মাকে এসে বললাম—“মা এতদিনে পথ পেয়েছি” মা অবাক হয়ে গেছেন—শ্রীগুপ্তের কথা শুনে তার চক্ষুস্থির—“এই একটা উপদেশ হল? তুমি আবার তাই শতখান করে বলতে এসেছ? ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ, আমি স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে তাঁর টাকাপয়সা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকব? এরা লেখাপড়া শিখেছেন? আমার স্বামী আগুনে ঝাঁপ দেবেন, আমি তাকে ধরব না, না সিন্দুক গোছাব?” মা কাঁদছেন, আমার একটু মায়া হচ্ছে না—‘আগুনে ঝাঁপ দেবেন’ এখনও future tense-“তা তুমি কি করবে, রুখতে পারবে?”
“দ্যাখ রু, আমার বিরাট প্রতিভাধর স্বামীর দুর্বলতা আমি জানি, এই তো প্রথম নয়, বহুবার তাকে রক্ষা করেছি আমি, নৈলে এত বড় হতে পারতেন না, এবারও করব। তোর যদি আমার কথা ভালো না লাগে তবে চলে যা আমার সামনে থেকে।”
অতুল যশ ও মানের অধিকারী যিনি হতে পারতেন তার নিজের ও সমস্ত পরিবারবর্গের মাথা হেঁট করে, সম্মান সম্রম ও সুখ নষ্ট করে দশ বছর পর যখন তিনি সম্পূর্ণ নির্বান্ধব অবস্থায় মারা গেলেন তখন তিনি মার কাছে ফেরবার জন্য ব্যাকুল হয়েছিলেন, শুনেছি বার বার বলেছেন, “আমার কলকাতায় যেতে হবে আমার ক্ষমা চাইবার আছে সে খবর মার কাছে পৌঁছতে দেরী হয়ে গেল। এটাই আমার অশেষ পুণ্যবতী মাতা ও অসাধারণ ক্ষমতাশালী পুরুষ পিতার জীবনের চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি।
এইসব নানা ঘটনার ভিতর দিয়ে আমার ক্ষুদ্র জীবনতরী কখনো স্রোতে ভাসছে, কখনো চড়ায় লাগছে। আমি আর এখন ছোট বালিকাটি নেই বাস্তব সংসারকে ভালোমতো চিনেছি। মনে কড়া পড়ে গেছে। সূক্ষ্ম অনুভূতির কোমল ত্বক ঘষে ঘষে শক্ত হয়ে গেছে। আমি কাজের মানুষ। নিতান্ত সংসারী। অবশ্য এটা ঠিক, সংসারের কাজে আমার শক্তি ফুরাতে চায় না। কলকাতায় ফিরে এসেও আমি তাই বিষঃ বোধ করি। পুরানো অতৃপ্তি আমার তাই ফিরে ফিরে আসছে সাহিত্যের জগৎ থেকে আমি দূরে চলে গেছি, এখন এখানে ভীড় ঠেলাঠেলি খুব। লেখার সুযোগ পাচ্ছি না আমি। আমার লেখক জীবনটা পথ হারিয়েছে, তাই যে কাজ সামনে পাই হাতে তুলে নিই। নিন্দা অপমান যেমন সইতে হয়েছে, সম্মান শ্রদ্ধাও পেলাম অনেক। সমস্ত মিলিয়ে জীবনটা এখন অসঙ্গত কোনো বেসুরো গান বাজাচ্ছে না।
উনিশ শ’ তিপ্পান্ন সালে আমার ছেলেমেয়েকে কলকাতায় রেখে আমার স্বামীর সঙ্গে ইউরোপ বেড়াতে গেলাম। মির্চার কথা এর আগে দীর্ঘ পনের বছরে একটিবারও আমার মনে পড়ে নি। অর্থাৎ মনে পড়বার মতো করে নয়। হয়তো কখনো মনে হয়েছে এমন। একটা বিশ্রী ব্যাপার না ঘটলে আমার জীবনটা পবিত্র থাকত। মনকে সান্ত্বনা দিয়েছি সেই ছোটবেলার সামান্য একটা ঘটনার অপরাধ কি আর আজ আমাকে স্পর্শ করতে পারে?
