দাঙ্গার পরে উনি সুস্থ হয়ে ওঠার পর আমি কবির কথা ভাবতে লাগলাম ‘মানুষের দিকে চেয়ে দেখ। আমি ভাবছি এতবড় যে দুর্যোগ ঘটল এ দোষ আমাদের ছাড়া আর তো কারুর নয়। আমাদের পাশে থেকে যদি এতটা অসন্তোষ পঞ্জীভূত হয়ে থাকে আর আমরা টেরই না পাই তাহলে মূঢ়তা তো আমাদেরই। আমি তখন ভালো করে ওদের দিকে তাকালাম আর তখনই বুঝতে পারলাম যে, যে নির্জনতার দুঃখ আমায় এতদিন পীড়িত করেছে তার থেকে উদ্ধারের পথ ছিল, শুধু সে পথটা আমি চিনতে পারি নি।
আমি অন্তর্মুখী হয়ে বই নিয়ে বসে আছি—আমার শূন্যতা ভরবে কি করে?
সেখানে এ সময়ে পাহাড়িদের ঘরে দুর্ভিক্ষের বছরটা ছাড়া খাদ্যের অভাব ছিল না কিন্তু খাদ্য ছাড়াও মানুষের অন্য প্রয়োজন আছে, আমি তারই আয়োজন করলাম—আমাদের ঘরের দরজা প্রসারিত হতে লাগল। উৎসবে অনুষ্ঠানে ‘কুলি মজুরদের নিয়ে আমার পরের চৌদ্দ বছর পরিপূর্ণ হয়ে গেল।
ওপরওলা একজন আমার স্বামীকে বললেন, “আপনি কি লক্ষ্য করেছেন আপনার স্ত্রী মজুরদের সঙ্গে বেশি মিশছেন।”
“হ্যাঁ।”
“এরকম হলে ডিসিপ্লিন থাকবে কি করে?”
“ডিসিপ্লিনের অভাব আগে কিছু লক্ষ্য করেছি—এখন তো করছি না।”
“আপনি কি আপনার স্ত্রীকে নিষেধ করবেন?”
“না।”
“তাহলে আমি বলব?”
“না না, তাহলেই ডিসিপ্লিন ভঙ্গ হতে পারে।”
দেখলাম, সম্পূর্ণ অজ্ঞ অশিক্ষিত মানুষের মধ্যেও এমন লোক আছে যারা সূক্ষ্মভাবে বুঝতে পারে, যাদের মন গভীরের দিকে উন্মুখ, যাদের গলায় গান আছে, মনে কবিতা আছে, ছাই-ঢাকা আগুনের ফুলিঙ্গ যখন জ্বলতে দেখতাম, আনন্দে মন ভরে যেত। তাদের একজনের হাতে তৈরী একটি শিল্পনিদর্শন আজও আমার ঘরে বহুজনকে আনন্দ দেয়। সঙ্গী সর্বত্র পাওয়া যায়, মানুষই মানুষের সঙ্গী। পৃথিবীতে নানাজাতির, নানাশ্রেণীর সভ্য অসভ্য মানুষ দেখেছি কিন্তু সেই সময়কার গুর্খা জাতির মধ্যে যে সততা, সরলতা ও বিশ্বস্ততা দেখেছি তা পরে অন্য কোথাও দেখি নি। যখন ঐ দুর্গম নির্জন অরণ্যে বাস করতে যাই তখন যে শন্তা নিয়ে গিয়েছিলাম যখন ফিরে আসি তখন তার চিহ্নমাত্র ছিল না, একটি পরিপূর্ণ জীবন নিয়ে আমি ফিরেছি। স্নেহে, সখ্যে, মাধুর্যে তা পূর্ণ। বিনা এনেসথেশিয়ায় হাত কাটতে যাদের চোখে জল আসে না, আমাদের আসার সময় তাদের চোখে জলের অভিষেক আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টার সমাপ্তিকে গৌরবে ভরে দিয়েছিল।
উনিশ শ’ তিপ্পান্ন সালে আমার কন্যার বিবাহ হয়ে গিয়েছে। এদিকে তার দশ বছর আগে আমার মার সংসার উনিশ শ’ বেয়াল্লিশেই সম্পূর্ণ ভেঙ্গে গিয়েছে-উনিশ শ’ একত্রিশ সালেই যে ভাঙ্গনের সূত্রপাত হয়েছিল দশ বছর ধরে একটু একটু করে তার কাজ এগিয়েছে এখন একটা পরিবার সম্পূর্ণ ধ্বংস। মা চারটি শিশু নিয়ে কপর্দকহীন অবস্থায় পৌঁছেছেন—আছে শুধু একখানি বাড়ি। এটিও যখন যায় যায় তখন আমি সিংহবাহিনী মূর্তি