মা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন, “সব তোর বাবার জন্য হল। ফ্রেঞ্চম্যান একটা বাড়ির মধ্যে এনে রাখবেন, তারপর আবার—”
আমার হাসি পাচ্ছে—মা কিছুতেই ফ্রেঞ্চম্যানের ধারণাটা ভুলতে পারছেন না।
“কবে চিঠি লিখেছিলি রু?”
“উনিশ শ’ তিপান্ন সালে, প্যারিসে।”
“তা উত্তরই বা দিল না কেন?”
“উত্তর দিলে ভালো হতো? তোমার তাতে আপত্তি নেই মা? তাতে দোষ হত না?”
মা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন—“এখন আর কিছুতেই দোষ নেই রু—তবে চিঠি না লিখে হয়ত মঙ্গল হয়েছে। ফ্রেঞ্চ হলেও খুবই সুবুদ্ধি ছেলে। পাছে তোর সংসারের ক্ষতি হয় তাই হয়ত লেখে নি। ইস্ তোর বাবার জন্য শুধু শুধু এই কষ্টটা পেলি। আর…আর কে জানে কিসে কি হয়, ঐ ছেলেটাকে তাড়িয়ে দিলাম আর ঠিক তার পরের বছর থেকেই কি আমার সংসারটা ভাঙতে শুরু হল!”
এর সাত বছর পরে অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে রোগে জীর্ণ ও মনে ভগ্ন হয়ে সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণসত্তা মা মারা গেলেন।
৩.১ আরো এগার বছর কেটে গেছে
আরো এগার বছর কেটে গেছে। ইয়োরোপে দু’বার ঘুরেছি, নানা দেশে। আর কখনো ওর নাম শুনি নি। ওর কথাও আর মনে পড়ে নি। এই এগার বছর আমি বিশেষ কতগুলি দায়িত্ব নিয়েছি। আমার সময় নিরন্ধ্র, আমার বয়স এখন বার্ধক্যের সীমায় পৌঁছেছে, শরীরও জীর্ণ হচ্ছে। ছেলেমেয়ে নাতিনাতনী নিয়ে আমার সুখের সংসার, কিন্তু এ ছাড়াও আর একটা বড় সংসার তৈরী হয়েছে বন্ধুবান্ধব সহকর্মীদের নিয়ে। তাদের সকলের কাছে আমার একটা ভাবমূর্তিও আমি খাড়া করতে সমর্থ হয়েছি। সেটা আমার যতদুর বিশ্বাস এই রকম—আমি খুব কড়া মানুষ, বিশেষত অসামাজিক প্রেম সম্বন্ধে আমি নির্দয় মনোভাব পোষণ করি। কাজেই বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে সেরকম কোনো ঘটনা ঘটলে আমার কাছ থেকে সযত্নে গোপন করা হয়। ন্যায়-অন্যায় সম্বন্ধে আমার মনোভাব অনমনীয়, সমবেদনাশূন্য। একটু এদিক ওদিক হলেই আমি কড়া কড়া কথা বলি। আর অতিরিক্ত প্র্যাকটিক্যাল। আমার নিজের কাছেও নিজের একটা ভাবমূর্তি তৈরী করেছি নিশ্চয়—সেটা হচ্ছে, আমি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করি না। কোনো বিষয়ে অসংযম, মদ্যপান থেকে অন্যান্য সব কিছুই আমার দুচক্ষের বিষ। প্রত্যেক মানুষের সমাজের প্রতি দায়িত্ব আছে, ব্যক্তিগত অসংযম বা সাহিত্যের খাতিরে সে দায়িত্বচ্যুত হওয়া যায় না। যদি কেউ হয় আমি তার নিন্দা করি। অর্থাৎ ছোটখাট একটি নেত্রীর যা যা দোষগুণ সবই আমার মধ্যে দেখা যাচ্ছে। আমার পরোপকারস্পৃহাটা কেউ কউ নেই কাজ খৈ ভাজে’র দলে ফেললেও প্রশংসা ও সাহায্যও যথেষ্ট পেয়েছি। মোটের উপর ছোট এবং বড় দুই সংসারের বৃত্তই আমার সম্পূর্ণ হয়েছে। আমার অপূর্ণতা কিছু নেই।
এমন সময় উনিশ শ’ একাত্তর সালে আমি আবার ওর নাম শুনলাম। একটি বসবার ঘরে সহকর্মী ও বন্ধুদের হালকা আলোচনার পরিবেশে পার্বতী হঠাৎ বললেন, “অমুক শহরে অমৃতাদির একজন অ্যাড়মায়ারার আছেন।” সবাই উৎসাহিত, “তাই নাকি, তাই নাকি।” আমি বিস্মিত নই। এই দীর্ঘ জীবনে নিন্দা এবং প্রশংসা দুইই যথেষ্ট পেয়েছি। কাজেই অ্যাডমায়ার করেন এরকম কেউ থাকা তো অসম্ভব নয়।
“নামটি কি তার?”
