“তাই নাকি? তার কোনো বই আপনার কাছে আছে?”
“নিশ্চয়ই ভদ্রমহিলা উঠে গিয়ে ‘যোগ’ সম্বন্ধে একটি বৃহদাকার গ্রন্থ এনে আমার হাতে দিলেন বইটা হাতে নিয়ে আমি দেখছি—পাতাটা খুলে স্তম্ভিত হয়ে গেছি। বইটা আমার পিতাকে উৎসর্গ করা। লেখা আছে—“আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন গুরু—কে। তাহলে? এত কাণ্ডের পরও কি তার বাবার সঙ্গে যোগ ছিল? এ ত দেখছি কচই একেবারে, ক্যারিয়ারিস্ট। এতদিনে বুঝলাম কেন আমায় চিঠি লেখে নি, ওই বইটা লেখা যে আরো দরকার ছিল, দরকার ছিল ভারত সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ হবার। যশ, খ্যাতি, বিদ্যার গরিমা! ঘৃণ্য এই পাণ্ডিত্য, ওই কীর্তিলোভ, যশোলোভ। আমার ভিতরটা বহুকাল পরে জ্বলতে শুরু করেছে। আমার ঠোঁট কাঁপছে আমি সঁত দিয়ে চেপে আছি রক্ত বেরিয়ে আমার মুখ নোনতা হয়ে গেল। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি শ্রীমতী স্তনেস্কু আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন—তার চোখে কৌতূহল—তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার নাম কি অমৃতা?”
“হ্যাঁ। কেন?”
“ও আপনাকে তো চিনি। আপনিই ইউক্লিডের ফাস্ট ফ্লেইম?”
ভদ্রমহিলা হাসছেন। রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। মনে মনে বলছি ফ্লেইম না অ্যাশ। আড়চোখে চেয়ে দেখি আমার স্বামী অধ্যাপকের গল্প শুনছেন, এদিকের কথাবার্তা তাঁর কানে গেছে কিনা কে জানে! আমি আর ওর সম্বন্ধে কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম না, যথেষ্ট হয়েছে, ঐ লোকের সম্বন্ধে আর কোনো খবরে দরকার নেই, ওর নামও মনে আনবার যোগ্য নয়। কুড়ি বছর পর ওর খবর পেলাম আর সেই খবরই আমার বুকটা গুঁড়িয়ে দিল।
আমরা ইটালিতে বেড়াচ্ছি, রোম, ফ্লোরেন্স, ভেনিস ঘুরে দক্ষিণ ফ্রান্স অর্থাৎ রিভিয়েরাতে এসেছি। অপূর্ব দেশ, আমরা স্বামীস্ত্রী খুব সুখে দেশ দেখে বেড়াচ্ছি। সংসারের ভাবনাচিন্তা নেই, চাকুরীস্থলের নানা উদ্বেগ নেই—শুধু মাঝে মাঝে ছোট ছেলেটার জন্য বড় মন কেমন করে এছাড়া এত আরামে বেড়িয়ে বেড়ান জীবনে কমই হয়েছে।
আবার প্যারিসে এসে একটা হোটেলে উঠলাম আমরা। সাঁ সে লিজের কাছেই দুদিন পরে বিল দিতে গিয়ে চক্ষুস্থির! এতু খরচ তো চালাতে পারব না আমরা। সত্যেনবাবুর কাছে খবর পেয়ে ল্যাটিন কোয়ার্টারে একটা হোটেলে এলাম—এদিকে অধ্যাপক ছাত্ররা থাকেন, খরচ অনেক কম। এই হোটেলে দশ দিন ছিলাম আমরা। আমাদের পাশের ঘরে একটি লোক থাকে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে মাথা নেড়ে সম্ভাষণ জানায়, একটু একটু ইংরেজি বলে, আমি ভাবি ও জাতিতে ফরাসী। ওর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ছাড়া এই দশদিনে অন্য কোনো কথা হয় নি। যদি হত তাহলে কে জানে এ কাহিনী হয়ত অন্যরকম লেখা হত।
যেদিন আমরা প্যারিস থেকে ইংল্যাণ্ড চলে যাব সেদিন ‘রিসেপশনে’ অর্থাৎ আপিসের সামনের সিঁড়ির তলে বসে আছি। টেবিল-কৌচ দিয়ে বসবার জায়গা, যারা যাতায়াতের পথে অপেক্ষা করবে তাদের জন্য সাজানো। আমাদের জিনিসপত্র এক জায়গায় জমা হয়েছে। আমার স্বামী সেগুলি একে একে নামিয়ে এনে রেখে হিসাবপত্র মিটাবার জন্য কর্মচারীর টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন সময় সেই লোকটি নেমে এসে এদিক ওদিক করে গিয়ে আমাদের বাক্সগুলির কাছে দাঁড়াল—আমার বাক্সতে আমার নাম লেখা—আমি দেখছি লোকটা বাক্সর উপর নামটা পড়ছে আর আমার দিকে দেখছে। একটু ইতস্তত করে আমার কাছে এগিয়ে এল—সে বলল, “আমার নাম আইয়ন পোপেস্কু। আপনার নাম কি অমৃতা?” আমি চমকে উঠেছি আমার বুকের ভিতর হাতুড়ির ঘা পড়তে শুরু করেছে—“কেন বলুন তো?”
