একবার যাবার আগে গোছগাছ চলেছে, আমি বইগুলো স্যুটকেসে ভরছি হঠাৎ আমার ভীষণ মন কেমন করতে লাগল, উনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বই পড়ছিলেন, আমি এসে ওর পায়ের কাছে বসে পড়ে ওর কোলের উপর মাথা রেখে কাঁদতে লাগলাম, ওর ডান হাতে বই ধরা ছিল সেটা বা হাতে নিয়ে ডান হাতটা আমার মাথার উপর রেখে বললেন, “কোনো ভয় নেই, কোনো ভয় নেই”—ঠিক তখুনি ‘সুবাবু ঘরে ঢুকলেন—ঢুকে আমায় ঐরকম ক্রন্দনরতা দেখে অপ্রস্তুত, আমি বুঝতে পারছি কবিও অপ্রস্তুত-আমার চুলের মধ্যে ওর চলমান আঙ্গুল গুলো থেমে গেছে। প্রকাশ্যে আবেগ দেখান ওর পছন্দ নয়। একটি মুহূর্ত মাত্র, তারপর উনি খুব সহজভাবে বললেন, “সু তুই আর এর সাক্ষী থেকে কি করবি বরং মীলুকে ডেকে দে”—মীলু এসেই আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলল, “কি পাগলামি শুরু করেছ? ওকে এরকম করে জ্বালাতন করলে উনি আর কোনো দিনই আসবেন না”—কবি বলছেন, “তুমি যে দেখছি উল্টা বুঝলি রাম, আমি কি অমৃতার হাত থেকে রক্ষা করতে ডেকেছি তোমায়? আমি ডেকেছিলাম ‘সু’র হাত থেকে রক্ষা করতে!”
সেদিন সন্ধ্যেবেলা আমায় তিনি একটা কথা বলেছিলেন বহুমূল্য রত্নের মত সে কথাটা আমি হৃদয়ে ধারণ করে আছি। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, লম্বা লম্বা গাছগুলো অন্ধকার শুষে নিয়ে কালো কালো দীর্ঘদেহ প্রেতের মত দাঁড়িয়ে আছে। পরের দিন এঁরা চলে যাবেন—আমি চুপ করে ওর পায়ের কাছে বসে আছি। তখনো সবাই বেড়িয়ে ফেরেন নি, তাই চারদিক আরো নিঃশব্দ। হঠাৎ কবি বললেন, “আমি তোমায় একটা কথা বলছি অমৃতা, এতে যদি তোমার কোনো সান্ত্বনা হয়—জীবনে আমি অনেক পেয়েছি, তবু শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসার মিলিত যে অর্ঘ্য তুমি আমাকে দিয়েছ এরকম জিনিস আমিও বেশি পাই নি। বিদায়ের আগে এ আমারও দরকার ছিল নইলে বার বার আসতুম না।”
তিনি জানতেন আমার কর্মশক্তি যে পাহাড়ের কন্দরে আটকে আছে এটাই আমার সবচেয়ে ক্ষতি। এমনিতেই আমাদের দেশে তখন মেয়েদের কর্মক্ষেত্র ছিল সঙ্কীর্ণ—ওরকম একটা স্থানে তো কথাই নেই—আমার কর্মের পথও তিনি খুঁজছিলেন—
লেখার ঘর থেকে দেখা যায় একটা পার্বত্য পথ, সেখান দিয়ে চলাচল করে মালবাহী ঘোড়া নিয়ে মজুরের দল। সেই দিকে তাকিয়ে একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, “এখানে পাহাড়ীদের সংখ্যা কত?”
“চার পাঁচ হাজার হতে পারে!”
“তবে তোমরা একলা কেন? ওরা কি মানুষ নয়? ওদের তোমার ঘরে ডাক, ওদের কাছে যাও, মানুষের কত সমস্যা আছে, তাদের বন্ধু প্রয়োজন, ওদের বন্ধু হও না কেন?”