“মির্চা ইউক্লিড—”
ভিতরে ভিতরে চমকে উঠেছি। মনে মনে ভাবছি এই মেয়েটা আমাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে বলেই জানি। এখন কি রকম অপমান করছে দেখ! আমাকে যতদূর সম্ভব নির্বিকার থাকতে হবে। শ্রীমতী পার্বতী বলেই চলেছেন, বছর দুই আগে ‘জ’র সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। সেদিন তিনি ক্লান্ত ছিলেন, অসুস্থও। একজন বাঙালীকে দেখে কলকাতার কথা বলতে লাগলেন—এখন কলকাতার সবাই নিন্দা করে কিন্তু তিনি যে কলকাতা দেখেছিলেন তার তূণ্য শহর আর কোথাও দেখেন নি। বিশেষত সেখানকার মেয়েরা যাদের মাধুর্যের তুলনা নেই অথচ যারা সন্ত্রম রক্ষা করে চলতে জানে, তাদের মুখে সর্বদা রবীন্দ্রনাথের কবিতা ইত্যাদি, শুনতে শুনতে চতুর ‘জ’র মনে হয়েছে এটা গৌরবে বহুবচন এবং কোনো স্থানের কথা নয় কোনো ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে। তখন সে জিজ্ঞাসা করল, ‘মহাশয়, কলকাতার কথা বলতে আপনি কি কোনো স্থানের কথা বলছেন,না কোনো মানুষের কথা?’
অধ্যাপক বললেন, ‘চল, ওধারে একটু বসা যাক। একটি নির্জন কোণে বসে তিনি “জ’-কে জিজ্ঞাসা করলেন—“তুমি কি অমৃতাকে চেন? সে কেমন? তারপর তিনি একটা বই ওকে দিয়েছেন তার উপর বাংলায় লেখা আছে—‘তোমার কি মনে আছে অমৃতা, যদি থাকে তাহলে কি ক্ষমা করতে পার?
তা জ’ তো ওদের ভাষা জানে না, ও বই পড়বে কি করে, তাই বইটা আনে নি। আর একজন মন্তব্য করলে—তা আনতেই পারত, আমরা একটু দেখতাম। ঘরে অনেক লোক, সবাই মিলে খুব হাসাহাসি হচ্ছে। হা ভগবান, মানুষকে নির্যাতন করতে সবাই আনন্দ পায়—শত্রু মিত্র নেই! যাদের বন্ধু ভাবতাম তাদের নিষ্ঠুরতা দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি! আমার মাথা ঘুরছে—দীর্ঘ চল্লিশ বছর পরে এই আমি প্রথম একজনের কথা শুনলাম যে ওকে দেখেছে, যার সঙ্গে সে আমার কথা বলেছে। আমি শুনতে পাচ্ছি ঘরে কেউ একজন বলছে—“অমৃতাদি আপনি একটা চিঠি লিখুন না তাকে। ঠিকানাটা আনিয়ে দেব ‘জ’র কাছ থেকে। লিখুন লিখুন খুব মজা হবে।”
আমার মনে হচ্ছে আমার আঁচলে আগুন ধরে গেল, এখনি সারা গায়ে আগুন ছড়িয়ে পড়বে। এখান থেকে পালাই আমি।
কথাটা কিন্তু মনের ভিতরে ঘুরতে লাগল–এবার একটা ঠিক ঠিকানা পাওয়া গেছে, লিখিই না কেন একটা চিঠি। আমায় তো ভুলে যায় নি তাহলে। একটু যোগাযোগ করলে দোষ কি? আমরা দুজনেই বৃদ্ধ মানুষ। যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, কেমন আছ? তবে ক্ষতি কি?