“আই পে ইউ মাই হোমেজ” সে বাকাচোরা উচ্চারণে বলে আমার কপল্লব চুম্বন করল, এবার আর সন্দেহ রইল না সে কোন দেশের লোক।
“ওঃ বুঝেছি”—এক মুহূর্তে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে-“আচ্ছা বলতে পারেন ঐ লেখক কোথায় থাকে?”
“এই প্যারিসেই, এখান থেকে দুটো ব্লক পরে।”
“দুটো ব্লক মাত্র ওদিকে?”
“হ্যাঁ” সে মুখ টিপে হাসছে। হা ঈশ্বর! এখুনি তো আমি এর সঙ্গে গিয়ে ধরতে পারি ওকে। বলতে পারি প্রবঞ্চক, অসত্যের মূল্যে বিদ্যা কিনেছ তুমি, তুমি পণ্ডিত হতে পার, জ্ঞানী হবে না। দৰ্ব্বী সূপরসা ইবকাঠের হাতা যেমন সূপরসে ডুবে থাকলেও তার আস্বাদ পায় না তেমনি যার জীবনে সত্য নেই সে অনেক জানতে পারে, জ্ঞানী হবে না, মির্চা তোমার জীবনে সত্য নেই তুমি বেঁচে গেছ, তোমাকে কষ্ট পেতে হল না কিন্তু আমার সত্য কেন মরতে চায় না!
লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে—“যাবে তুমি আমার সঙ্গে?”
“না। আমি যদি একটা চিঠি দিই পৌঁছে দেবে?”
“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই”, সে দৌড়ে কাগজ আর খাম নিয়ে এল।
আমি সংক্ষেপে যা লিখলাম তা মোটামুটি এই-মির্চা, বহুদিন পর তোমার খবর পেলাম। কেমন আছ তুমি? বিয়ে করেছ তো? আমি আমার স্বামীর সঙ্গে ইয়োরোপে বেড়াতে এসেছি আমার একটি মেয়ে একটি ছেলে। তোমার সঙ্গে একবার দেখা হলে খুব খুশী হতাম। এক্ষুণি আমরা চলে যাচ্ছি, ডোভার চ্যানেল পার হব একটু বাদেই। লণ্ডনে আমার ঠিকান দিলাম। চিঠি পেয়েই যদি একবার এসো তো খুবই খুশী হব। আসবে তো?
আমার স্বামী এগিয়ে এসেছেন কি একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে আমি তার হাতে চিঠিটা দিলাম, “আমি তোমাকে সেই যে বিদেশী ছেলেটির কথা বলেছিলাম না—সেই ভদ্রলোক এখানে আছেন—তাকে লণ্ডনে নিমন্ত্রণ করলাম।” চিঠিটা উনি চোখ বুলিয়ে আমার হাতে ফেরত দিলেন।
“ঠিক আছে তো?”
“নিশ্চয়। এলে তো খুব ভালো হয়।”