সেই জন্যই তার জন্মদিনে আমরা পাহাড়ীদের নিয়ে উৎসবের আয়োজন করলাম— এখানকার অর্থাৎ এ জেলার ইতিহাসে শুধু নয়, বোধ হয় সরকারী প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মচারীর বাড়িতে এই প্রথম মজুরেরা নিমন্ত্রিত হয়ে এল। চা বাগানের মতো এখানেও নিয়ম ছিল কোনো অফিসারের বাড়ির হাতায় কোনো মজুর জুতো পরে ঢুকবে না। কোনো মজুর ঘোড়া চড়ে চলেছে, অফিসারের সঙ্গে দেখা হলে তৎক্ষণাৎ নেমে পড়তে হবে। একজন নামে নি বলে রিচার্ডস তাকে বেত মেরেছিল। এই সমাজে আমি একটা নূতন কাজ পেলাম, নূতন পথের নিশানা। ক্রমে ক্রমে আমাদের ঘরের দরজা ওদের দিকে খুলে গেল।
উনিশ শ’ বেয়াল্লিশের দুর্ভিক্ষের সময় ইংরেজদের আসল মূর্তিটি দেখলাম–আমাদের উপর তো বিরুদ্ধতা ছিলই, চক্রান্ত করে গুর্খাদের রাগিয়ে তুলল এখানে যে কয় ঘর বাঙ্গালী আছে তাদের বিরুদ্ধে ও এ জেলার সমস্ত বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে। ইংরেজরা এই কাজে কত দড় তা সে সময় বুঝলাম। ওরা তো তখন হিন্দুমুসলমানের দাঙ্গায় উস্কানী দিয়ে দিয়ে বিভেদের গহ্বর খুঁড়ে খুঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে এই বিশাল দেশের চিত্তভূমি, এখন ওদের নূতন করে রাগের কারণ এই যে বাঙ্গালী মন্ত্রিসভা হয়েছে—ভারতীয়করণ চলেছে এবং বাঙ্গালীরা বিদ্যায় ওদের চেয়ে বড় হওয়ায় ওদের মাথার উপর চলে গেছে, যাচ্ছে–উচ্চপদ পাচ্ছে। অতএব আবার সেই একই অস্ত্রে শাণ দাও। ওরা মজুরদের ক্ষেপিয়ে তুলছে, বলছে, আগেও তো যুদ্ধ হয়েছিল তখন কি চালের দাম এতো হয়েছিল? এখন বাঙ্গালীর রাজত্ব হচ্ছে বলেই এই দশা, এরপরে যখন আমরা অর্থাৎ ইংরেজরা চলে যাব তখন তোমাদের গুর্খাদের কি হবে অবস্থা বুঝতে পারছ? কেউ আর চাকরী পাবে না, এরা বাঙ্গালী এনে এনে পাহাড়টা ভরিয়ে ফেলবে। অতএব ঠেঙ্গাও বাঙ্গালীদের, এরাই তো ইংরেজ তাড়াচ্ছে, অতএব শেষ কর এইবেলা এদের।
অথচ আমরা এ সব কিছু টের পাচ্ছি না। আমরা সরল ভালোমানুষ পড়য়া, রাজনীতির কিছু জানি না।
ভোরবেলা উঠে আমার স্বামী মিটিং-এ চলে গেছেন—চাল কেন পাওয়া যাচ্ছে না তার কৈফিয়ৎ দিতে হবে! দুপুরবেলা যখন ওকে নিয়ে এল তখন সারা শরীর রক্তে ভাসছে—উনি কিন্তু হাসছেন—“ভয় পাবার কিছু নেই—বিশেষ কিছু নয়–”
সেই সময়ে ভালো করে দেখলাম পুলিশের সঙ্গে যোগ রেখেই চক্রান্তটা হয়—নৈলে ব্যাপক দাঙ্গা হতেই পারে না। রটেছিল রাত্রে সমস্ত বাঙ্গালীদের পুড়িয়ে মারা হবে, দুটি শিশু নিয়ে আমি তো তারি অপেক্ষায় ছিলাম, তবুও সাহেব এস. পি এসে সাহেবদের সঙ্গেই কথা বলে চলে গেল। কিছুতেই থাকল না—তার স্ত্রী নাকি ডিনারে অপেক্ষা করছে। সে আবার স্বামী পাশে না থাকলে খেতেই পারে না। সেই সময়ে বুঝতে পেরেছিলাম, দাঙ্গাকারী যারা হাতে অস্ত্র নিয়ে মানুষ মারে তাদের দোষ নেই বললেই হয় কারণ তারা একটা কিছু করা উচিত মনে করে, তার জন্য নিজেরাও বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে—অপরপক্ষে যারা চক্রান্ত করছে তারা নিজে কোনো দায়িত্ব না নিয়ে অন্যকে বিভ্রান্ত করে নিজে ফলটা ভোগ করতে চাইছে। তারপর থেকে সর্বদাই এই দেখলাম মানুষকে হিংস্র করে তোলবার কাজে যারা হাত পাকাচ্ছে তারাই মুখে বড় বড় কথা বলে সেজেগুজে সভায় এসে বসে…আসলে এটা ইংরেজদের একচেটিয়া নয়। যে সুবিধা পাবে সেই করবে।