ধরলাম বাড়িটা রক্ষা করবার জন্য। আবার নিন্দার ঢেউ উত্তাল হল, এবার অন্যভাবে—-আগে বাবার নিন্দা করে করে যারা আমাদের সংসারটা উত্তপ্ত করে তুলেছিল এবার তারাই অন্যমুখে বলতে লাগত এত বিদ্বান লোকের স্ত্রী কন্যারা টাকা ছাড়া আর কিছু বোঝে না অতএব যোগ্য সঙ্গিনী তো দরকার ছিলই নির্দোষ শিশুগুলিকে যে পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হল, এমন কি তাদের বাচার ব্যবস্থাও করা হল না সেদিকে নিন্দাকারীদের লক্ষ্য নেই। যারা জীবনে নানা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে তারাই শুধু জানে, কোনো কোনো ঘটনা বাইরে থেকে যা দেখায় তাই তার যথার্থ রূপ নয়। একই ভালোবাসা যা মানুষকে স্বর্গের ছবি দেখায়, তার চারপাশ সৌরভে ভরে দেয়, তারই আবার এমন রূপ আছে যা মানুষকে চূর্ণবিচূর্ণ করে, সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারে। বাইরে থেকে দেখতে উভয়ের রূপ একই যেন দুই যমজ ভাই কিন্তু একজন প্রাণ দেয়, অন্যজন হরণ করে।
পতিপ্রাণা মা ছোট শিশুদের নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন—মানসিক কষ্ট তো আছেই কিন্তু আর্থিকটাও কম নয়। একটি বাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই, তা বাড়ির ইট তো আর ভেঙ্গে ভেঙ্গে খাওয়া যায় না। কলকাতার বিখ্যাত আইনজ্ঞ আমাদের পরম সুহৃদ শ্রীযুক্ত গুপ্ত আমাকে ডেকে পাঠালেন, “তোমার মা ইনশিওরেন্সের এসাইনি ছিলেন, তিনি নিজে না লিখে দিলে কেউ তা ফেরৎ নিতে পারত না দিলেন কেন?” মার উপরে রাগে আমার অস্থির লাগছে।
“মা ঐরকমই। আমি জানতাম না, তাহলে কিছুতে হতে পারত না।”
“দেখো অমৃতা, বাড়ি সম্বন্ধে কোনোকাগজে কিংবা সাদা কাগজেও যেন আর সই না করেন, মোটের উপর তোমার মা আর কিছু সই-ই করবেন না।”
“আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।”
“তাহলে আরো একটা কথা তোমায় বলি, বিষয়-সম্পত্তি এক পয়সা ছেড়ো না, যা পার ধরে রাখ, কিন্তু মানুষকে তোমরা ছেড়ে দাও।”
“মানুষকে ছেড়ে দাও, মানুষকে ছেড়ে দাও”, ক্রমে ক্রমে কথাটা বড় হতে লাগল যেন একটা কালো জমাট মেঘ আকাশ ঢেকেছিল সেটা ফুটো হয়ে গেল, ছোট-ছোট টুকরো-টুকরো হয়ে সাদা তুলোর মত ছড়িয়ে পড়ল, তার ফাক দিয়ে দিয়ে নীল রঙ দেখা গেল। আমি যেন একটা বন্ধ ঘরে আটকে ছিলাম, এখন খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিলাম। ঠিকই তো, মানুষকে কে ধরে রাখবে? ‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে? এতদিন আত্মীয়স্বজনের উপদেষ্টামণ্ডলী আমাদের কি উদ্ভ্রান্তই করেছে। এই ছিন্নপাল সংসারের তরণীটা একবার এর কথায় আবার ওর কথায় যেন একটা পাথরে লেগে লেগে ফুটো ফুটো হয়ে গেল। এ বিপদে কি যে-সে লোক পথ দেখাতে পারে। একটা জ্ঞানী লোকের কথা শুনলাম।
