এই রাজ্যে আমার দিন কাটছে, এখানে দেখবার অনেক কিছু আছে বর্ণ, গন্ধ, রূপের এক সমারোহ যা দেখবার চোখ আমার একটু একটু করে দিনে দিনে তৈরী হচ্ছে। তবু আমার সেই ‘তবু আমায় কোনোদিনও ছাড়ল না কখনো অধরাত্রে আমি উঠে আসি আমার স্বামীর শয্যা থেকে, বারান্দায় বসে থাকি, মনে মনে আমার পরিচিত লোকদের কথা ভাবি, ওরা নিশ্চয় ওদের অবস্থায় সন্তুষ্ট, আমি কেন নয়? আমি তো সবই পেয়েছি তবু আমার শূন্যতা কেন যায় না? আমি যা করতে এসেছি যেন তা করা হল না, আমি যা বলতে এসেছি তা যেন বলা হল না, আমি যা চেয়েছি তা যেন পাওয়া গেল না—এই অনির্দিষ্ট আকাঙক্ষায়, এই চির অতৃপ্তির কোনো নাম নেই, কারণ এটা বোধ হয় খুব স্বাভাবিক জিনিস নয়—এ যেন সুখে থাকতে অসুখ সৃষ্টি করা, তবু আমার ঐরকমই। মায়াকভস্কির একটা কবিতা পড়েছিলাম তাতে যেন আমার এই সময়কার মনের ভাবটা আছে—‘শোনো এখন! যদি আকাশে তারা জ্বলে তাহলে নিশ্চয় কেউ আছে যে সেগুলো দেখতে চায়, এমন কেউ আছে সে যেন বলে ওগুলো জ্বলুক, কেউ বলে ঐ ছোট বিন্দুটা কি, ওটা কি একটা রত্ন? মধ্যদিনের ধুলোর ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে ঈশ্বরের প্রসারিত হস্ত চুম্বন করে সে বলে, তারাহীন হয়ে আমি বাঁচতে পারব না।
অন্ধকার একলা রাতের ঠাণ্ডা বাতাসে আমি এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি—একটি তারা দেখব বলে। আকাশভরা তারার মাঝে আমার তারা কই?
কেউ যদি মনে করেন যে কাহিনী দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম এ বেদনায় তারই স্মৃতি অনুসূত তাহলে ভুল হবে, একেবারে ভুল। আমার এই শূন্যতাবোধ কোনো একজন ব্যক্তির জন্য নয়, একেবারে নয়। এ শূন্যতার অর্থ আমি জানি আমি অন্য কাউকে নয় আমাকেই খুঁজছিলাম। আমার সত্তার যে অংশ নিজেকে অভিব্যক্ত করতে পারে নি তারই বেদনা। আমার বুকের মধ্যে মোচড় দিত। আমার অন্য অংশ হৃষ্টচিত্তে সংসারে লিপ্ত ছিল। যখন সন্ধ্যা নামতেই বেয়ারা জানালা বন্ধ করে ফায়ারপ্লেসে মোটা মোটা কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে যেত—আমি আগুন পোয়াতে পোয়াতে বসে উল বুনতাম আমার স্বামী একটা বইয়ের পাতা ওল্টাতেন, দুজনেই নীরব। তখন আমি কোনো সূক্ষ্ম জিনিস ভাবতাম না। কারুর জন্য আমার মন কেমনও করত না। স্বামীর চাকরীর উন্নতি, উপরওয়ালার অবিচার, কন্যার খাদ্যে অনীহা ইত্যাদি নিয়ে চিন্তিত হতাম—কিংবা নূতন কোনো ফার্নিচারের নকশা ভাবতাম।
