উনি আবার চলে গেলেন। সে লোকটি আমার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল আমার কাধের উপর সস্নেহ হাত রাখল, “Write a good letter madam, you are trembling all over”.
“I am not trembling, I am shivering. It is a cold day to-day”… আমি চিঠিটা খামে ভরছি সে আবার বললে, একটা ভালো করে চিঠি লিখলে না কেন? আমি তো বুঝি না তোমার চিঠি সেনসরড় হবার দরকার কি?”
“না না সেজন্য নয়—আমার স্বামীকে ইংরেজীটা দেখতে দিলাম। আমার এপ্রিয়েট প্রিপজিশন ঠিকই হয় না।”
“ওঃ তাই নাকি!” সে চোখ মটকাচ্ছে, এমন একটা কিছু করই না যেটা এপ্রিয়েট নয়!”
আমরা লণ্ডনে চলে গেলাম। ও চিঠির উত্তর দিল না। সাত আট দিন আমি অপেক্ষা করলাম। সাত আট দিন আমার চোখ দিয়ে জল পড়ল। আমার স্বামী ভাবলেন, ছেলের জন্য মন কেমন করছে। তারপর আমি ভুলে গেলাম।
উনিশ শ’ পঞ্চান্ন সালের মার্চ মাস থেকে আমরা কলকাতায় চলে এলাম। কুড়ি বাইশ বছর আগে যখন কলকাতা থেকে চলে যাই তখন এখানকার বিদ্বৎ সমাজের চেহারা অন্য রকম ছিল। এত ভীড় ছিল না। গুণী ব্যক্তির গুণ প্রকাশের সুযোগ ছিল, লেখকদের পত্রিকার আপিসে চাকরী নিতে হত না লেখা ছাপাবার জন্য। মহিলা লেখিকাদেরও সম্পাদকের সঙ্গে গল্প করবার জন্য পত্রিকার আপিসে ছুটতে হত না। শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত সর্বত্রই ভীড় কম তাই পথ সোজা। এই কুড়ি বছরে সব বদলে গেছে। এখন সাম্যবাদের প্রকোপে মুড়ি মিছরির সমান দর। বন্যার জলের মতো শিক্ষাক্ষেত্রে, সাহিত্যক্ষেত্রে, রাজনীতিতে মানুষ ঢুকছে যারা শিক্ষাকে শিক্ষার জন্যই, শিল্পকে শিল্পের জন্যই শ্রদ্ধা করতে শেখে নি, যাদের অন্তরে কবিতার ঝঙ্কার নেই তবু কবিতা লেখে, এই জগতে আমি বিচ্ছিন্ন বোধ করি কারণ আমি আগন্তুক। তবু আমায় লোকে চেনে জানে, আমি কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত, আমার কর্মজীবন প্রসারিত হচ্ছে বিছু সত্ত্বেও।
উনিশ শ’ ছাপ্পান্ন সালে আবার ইয়োরোপ গেলাম—এইবার আমি শেষ বারের মত ইয়োরোপে ওর কথা শুনলাম। একটা বিরাট সভাগৃহে আমি রোস্ট্রাম থেকে নেমে আসছি একটি অল্প বয়সী মেয়ে, কোকড়া চুলে ঘেরা সুন্দর মুখ, আমার দিকে এগিয়ে এল, “তুমিই অমৃতা?”
“আমার নামটা তো বেশ ভালোই উচ্চারণ করেছ!”
“হ্যাঁ তোমাকে তো জানি।”
“ও বুঝেছি। তুমি মির্চা ইউক্লিড নামে কোনো লেখককে চেন? বলতে পার সে কোথায়?”
