“জানি বৈকি, সেখানে চা-এর চাষ হয়–”
“ওঃ তাই জানো, সেখানে বহু আগে ভারতীয় সভ্যতা গিয়েছিল, গিয়েছিল শ্যামদেশেও তা জানো?”
“Never heard of such a thing”–ইংরেজ আসবার আগে ভারতীয় সভ্যতা বলতে কিছু ছিল কি?”
নাও ঠেলা! এদের সঙ্গে কি কথা বলবে? আমার স্বামী তো সহজে কোনো কথা বলতে চান না, বিতর্কে তো যাবেনই না তবু বাধ্য হয়ে তাকেও এক এক দিন দু একটা কথা বলতে হয়।
ম্যাকডোনাল্ড বলে, “তোমরা তো লেখাপড়া শিখেছ, তোমরা তো খুবই বুদ্ধিমান, তবে ক্রিশ্চান হচ্ছ না কেন? তোমরা saved হবে কি করে?”
উনি বললেন, “আমরা সংখ্যালঘু দলে যেতে চাই না”
“অর্থাৎ?” “পৃথিবীর জনসংখ্যা কত জানো?”
“না। কত?”
“দুই হাজার মিলিয়ন—এর মধ্যে ক্রিশ্চান কত বল তো?”
“জানি না। কত?”
“হয়ত ছয় শ মিলিয়ন হবে। তবেই বল মেজরিটির সঙ্গেই থাকা ভালো নয় কি?”
ক্রমে ক্রমে দু’চার জন করে তোক আসতে শুরু করেছে, আমি আত্মীয়স্বজনকে ক্রমাগত ডাকি—কেউ না কেউ ছুটি হলে আসেন। এ তল্লাটে কেউ এলে আমার অনুরোধে পড়ে আসতেই হয় আমাদের বাড়ি। কাজেও অনেকে আসেন। অতিথিরা আমার বাড়িতে এসে খুশী হয়। যদিও বাজার আসে আঠার মাইল দূর থেকে তবু খাদ্যবস্তুর অভাব রাখি না। সুসজ্জিত বাড়িতে অতিথিদের জন্য সুখাদ্য তৈরী করে আমি তৃপ্তি পাই। তাদের বিছানা চীনাংশুকে ঢাকা, বালিশে ল্যাভেণ্ডার দিই—চেষ্টা করি একবার যারা আমার বাড়িতে থেকে গেছে তারা যেন কখনো না ভোলে। তারা ঘুম ভেঙে বিছানার পাশে শৌখীন পাত্রে চা পায়—দরজার কাছে পালিশ করা জুতো, স্নানের ঘরে ইস্ত্রি করা কাপড় পায়। প্রথম দুতিন দিন সবাই খুব খুশি, “কি আনন্দেই আছ তোমরা!” একেবারে ফার্স্টক্লাস হোটেলে! তারপর এক সপ্তাহের মধ্যেই নির্জনতার অবসাদ বুঝতে পারে সবাই—তখনই পালাই পালাই।
একবার স্যার বি. এল. মিত্র এসেছেন কাজেই আমাকে দেখে প্রৌঢ় ভদ্রলোক একেবারেই অবাক হয়ে গেছেন—“তুমি এখানে থাকো! এ যে দেখি অশোকবনে সীতা!” কিন্তু উপমাটা ঠিক নয়—আমায় কেউ বন্দী করে নি। এখানে কোনো রাবণ নেই।
সংসারের কাজে আমার কর্মশক্তি ফুরাতে চায় না, সাহেবদের কাছে শিখেছি মুরগী পালন—সেই সময়ে বিলাতী মুরগী পালার বিশেষ পদ্ধতি শুরু হয়েছে। শিখেছি মৌমাছি পুষতে। মৌমাছিদের জীবনবৃত্তান্ত পড়ে পড়ে মুখস্থ হয়ে গেল। কত রকম বিচিত্র পতঙ্গ আছে তারা মানুষের কাজে লাগে না, তবে তাদেরও নিজের জীবন মূল্যবান—আশ্চর্য এক একটার রূপ, বিচিত্র তাদের ব্যবহার—পাহাড়ের যেখানটা গভীর জঙ্গল সেখানটা সর্বদা ভিজে সঁাতাতে কারণ সেখানে রোদ পড়ে না। সেখানে গাছের ডালে শ্যাওলা হয় যাকে বলে ‘মস’ (moss) লম্বা লম্বা মস ঝুলতে থাকে ঠিক যেন