ইয়োরোপে দেখা হল হিরন্ময়ের সঙ্গে। বাবার ছাত্র, বিদেশে বিয়ে করে বসবাস করছে। একটা সভায় তাকে দেখে প্রথম চিনতেই পারি নি। একেবারে সাহেব হয়ে গেছে। সে হঠাৎ আমায় জিজ্ঞাসা করলে আপনার ইউক্লিডকে মনে আছে?” আমি ভাবছি এ উদ্ভট প্রশ্নটি করবার অর্থ কি হতে পারে। আমায় নিরুত্তর দেখে সে নিজেই বলছে, “সে আপনাকে একটা বই উৎসর্গ করেছে।”
“শুনে সুখী হলাম। আপনার ছেলেমেয়ে ক’টি?”
এ কথার এখানে শেষ হয়ে গেল। আমার মনে তা বিন্দুমাত্র দাগ কাটল না। সারা ইয়োরোপে চরকীর মত পাক দিচ্ছি আমরা। প্যারিসে এক অধ্যাপক ও তার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ হল তার নাম নিকোলাই স্তানেক্কু। কোথায় কি করে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সেকথা এখন আর কিছুতেই মনে করতে পারছি না—আমি শুধু দেখতে পাচ্ছি একটা বড় বৈঠকখানা ঘর। স্বল্প আসবাবে সজ্জিত। অধ্যাপক দম্পতি আমাদের চায়ের নিমন্ত্রণ করেছেন, এঁরা স্বদেশ থেকে বিতাড়িত। এঁরা মির্চার দেশের লোক। ওদের দেশের রেফিউজিতে প্যারিস ভরা—ওরা নিজেদের লাঞ্ছনার কথা বলছিলেন। নির্বাসিতের দুঃখ অনেক। শুনছিলাম যুদ্ধমত্ত ইয়োরোপে মানুষের দুর্দশার কাহিনী। শুনছি আর ভাবছি। মির্চার কি হল কে জানে! জিজ্ঞাসা করব কি? আবার ভাবছি যাই হোক আমার তাতে কি, মরুক আর বাচুক। তবে মরাটা আমি চাই না, আমার মনে আশা আছে এই বিপুল পৃথিবীতে একদিন না একদিন ওর সঙ্গে আমার দেখা হবে—এবং আমি সেদিন ওকে জিজ্ঞাসা করতে পারব আমার সঙ্গে এমন ছলনা করল কেন?
আমার মনের এক অংশে এ সম্বন্ধে সন্দেহ আছে, সে দিকে প্রশ্ন ওঠে ছলনা কি? বাবা তাড়িয়ে দিলেন ও কি করবে? যাবার সময় তার যন্ত্রণাকাতর মুখটা কি ছলনা হতে পারে? মনের অন্য অংশটা যেখানে অবিশ্বাসের অন্ধকার কালো হয়ে জমে আছে, সেখান থেকে উত্তর আসে ওরা ইয়োরোপের মৃগয়াপটু নাগরিক ওদের কাজই এই। কোনোমতে একটা চিঠি আমার কাছে পৌঁছতে পারত না? তাহলে আমি যা হয় করতাম। প্রত্যুত্তর আসে অন্য দিক থেকে, যদি ছলনাই হবে তবে পাহাড় জঙ্গলে ঘুরে বেড়াল কেন? অত কষ্ট করার দরকার কি ছিল? সারাজীবন ধরেই আমার মন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে মাঝে মাঝেই এই প্রশ্নোত্তর করে চলেছে। মানুষকে বিশ্বাস করতে পারলে শান্তি, অবিশ্বাসে যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণার। হাতে আর পড়তে ইচ্ছা নেই এই মুহূর্তে। একটা স্যাণ্ডুইচ মুখে পুরে খুব নির্বিকারভাবে আমি শ্ৰীমতী স্তনেস্কুকে জিজ্ঞাসা করলাম—“ইউক্লিড নামে একজন লেখককে কি চেনেন?”
“চিনি বৈকি। তিনি ভারতীয় দর্শন সম্বন্ধে অনেক বই লিখেছেন। ভারতীয় সভ্যতা সম্বন্ধে তিনি অভিজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ।”
