কিন্তু আমার সাহস হচ্ছে, অনভিজ্ঞতার সাহস, আমি এই অগম্য স্থানে আসবার জন্য কবিকে ডাকছি, যদিও উনি অল্পদিন হয় দারুণ ইরিসিপ্লাস রোগে ভুগে উঠেছেন—আমার চিঠি পেয়ে তার ধারণা জন্মাচ্ছে যে আমি আমার প্রতিজ্ঞা রেখেছি এবার তাঁরটি রাখতে হবে। মার একটা চিঠি পেয়ে আমার উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। মা লিখেছেন, “আমরা চণ্ডালিকা দেখতে গিয়েছিলাম। নাচ শেষ হলে যখন কবিকে প্রণাম করতে গিয়েছি, তিনি বললেন,—অমৃতা আর এসব কিছু দেখতে পায় না—কোথায় যে তোমরা তাকে পাঠিয়ে দিলে সুধা।” মা আরো লিখেছেন, “আমার মনে হয় আমাদের দেখলে ওর তোর জন্য মন কেমন করে।”
চিঠিটা পেয়ে আমি আবার তাকে আসবার জন্য লিখলাম। আমি সাধারণত তাকে বেশি চিঠি লিখি না কারণ আমি জানি চিঠি দিলে উত্তর না দিয়ে তিনি পারেন না কিন্তু অত কাজের মধ্যে সহস্র জনের সহস্র আব্দারে উনি উদ্ৰব্যস্ত। আবার কেন আমি পরিশ্রম বাড়াব? কিন্তু এখন আমি লিখছি, এমন চিঠি লিখছি যাতে তিনি মনে করেন আমি একেবারে আনন্দের জোয়ারে ভাসছি।
আসবার কথা ঠিক হবার পর থেকে আসা পর্যন্ত দু’তিন মাসের সময়টা ঐ জোয়ারের তরঙ্গ উত্তাল হয়। এ পাহাড়ে দু’চার ঘর ও কাছাকাছি পাহাড়ে যে সব বাঙালী আছেন সকলেই চমৎকৃত। এখন আত্মীয়স্বজন অনেকেরই ইচ্ছা আমার বাড়িতেই এসে থাকে কিন্তু আমি এখন ভীড় চাই না।
আমরা সাজানো বাড়ি আবার সাজাচ্ছি-ঘষা মাজা চলছেই—ফুলের কেয়ারী ছাঁটা হচ্ছে, লনে ঘাস বাছা হচ্ছে, টবে রং হচ্ছে, পর্দা বদল হচ্ছে—আমি রেখেছি—রেখেছি কনক মন্দিরে কমলাসন পাতি’—আমার নির্জনতার অবসাদ কোথায় পালিয়ে গেছে, যে ঝরনাটা ঝরঝর শব্দে আমাকে হয়রান করে দিত এখন তার শব্দটা বদলে গেছে সেটা কুলকুল ধ্বনি হয়ে গেছে, আর ঐ যে ঝিঝি পোকার দল দিবারাত্র ঝি ঝি ঝি ঝি করে আমার মাথার মধ্যে ভ্রু-ড্রাইভার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঢোকাত হঠাৎ সেটা ঝিল্লীরব হয়ে গিয়েছে। সিলভার ফারের পাতার ভিতর দিয়ে ঝড়ের বাতাস সো সেঁ করে অরণ্যের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আসত সেটাও স্বর্ণবীণার মত বাজতে লাগল—‘তুমি এস, হৃদে এস, হৃদিবল্লভ হৃদয়েশ—’
উনিশ শ’ আটত্রিশ সাল থেকে চল্লিশ এই তিন বছর হচ্ছে আমার জীবনে আলোকবর্ষ বা অ-লোক বর্ষ—আমি এই সময়কার কথা এখানে লিখছি না—শুধু আমার অন্তৰ্জীবনপ্রবাহের গতিটা চিহ্নিত করছি। সময়ের আপেক্ষিকত্ব আমি নানাভাবে বুঝছি। এই তিন বছরে যখন তিনি আসছেন বা ফিরে গিয়ে আবার আসবেন এই সময়ের মধ্যে কোনো ছেদ নেই—এটা একটা অখণ্ড সময় যা আমার সারাজীবনের চিরঅতৃপ্তির মাঝখানে অমৃতপাত্র হাতে অচঞ্চল আছে, আমার অকিঞ্চিৎক্তর জীবনকে মহৎ মূল্য দিয়েছে।