গাছের শাখা তার এলোচুল ঝুলিয়ে দিয়েছে। এখানে কোনো কোনো গাছ আছে যাতে আলো জ্বলে—‘ফসফরাসেন্ট’। আমার বাবা আমায় বলেছিলেন খুঁজে দেখতে পুরাণে যাকে দিব্যৌষধি বলা হয় তা আছে কিনা। দীপ্যমান এই দিব্যৌষধি দেখেছি। জোনাকির মতো কোনো কোনো পোকা আছে যার পিঠে ও দুপাশে মিলিয়ে তিরিশটা আলো—দশটা করে প্রত্যেক লাইনে এক অভাবনীয় জীব। আর প্রজাপতি? বড় ছোট বিচিত্র রঙে রঙীন—কোনটা বা মথরংশূন্য বড় বড় ভয়ঙ্কর চোখ, ধূসর দেহ।
ফুলের বাগানে প্রজাপতিরা ওড়ে, তাদের সঙ্গে ঠিক তাদের মত রঙীন আর একজন উড়ে উড়ে ছুটে চলে তাদের ধরবে বলে, ‘পজ্জাতি’ ‘পজ্জাতি’—সে আমার কন্যা—১৯৩৬ সালে সে আমাদের ঘরে এসেছে। সে যেন ঐ গানটাকে রূপ দিচ্ছে—“কি সুখে ঐ ডানা দুটি মেলেছ জোনাকি ও জোনাকি–”
এখানে আমার সবচেয়ে বড় কাজ ক্ষেতে নেমে সজীর চাষ। ছ’সাত বছর তো আলুর চাষই করেছি সমনোযোগে বীজের কুড়িগুণ ফসল হত আমার, কৃতিত্বের গৌরবে আমি আনন্দিত। আমার এই অধঃপতনে কেউ হয়ত হাসতে পারেন কিন্তু অবিশ্বাস্য ঠেকলেও বলি যে কোনো কবিও অবশ্যই আলুর চাষ থেকে আনন্দ পেতে পারেন। একটা ছোট বীজ পোতা হয়েছিল মাটির ভিতরে সে কি করে বর্ধিত হচ্ছে কে জানে? আমরা গোড়ায় মাটি তুলে দিচ্ছি, জল দিচ্ছি কিন্তু যখন ফসল তোলবার সময় মাটি সরিয়ে দেখা যায় সেই ক্ষুদ্রবীজটি শুষ্ক হয়ে রয়েছে আর তার থেকেই প্রাণ পেয়ে বড় রসাল ফল ফলে তাকে ঘিরে আছে তখন কম আশ্চর্য লাগে না—একটু একটু করে মাটি সরান হয়, একটা একটা করে আলু গড়িয়ে পড়ে। আমি সারা দুপুর ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলু সংগ্রহ করি মালীর সঙ্গে। ঝুড়িতে আলু তূপ হয়ে ওঠে, আমার মন এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে যায়‘বড় বিস্ময় মানি হেরি তোমারে— মনে হয় আমি যেন ভ্যানগগ-এর মতো ছবি আঁকলাম পোটেটো-ইটার্স। কোথায় বিস্ময় নেই, কোথায় আনন্দ নেই! ঐ যে পোকাটা একেবারে ডালিয়া পাতার মত দেখতে, পাতার সঙ্গে মিশে আছে, যতক্ষণ না নড়ছে বুঝতেই পারবে না যে ওটা প্রাণী, পাতা নয়। একটু নাড়া লাগাতেই ও পাতার মতই নিশ্চল হয়ে যাবে আত্মরক্ষার চেষ্টায়, ওই কি কম বিস্ময়কর। দেখলে বিশ্বাস হয় না যে একটা পোকার শরীর একটা পাতার এমন নিখুঁত অনুকরণে তৈরী হতে পারে। যখন পোকাটা মরে যায় পাতার মত শুকিয়ে দেটে হয়ে যায়—nature’s mimicry—একবার জ্যোতিপ্রকাশ সরকার ওমনি একটা পোকা কাগজের বাক্সে করে নিয়ে আসছিলেন বোস ইনস্টিটুটে দেখাবেন বলে, পোকাটা যখন মরে গেল তখনও একটা পাতাই শুধু, শুকনো পাতা, আর যখন তাতে পিপড়ে লাগল তখনই বোঝা গেল ওটা একটা প্রাণী।