জীবনের কথা লিখতে গিয়ে ভাবছি এ জীবনটায় কোনো বৃত্তান্তই নেই–থাকবে কি করে? বৃত্তান্ত ঘটে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শে সংঘর্ষে বা কর্মবহুল জীবনের নানা ঘটনায় প্রকৃতি আর কি বৃত্তান্ত ঘটাবে? এখানে যা সব ঘটনা ঘটে তা মারাত্মক হলেও তা নিয়ে জীবনের গল্প হয় না। যেমন দাবানল জ্বলে প্রতি বছর। দাবানল’ কথাটা কাব্যে অনেকেই পড়েছে, দেখেছে ক’জন? গ্রীষ্মকালে গহন বনে পাতা শুকিয়ে শুকিয়ে ইন্ধন হয়ে থাকে তারপর হঠাৎ কোনো শুকনো ডালের ঘর্ষণে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে কিংবা কোনো বনচারী অসাবধানে অগ্নিকণা ফেলে গেলে শুকনো পাতায় আগুন লাগে, ধীরে ধীরে ধুইয়ে ধুইয়ে সেই আগুন বাড়তে থাকে, তারপর যখন সমস্ত পাহাড়টা জ্বলে ওঠে বহুদূর থেকে দেখা যায়। গাছ থেকে গাছে, পাহাড় থেকে পাহাড়ে বুভুক্ষু অগ্নিদেব লাফিয়ে লাফিয়ে চলেন—পশুদের পালাবার পথ থাকে না, তাদের আর্তনাদ শোনা যায়। একবার দাবানল জ্বললে তা নেবান যায় না। একমাত্র উপায় একটি বৃত্ত করে গাছ কেটে দেওয়া যাতে আগুন ছড়িয়ে না যায়। এই বিপজ্জনক কাজে আমার স্বামীকেও এগিয়ে যেতে হয়, কারণ বুদ্ধিমান লোকের পরামর্শ প্রয়োজন। মানুষের বোকামী কতদূর পৌঁছতে পারে তা প্রায়ই এখানে দেখি। মাটি কাটা হচ্ছে রাস্তা চওড়া হবে, দুটো লোক কেটে যাচ্ছে কেটেই যাচ্ছে—উপরে বড় পাথর আছে নিচে মাটি কেটে কেটে পাথরটাকে আলগা করে ফেলেছে তারপর সেই বিরাট প্রস্তরখণ্ড তাদের উপর গড়িয়ে পড়ল, দুটো মানুষের জ্যান্ত কবর হয়ে গেল। আমার স্বামী ছুটলেন। শুনলাম তোক দুটো সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে, শুধু একজনের একখানা হাত বেরিয়ে আছে। ইনি তে চোখে দেখে এসেছেন আমি শুনে। শুনেও ঐ একখানা মৃত হাতের কথা ভুলতে পারলাম না অনেক দিন।।
আদিম অরণ্যের কথা বলছি—আদিম অর্থাৎ এখানে প্রথম যে গাছ জন্মেছিল সেই আছে—এখনও এখানে সেই সব গাছ আছে যা যে যুগে কয়লা হয়েছিল সেই যুগের গাছ-ট্রী-ফার্ন—ফার্ন গাছই কিন্তু বড় বড় খেজুর গাছের মতো। কোনো মানুষ কখনো। ঢোকে নি এরকম বন আছে, সেখানে এখন নূতন আবাদ হবে। হাতির পিঠে সেই খাড়াই পাহাড়ে উঠে আবাদের জন্য উপযুক্ত জমি বেছে নিলে সেইখানে গাছকাটা শুরু হবে, যন্ত্রপাতি কিছু নেই, বিরাট বিরাট বনস্পতি কুড়ল দিয়ে কাটা হচ্ছে। প্রায়ই দুর্ঘটনা। ঘটে—গুর্খাদের সহ্যশক্তি তুলনাহীন—বিনা এ্যানেসথেশিয়ায় ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং করে যদি হাড় কাটে হাতুড়ে ডাক্তার—এরা চুপ করে থাকতে পারে। কলকাতার শৌখীন পরিবেশ থেকে আমি এইখানে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা কাটাতে এসেছি।
এই গণ্ডগ্রামে টেলিফোন তো নেই, টেলিগ্রাফ অফিসও নেই—একটা খোড়ো ঘরের হাসপাতালে একটি হাতুড়ে ডাক্তার আছে—টেলিগ্রাফ অফিস পাহাড়তলিতে সাত আট মাইল দূরে। এই পাণ্ডববর্জিত দেশে আসতে হলে ছয় মাইল খাড়া পাহাড় খুব সরু পথ দিয়ে উঠতে হয়। গাড়িটা প্রায় সোজা হয়ে থাকে এবং খাদের দিকে দু’তিন ইঞ্চি জমি বাকি থাকে কোনো কোনো সরু বাকে।