এই গার্হস্থ্য তাঁর ভালো লাগছে। আমি শেষ রাতে উঠে প্রস্তুত হই–যখন তিনি ভোরবেলায় পূর্বমুখী হয়ে ঘণ্টা দেড়েক বসে থাকেন তার চেয়ারের পাশে এসে বসি—এই ভাবে আমার দিন শুরু হয়, শেষ হয় যখন তাকে বিছানায় শুইয়ে গায়ে চাদর দিয়ে মশারী গুঁজে দিয়ে আসি তখন। ইনি বাড়িতে থাকা মানেই সর্বদা একটা রাজসূয় যজ্ঞ চলেছে—এত যে নির্জন জায়গা তাও ঝুপ করে সকাল দশটা এগারটায় এক গাড়ি লোক এসে উপস্থিত হবে পথ খুঁজে খুঁজে—আগে খবর দিয়ে আসবে তার উপায় নেই কারণ এখানে তো টেলিফোন নেই। তখন এই অতর্কিত আক্রমণে আমি পরাজিত হই না। তাদের মধ্যাহ্নভোজনের ব্যবস্থা করি ভালোমতোই। নির্জনতা পালিয়ে গেছে এই পাহাড়ে গ্রাম থেকে বাড়িতে সর্বদা উৎসবের গান বাজছে শুধু আমার মনে নয় সকলেরই মনে। আমার স্বামীও আগের চেয়ে বেশি কথা বলছেন, তাঁর টিপ্পনীকাটা রসিকতাও সংখ্যায় বেড়েছে। চারিদিকে বাতাস যেন সুখে লঘু—আমরা উড়ছি, পৃথিবীর মাটি থেকে একটু উপরে উঠে আছি। আমি তার সব কাজগুলি নিজের হাতে করি, লেখা কপি করা থেকে শুরু করে টেবিল ঝাড়া, বিছানা করা রূপার থালা মাজা, পালিশ করা সব। ওদের বাড়ির ভৃত্যকুল এতে অবাক হয় কারণ তারা এমন কাণ্ড দেখে নি। যে ঘরটায় উনি বসে লেখেন সেই ঘরের পাশে ওর স্নানের ঘর, তারপরে শোবার ঘর। একদিন স্নানের ঘরে বসে ওর কাপড় কাচছি-বাগানের দিকের দরজাটা খোলা আছে, বাগানের পথ দিয়ে যেতে যেতে অবাবু হঠাৎ দেখতে পেয়ে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এলেন—“একি ব্যাপার কি? আপনি কাপড় কাচছেন কেন? এতগুলো লোক রয়েছে কি করতে?”
আমি খুব বিপদগ্রস্ত মনে করছি, চুপচাপ তাড়াতাড়ি কাজ সেরে নেবার চেষ্টা করছি।
“ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন-একি? এরা সব গেল কোথায়?”
“চলে যান অবাবু, আমি রোজ করি, আজও করব।”
“রোজ কাপড় কাচেন?”
“হ্যাঁ, তাতে আপনার কোনো ক্ষতি হয়?”
“উনি যদি জানতে পারেন খুব রাগ করবেন।”
“জানতে পারবেন কেন?”
“আমি বলে দেব তাই”—এই বলে অবাবু হঠাৎ লেখার ঘরের দিকের দরজাটা খুলে দিলেন। তারপর কবিকে লক্ষ্য করে বললেন, “দেখুন একবার অমৃতা দেবী আপনার কাপড় কাচছেন বসে বসে, কথা শুনছেন না—”
আমি তো অপ্রস্তুত। আমার কর্ণমূল ঝা ঝা করছে, আমি কাপড় ছেড়ে অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে আছি। উনি চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা বই পড়ছিলেন। বইটা মুখের সামনে থেকে নামিয়ে এই দৃশ্য দেখে মৃদু মৃদু হাসছেন—“তুই থাম তো অ—তুই এ সবের কি বুঝিস? দরজাটা বন্ধ করে দে। তুমি তোমার কাজ কর অমৃতা, আমি তো তাই ভাবি আমার কাপড় এত ফর্সা হয় কি করে আজকাল!”
