“দেখুন সত্যেনবাবু, আপনি খুব পণ্ডিত ব্যক্তি, বোধ হয় সেই কারণেই মানুষকে অপ্রস্তুত করতে আনন্দ পান।”
আর একটুও সেখানে না দাঁড়িয়ে আমি বাড়ি ফিরলাম। সাইকেল-রিক্সতে দু’মাইল পথ ফিরছি, সন্ধ্যে হয়ে আসছে, ফিকে অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হচ্ছে, অতীত ভাববার চেষ্টা করছি, কিছু মনে আসছে না, মনে হয় সমস্ত অতীত জীবনের উপর সন্ধ্যা নেমে আসছে। আমি ভাবি পথের প্রান্তে তো পৌঁছে গেলাম আর কেন পিছন দিকে তাকান, এ সংসারের জন্য, ভাইবোনদের জন্য আমার সাধ্যমতো, বুদ্ধিমতো যা করার ছিল করেছি, এখন যে যা বলে বলুক সামনের পথ প্রশস্ত হোক আমার, অনেক কাজ করব আমি, অন্যায়ের সঙ্গে, অবিচারের সঙ্গে লড়ব—কিন্তু কাজের সুযোগ কৈ? সর্বত্র বাধা, এত কাজ আছে কিন্তু কর্মক্ষেত্র কণ্টকময়। তবু অতীতের অসম্পূর্ণতা যেন ক্ষুন্ন না করে আমায়।।
বাড়ি ফিরে দেখি দরজার কাছে মা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। মাকে দেখেই আমার মাথার ভিতর রাগ দপ দপ করে উঠল, এই মহিলাটির জন্যই যত দুর্ভোগ। আমার জীবনটি নষ্ট করেছিলেন, কারণ ‘উনি’ কষ্ট পাবেন! উনি যা চাইবেন তাই করতে হবে, খোকার হাতে মোয়া দিতে হবে। অন্য লোকের দুঃখ সুখ কিছুই না। তারপর তাও সামলাতে পারলেন না। দশ বছর ধরে একটু একটু করে ঘর ভাঙলো, ইনি আগুনে আঁচল চাপা দিয়ে ভাবছেন সব ঠিক হয়ে যাবে। নিজের জীবন নষ্ট করলেন, বাবারও, সকলেরই, অকর্মণ্য! সংসারে বুদ্ধি করে যারা চলতে পারে না, যারা প্র্যাকটিক্যাল নয়—তাদের ভালোত্ব শ্রদ্ধনীয় নয়–।
এখন আবার ইনি গর্ব করেন আমার ভালো বিয়ে দিয়েছেন। কি ভালোই বিয়ে দিয়েছিলেন! যদি এই বিয়ের ভালো পরিণাম হয়ে থাকে তবে তার কৃতিত্ব আর যেই করুক মা দাবী করতে পারেন না। অথচ মা ক্রমাগত তাই করেন। সমস্ত জেনেশুনে কেবল স্বামীকে সন্তুষ্ট করবার জন্য আমাকে একটি বয়সে চৌদ্দ বছরের বড় নির্বাক ললাকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নির্বাসনে পাঠিয়ে আমার সমস্ত সত্তার উপর পাথর চাপা দিয়েছিলেন এই ইনিই। আবার বলেন, “আমার জামাই মহাদেব যোগীপুরুষ, তোর কত জন্মের ভাগ্য এমন স্বামী পেয়েছিস—আবার ট্যাক্ ট্যাক্ কথা!’ হতে পারে যোগীপুরুষ। হতে পারে কেন নিশ্চয়ই, অন্য লোককে যে সব গুণ সাধনা করে পেতে হয় তা ওর অমনি পাওয়া, কিন্তু আমি তো গীতার সাধক চাই নি, রক্তমাংসের একটা মানুষ চেয়েছিলাম, একটা মানুষ।
এই সব ভাবছি আর ভিতরটা টম্ব করছে। মা বলেন, “এত দেরী যে।” আমি রেগে উঠলাম। বেচারা কাঁদ কাঁদ হয়ে বলতে লাগলেন, “কথায় কথায় এত রাগিস কেন? তোদের যত রাগ আমার উপর।”
রাত্রে শুয়ে আছি এক ঘরে আমরা, শীতকাল, কম্বল মুড়ি দিয়ে মশারির মধ্যে। রাত্রি অনেক হয়েছে, আমরা দুজনেই জেগে আছি। আমার কাছে বকুনি খেয়ে মার মনটা নিশ্চয় খারাপ হয়ে আছে। হঠাৎ মা বললেন, “রু কাঁদছিস নাকি?” আমি নিরুত্তর। মা মশারি তুলে বেরিয়ে এলেন, “রু কি হয়েছে মা, কাঁদছিস কেন, আমি কি এমন বললাম যে তুই কাঁদছিস?”
