আসলে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই এর উল্টো হয়েছিল, আমি যে ওদের থেকে ভালো কাচতে পেরেছি তা কখনই নয় কিন্তু এটা পুরস্কার।
তিন বছরে চারবার এসেছিলেন কবি এই গণ্ডগ্রামে—পঞ্চমবার এখানে আসবার পথে কালিম্পং-এ অসুস্থ হওয়ায় আর আসা হল না। এই তিন বছরের পরিপূর্ণ দানে আমার সব ক্ষয়ক্ষতি ধুয়ে মুছে গেল—এই তিন বছরেই আমার সেই সত্তা তৈরী হয়েছে যে নিজেকে সময়সীমা অতিক্রম করে দেখতে শিখেছে।
আমি অনির্বচনীয়কে অনুভব করেছি-‘পেরিয়ে মরণ সে মোর সঙ্গে যাবে কেবল রসে কেবল সুরে কেবল অনুভাবে। এ দানের মহিমা তখন ঠিকমত বুঝতে পারি নি। এই দুর্গম স্থানে ঐ বিপজ্জনক পথ পার হয়ে আসা কি সহজ কথা! আমার নিকটতম আত্মীয়ের মধ্যেও তার চেয়ে অনেক কম বয়সেরও যারা ছিলেন তারা সাহস করতেন না। কিন্তু চিরতরুণ কবি বাইরের বাধাবিঘ্ন গ্রাহ্য করলেন না। আরো আমার আনন্দের কথা এই যা অ-বাবু প্রায়ই মনে করিয়ে দিতেন তা হচ্ছে এক জায়গায় ইতিপূর্বে উনি দু’বার যান নি।
এ নির্জন অরণ্যে বিশ্বকবির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বও এল, আমি পৃথিবীর মানুষের সঙ্গ পেলাম।। দেশবিদেশের গল্প শুনতাম। বার্গস, যার দর্শন পড়েছি যিনি একজন জীবিত মানুষ তা ভাবি নি কখনো তার কথা শুনলাম। বানার্ড শ’, রোমা রোলা, বাট্রাণ্ড রাসেল সব বইয়ের মলাটের নামগুলো নানা কথা বলতে লাগল। অজ্ঞাত বিশ্বের দৃশ্য দেখলাম। সবচেয়ে বেশি শুনতাম রাশিয়ার কথা। সেখানে যে নূতন পরীক্ষা চলেছে তার প্রতি তাঁর আগ্রহের অন্ত ছিল না। বৃহদাকার মস্কো নিউজ আমি সেই প্রথম দেখলাম—তিনটে প্রবন্ধ আমাকে দিয়ে অনুবাদ করালেন তিনি—সেগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় গেল। সব দিক থেকে পূর্ণ হয়ে উঠছি আমি—আমাকে মানুষ করলেন তিনিবললেন, মানুষের ইতিহাসটা পড়ো-ছয় বছর ধরে মহাভারত পড়লাম, দু’বছর ঋগবেদ আর পাঁচ বছর ‘হিস্ট্রোরিয়ান্স হিস্ট্রি অফ দি ওয়ার্লড’—তারই নির্দেশে।
আমাদের এই সংসারটা সবসুদ্ধ তাঁর ভালো লেগেছে—-আমার স্বামীকে উনি বলেন পারফেক্ট জেন্টলম্যান। বাহিরে সুন্দর প্রকৃতি আর তার সহযোগী মানুষের সখ্য দুটো নিয়ে একটা সম্পূর্ণতা।
আমার স্বামীও এখন আগের চেয়ে অনেক কথা বলেন। আমি একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম-“আমি যে সর্বদা এঁকে নিয়ে এত মেতে আছি তাতে তোমার হিংসা হয় না? হাসচ কেন? বল না, বল না।”
“হিংসে হতে যাবে কেন? তুমি যা তুমি তা, অন্যরকম করতে চাইব কি আমি?”
“তবু হিংসে হওয়ার কথা কিন্তু।”
“কার সঙ্গে কথা? তুমি যদি মীরাবাঈ হতে আমি কি হিংসা করতুম!”