“না তো। ও নামে কাউকে চিনি না।” তারপর একটু থেমে বলল, “ও হ্যাঁ সে মরে গেছে।”
অনেক সময় মৃত মানুষ জীবিতের চেয়ে সুখ দেয় কিন্তু আমার বুকের ভিতরটা ধ্বক ধ্বক করছে। মরেই গেল! একেবারে শেষ? মরার পর তো আর কিছু থাকে না, আমার তো একবার জিজ্ঞাসা করা হল না, আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কেন করল? আমি যে ভেবেছিলাম একদিন না একদিন তাকে আমি ধরবই।
যখনই আমি ওর কথা ভাবি আমার পার্থিব মনটা, যে মনে বুদ্ধিবৃত্তি কাজ করছে, যে মন সংসারে সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করছে, সেই সজাগ স্বার্থপীড়িত মন বলে, বিশ্বাসঘাতকতা নয় তো কি? ঢিলটি পড়লে সারমেয় যেমন দুই পায়ের মধ্যে লাঙ্গুল ঢুকিয়ে চলে যায় তেমনি বাবার একটি ধমক খেয়েই যে পালিয়েছে তার মনুষ্যত্ব আছে? ধিক্ তার বিদ্যাচর্চায়, পুঁথির উপর আমার শ্রদ্ধা নেই, মানুষ পুঁথির চেয়ে বড়। তারপরে আর একটু নিচে যে মন আছে সে বলে, রাগ করছ কেন, হয়ত তোমায় চিঠি লিখেছে তুমি পাও নি, আর হয়ত তোমার চিঠিও তার হাতে পৌঁছয় নি। আর তারও নিচে গভীরে গুহায়িত আর একটা মন আছে যাকে যুক্তি স্পর্শ করে না—সে বলে ঘটনা দিয়েই কি সবকিছু বোঝা যায়, তর্ক করে কি সত্যকে পাওয়া যায়, তুমি নির্বিচারে এই হৃদয়রাজ্যে কান পেতে শোনো সত্যের প্রতিধ্বনি বাজছে—সে কখনো ছলনা করে নি। ভেরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে—
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কি করে মরে গেল? ওর তো মরবার বয়স হয় নি।”
ভেরা বলল,“না ঠিক মরে নি, অর্থাৎ আমাদের কাছে মরে গেছে, ফ্যাশিস্ট হয়ে গেছে।”
ফ্যাশিস্ট হয়ে গেছে! হাসি পাচ্ছে আমার, ওকে দেখতে পাচ্ছি হিটলারের মতো গোফ রেখেছে। গ্যাস চেম্বারের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। খুব মানিয়েছে চিঠির উত্তর না দিয়ে দিয়ে ঐখানেই তো বার বার পাঠাচ্ছে আমায়। ফ্যাশিস্ট বৈকি!
ওর নাম আর শুনি নি অনেক দিন! উনিশ শ’ আটান্ন সালে কলকাতার বাইরে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে কাজ করছি। আমি একটা বই লিখবার জন্য পড়াশুনো করছি। আমি ভালো একটা কাজ পেয়েছি, আনন্দে আছি। কাজ না থাকলেই আমার মন ভেঙে যায়—কোথা থেকে যেন আকাশজোড়া হাহাকার নেমে আসে। তাই যা কাজ হাতের কাছে পাই হাত লাগাই। লেখার কাজ তো সর্বোৎকৃষ্ট। মাইল দুই দূরে আমার মা ও ভাই থাকেন, আমি সেখানে আছি কিছুদিনের জন্য।
একদিন আমি নিবিষ্ট মনে লিখছি, সত্যেনবাবু ঘরে ঢুকে একটা তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে বসলেন। প্যারিসে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল সে কথা হল, তারপর হঠাৎ বললেন, “ইউক্লিডের লেখা বইটা আমি পড়েছি।” আমি চুপ করে আছি। ওর নামটা শুনলেই আমার যা হয় তা যারা কাঠিফড়িং দেখেছে তারা বুঝতে পারবে। পোকাটা বেশ ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে, হঠাৎ একটু যদি ছোয়া লাগে বা পাতাটা নড়ে যায় অর্থাৎ ও যেখানে আছে সেখানে যদি সামান্য স্পন্দন হয় তাহলে ওর হাত পা তৎক্ষণাৎ শক্ত হয়ে একটা শুকনো ডাল হয়ে ঠক করে পড়ে যাবে। আমার অবস্থা তাই হয়। ওর প্রসঙ্গ উঠলেই আমার রক্তমাংসের শরীর বদলে সহসা ঠিক সেই রকম হয়ে যায়। আমি একখণ্ড কাষ্ঠপুত্তলী হয়ে গেলাম। সত্যেনবাবু বলতে লাগলেন, “বইটা পড়ে বুঝতে পারলাম, আপনি রবিঠাকুরকে ভালোবাসতেন?” আমি নিরুত্তরে শুনে যাচ্ছি, ওটা ছিল মন্তব্য, এবারে তিনি একটা প্রশ্ন করলেন, “তাহলে বাবার উপরে রাগ করেছিলেন কেন?” আমি বইটা ভাজ করে উঠে পড়লাম। এই ব্যক্তিকে আমি অন্তরের সঙ্গে শ্রদ্ধা করতাম কিন্তু আজ আমি অবাক হয়ে গেছি।