“সত্যেনবাবু আমায় অপমান করেছেন।”
“ও মা, সে কি, ভীমরতি নাকি, তোকে আবার কি অপমান করল বুড়ো?”
“না না, সে রকম নয়, আমাকে বললেন কি ইউক্লিডের বই পড়ে উনি বুঝতে পেরেছেন আমি রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতাম।”
“শোন কথা একবার! যত পডে তত কি বোকা হয় এরা! এ খবর জানবার জন্য তার ইউক্লিডের বই পড়বার দরকার হল।”
আমায় সান্ত্বনা দিলেন মা গায়ে হাত বুলিয়ে। উনি আরো কি বললেন জানো, “তাহলে বাবার উপর রাগ করেছিলেন কেন?” মা চমকে উঠলেন। “বলিস কি? সত্যিই কি তাহলে বেশি পড়লে কেউ কেউ মূখ হয়ে যায়! তোর ঠাকুমা তোর বাবাকে বলতেন ‘পড়য়া পাঠা এও দেখছি তাই। এ দুটো কি এক জিনিস হল? ভালোবাসামাত্রই কি এক? তুই কি কারুর সংসার নষ্ট করেছিস, কারুর সম্পত্তি দখল করেছিস পরিবারকে বঞ্চিত করে, কারু মাথা হেঁট করেছিস সংসারের কাছে? যে ভালোবাসা এ সংসারের বস্তু নয়, তা মানুষকে উন্নত ও পবিত্রই করে! তা যদি না হত তোমার নিজের সংসারে কি তুমি রানী হয়ে থাকতে পারতে! হায় ভগবান এদের কি কিছু বুদ্ধি নেই।”
মা আমার গায়ে হাত বুলাচ্ছেন, “যাক এসব বাজে কথায় তুই কাঁদিসই বা কেন, তুই নিজে তো জানিস কোনটা কি!”
“মা আমি সে জন্য কাঁদছি না—কবির সম্বন্ধে যে যাই বলুক আমার তাতে একটুও লজ্জা হয় না। তার কথা বলে কি আমাকে কেউ অপমান করতে পারে? সে তো নিন্দা লজ্জার অতীত বস্তু। আমি তোমাকে শুধু বললাম।”
“তবে কাঁদছিস কেন?”
আমি তখন দীর্ঘ আঠাশ বছর পরে মার সামনে এই প্রথম ওর নাম উচ্চারণ করলাম। বালিশের থেকে মুখ তুলে উপরের দিকে চেয়ে আমি চিৎকার করে উঠলাম—‘মির্চা, মির্চা, মির্চা’—তারপর আমি কাঁদতেই লাগলাম। মা স্তম্ভিত হয়ে গেছেন, “কি বললি, কি বললি?” সম্ভবত ওর ডাক নামটা মার মনে পড়তেই দেরী হল। এ বাড়িতে সবাই ওকে ইউক্লিড বলেই উল্লেখ করত। মা আমার পিঠের উপর হাত রেখেছেন, “রু, তোর সঙ্গে ওর দেখা হয়েছে নাকি? এতবার যে বিদেশে গেলি, দেখা হয় নিশ্চয়।”
“না, মা, না, সেই যে ও চলে গেল, তুমি আমায় বারান্দায় দাঁড় করিয়ে দিলে, তারপর আর ওকে আমি দেখি নি।”
“তাহলে চিঠি পত্র লিখিস নিশ্চয়ই, যোগাযোগ আছে, সত্যি কথা বল?”
“না, না, না। আমি চিঠি লিখেছিলাম, ও উত্তর দেয় নি।”