একদিন লেখার ঘরে কবি বসে আছেন লেখার টেবিলের পাশের চেয়ারে—আমি স্নান সেরে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছি—চারদিকে সেদিন রোদ ঝলমল করছে—দূরে মাছের জন্য একটা জলাশয় করেছি তারই পাড় ঘেঁষে ফুটেছে টাইগার লিলি— শ্রেণীবদ্ধ দীর্ঘ রঙীন রেখার দিকে উনি তাকিয়ে আছেন, বলছেন, “কি সুন্দর এই ফুলের সারি সাজিয়েছ-কে এই বিদেশিনী?”
“ওতো জংলি লিলি। এখন তো ফুল নেই,—শীতের সময়েই ফুলের সমারোহ।
“জানো অমৃতা, তোমরা খুব সুন্দর করে সংসার করছ—আমি জানতুম তুমি পারবে। যখন প্রথম এখানে আসার কথা হয় সকলে বললে, কি জানি কি রকম ব্যবস্থা হবে, আপনার কষ্ট হবে। আমি ভাবছি সে তো জানে আমার কি দরকার, নিশ্চয় অসুবিধা হবে না নৈলে ডাকবে কেন? সুন্দর তোমার সংসারটা ঐ ঝরনার মতো ঝর ঝর করে গান গেয়ে বয়ে চলেছে—সবচেয়ে আমার কি ভালো লাগে জানো, তোমরা দুজনে ঝগড়া কর না—দেখি তো ‘প’ আর ‘র’-কে কি ঝগড়াই করতে পারে, থামতেই চাই না, থামতেই চায় না, ‘প’ শেষ পর্যন্ত চুপ করে যায় কিন্তু ‘র’ আর থামে না, সাপের মতন ফিরে ফিরে আসে।”
“তা আপনি কিছু বলেন না?”
“কত বলি কিছু হয় না। সুন্দর সংসার সৃষ্টি করাও একটা সৃষ্টিকর্ম, একটা কাব্য। এই ফুলের রাজ্যে ফুলের মত শিশুটিকে নিয়ে তোমরা সুখে আছ—এতে আমি খুব খুশী হয়েছি অমৃতা, তাই তো বার বার আসছি”
চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে আমার শরীর মন নিস্পন্দ—সত্য কথা বলতে হবে আমায়, এখুনি বলতে হবে—আমার সারা জীবনটা কি মিথ্যা দিয়ে গড়ব?
“আপনি যতটা বলছেন তা ঠিক নয়, আপনাকে ঠকাচ্ছি আমি।”
“কি বলছ?” উনি পিছন দিকে হাতটা বাড়িয়ে টেনে আনলেন আমায় সামনের দিকে—“কও কি কন্যা? ঠকাচ্ছ কাকে?”
“সকলকে। কিছু করতে পারি নি আমি, সব বাইরের। অর্ধেক ভুয়া—আমার একলা রাতের কোনো সঙ্গী নেই।” আমি এখন প্রস্তুত, সম্পূর্ণ প্রস্তুত—উনি যদি কোনো ভর্ৎসনা করেন ভালো হয়।
“কেনো নিরর্থক আত্মপীড়ন করছ? আমি তোমাকে আগেও বলেছি আবারও বলছি মানুষ আপনাকে যা দিতে পারে তা দেশ, কাল, পাত্রে সীমাবদ্ধ—সবটা দেওয়া যায় না, পাওয়াও যায় না, তাই যা পাওয়া গেল না তার জন্য হা-হুতাশ করে লাভ কি? যা হয়েছে তাই কি যথেষ্ট নয়? ফুলের সারির দিকে হাত দেখিয়ে বললেন—“এই যা হয়েছে, এই যা করেছ এর জন্যই আমি grateful madam, grateful to you–”
এসব কথা সত্ত্বেও আমি বুঝতাম এই গভীর নির্জনতার কতখানি ভার আছে তা তিনি বুঝতেন—প্রত্যেকবারই যাবার সময় তাই আমাদের সঙ্গে সঙ্গে নামতে হত। আমরা শূন্য ঘরে বসে থাকব আর ওরা সদলবলে চলে যাবেন তাঁর করুণাদ্রব মন তা কিছুতেই সহ্য করতে পারত না। যাবার কয়েকদিন আগে থেকেই তাই বলতে শুরু করতেন এর চেয়ে না এলেই ভালো হত—তোমাদের কষ্ট বাড়ানো—আমি আর আসব না!
