ঘরেও প্রতিদিন শত লোকের যাতায়াত। কর্ম যখন বিপুল আকার, গরজি উঠিয়া ঢাকে চারিধার’ সেই কর্মের গর্জন আমরা শুনছি। এমন বাচার মত বাচা যেন আর কোনোদিনও হয় নি। এই কর্মবিমুখ আলস্যজড়িত দেশে আমরা অনেকেই এমন কাজের মত কাজ পেয়েছি যাতে নিজেকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দিয়েও আশ মিটছেনা, এখন তুচ্ছ ব্যক্তিগত কথা কতক্ষণ মনে থাকবে?
এই সময় থেকে অর্থাৎ উনিশ শ’ একাত্তরের শেষ দিক থেকে অকারণ আমার মনে কেবলই একটা আকাঙ্ক্ষা ফিরে আসে, ভাবি দূরে কোথাও যাব। কত লোককে যে বলেছি আমি বাইরে কোথাও যাব। কর্মসূত্রে বিদেশীদের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হচ্ছে, তাদের বলি তোমার দেশে তো শীঘ্রই যাব। আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাই কেন এই আকাঙ্ক্ষা, এর কারণই বা কি আর এর এত জোরই বা আসছে কোথা থেকে। আমার অবস্থা সেই রকম, ‘মোর ডানা নাই আছি এক ঠাই সে কথা যে যাই পাসরি।‘
