গভীর রাত্রে আমরা স্বামী স্ত্রী নির্জন বনের ভিতর দিয়ে বাড়ি ফিরি। সামনে বেহারা লণ্ঠন ও লাঠি নিয়ে চলেছে। আমাদের পায়ের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই— নিঃশব্দ বনস্থলীতে দুধারে পাহাড়ে ধাক্কা লেগে সেই শব্দ মস্ মম্ করে নৈঃশব্দকেই প্রকাশ করছে—উপরে গাছের চন্দ্রাতপের ফাক দিয়ে জ্যোৎস্না গলে গলে পথের উপর আলোছায়ার চিত্রবিচিত্র করেছে। আমি জানি ঠিক কোন মোড়ে কি আছে—কোথায় জোনাকীদের রাজত্ব, কোথায় ফুলের গন্ধ পাব। একটা ফুল আছে ঠিক আতপ চালের গন্ধ। কেউ কেউ বলে কোনো সাপের গায়ে সুগন্ধি আতপের গন্ধ পাওয়া যায়। এখানে এত সাপ যে আমাদের আর সাপের ভয় নেই। ওরা মানুষ দেখলে বা শুনলে পালিয়ে যায়। কোবরাও পালিয়ে যায় কিন্তু অজগর পালায় না, পালাবে কি করে তার তো নড়তে চড়তে বছর কেটে যাবে। অবশ্য অজগরের ঘাড়ে না পড়লে কারু ভয় নেই—সে হাত বাড়িয়ে কাউকে ধরবে না। অথচ অজগর দেখেই সে লোকটা মরে গেল—গাছের তলায় কুণ্ডলীকৃত অজগরটা যেই মুখ তুলে চেয়েছে এই লোকটা তার চোখ দেখেই ছুটতে শুরু করেছে, অবশ্য বিপরীত দিকে, নৈলে সম্মোহিত হয়ে ওর আওতায় গিয়েই পড়বার কথা! অজগর হাত বাড়ায় না ঠিকই কিন্তু চোখ বাড়ায়, চোখ দিয়েই টেনে নেয়। লোকটা উপরের দিকে ছুটতে ছুটতে একেবারে দু মাইল দৌড়ে আমাদের বাড়ির কাছে এসে পড়ে গেল, পড়েই মরে গেল, শুধু ভয়েই মরে গেল। আমরা সচরাচর যে পথে চলাফেরা করি সেখানে ভাল্লুক বেরোয় না, ওদেরও তো প্রাণের ভয় আছে, কিন্তু বনের পথে পায়ে হেঁটে আঠার মাইল দূর থেকে যে লোকেরা শহর থেকে বাজার আনতে যায় তাদের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়। এক একদিন এক একটা কৌশল করে সবাই বাচে-একদিন তো খাবার ভর্তি পিঠের ঝুড়িটাকে ফেলে দিল, ঝুড়িটা ছিটকে পড়ে পাহাড় দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে, ভাল্লুক মানুষ ছেড়ে সেই চলমান বস্তুর পিছন পিছন দৌড়াল। রুটিওলা বেঁচে গেল। ওকে আমরা বলি রুটিওলা, কিন্তু শুধু রুটি নয়, যা কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস তা আঠার মাইল দূর থেকে আনে, মাছ, মাংস, ওষুধ, তরকারী কিছু এখানে পাওয়া যায় না। একটি জিনিস ভুলে গেলে তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। চিতা, ভাল্লুক আর অজগরের কাণ্ড মিলে এখানকার ঘটনাগুলো ছোটদের গল্পের বইয়ের গল্পের মতো। আমি যে জীবন থেকে এসেছি তার চেয়ে কতই না অন্য রকম। তবু ধীরে ধীরে আমি এদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছি। আদিম প্রকৃতি, আদিম মানব আমার অন্তরে প্রবেশ করছে ধীরে, খুব ধীরে। কারণ সাহেবরা যে রকম করে আনন্দ করতে পারে আমরা তো তা জানিই না। ওরা ছুটির দিনে পিঠে বন্দুক ঝুলিয়ে হাতে ছিপ নিয়ে, ভারবাহী ভৃত্যকুলের কাঁধে খাদ্য ও মদের বোঝা চাপিয়ে শিকারে চলল—সেখানে মদ্যপান হবে, শিকার হবে এবং ইনি ওর স্ত্রীর সঙ্গে কিংবা কোনো অতিথি বালিকার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করবেন। ওদের কোনো অভাব বোধ নেই—জঙ্গলেও বেশ আছে। ওরা। আমরা পড়য়া মানুষ আমরা এ সব পারি? আমাদের নিরীহ হরিণ মারা ভালো লাগে না। আহত হরিণের চিৎকার বা করুণ দৃষ্টি আমাদের কাদিয়ে ছাড়ে। তবুও ক্রমে ক্রমে ওদের কাছ থেকে আমরা শিখতে লাগলাম। ওদের কাছেও শেখবার আছে। যে অবস্থাতেই পড়ক ওরা মানিয়ে নিতে পারে। অনেকটা মাড়োয়ারীদের মতো—তারাও বেশ পারে প্রতিকূল অবস্থায় মানিয়ে নিতে। হিমালয়ের গায়ে ছোট ছোট এমন গ্রাম আছে যেখানে পঁচিশ ত্রিশ মাইল হয় পায় হেঁটে নয় ঘোড়ায় ছাড়া পোঁছবার পথই নেই—সেখানেও মাড়োয়ারীরা দোকানপত্তর খুলে চাল, ডাল বিক্রী করে—ওদের জন্যই এখানে আমরা চাল, ডাল, তেল, মশলা পাই।
মদ্যপান ও হরিণ শিকার এই দুটি জিনিস বাদ দিয়ে আমিও চেষ্টা করলাম অরণ্যজীবনের আনন্দে প্রবেশ করতে। প্রত্যেক ছুটির দিনে আমি যাকে যাকে পারি যোগাড় করে সদলবলে বের হই বনভোজনে। বনের পথ দিয়ে চলে যাই অনেক দূরে, হয় কোনো নির্জনতর ঝরনার ধারে, নয়ত কোনো পার্বত্য নদীর তীরে—এ বনের গাছগুলো একেবারে সোজা সোজা, এরা আলোর প্রত্যাশী, তাই যেন দীর্ঘগ্রীবা উত্তোলন করে পাহাড় পার হয়ে আকাশে মুখ রাখতে চায়। ওই গাছের ছায়াচ্ছন্ন মৃত্তিকা শেওলার ভেজাগন্ধে চারিদিক ভরে রাখে—ঘোড়ার পায়ের নিচে ঘাসফুল আর বন্য ফার্ন দলিত হয়ে যায়, আমি অন্যমনস্ক হয়ে লাগাম ধরে থাকি, বনের মধ্যে চলতে চলতে মন হঠাৎ উদাস হয়ে যায়—সেই গৃহবিবাগী রাজার কথা মনে পড়ে—একাকী হয়মারুহ্য জগাম গহনং বনং’ কোথায় কাদের সঙ্গে চলেছি আমি। এরা সব ছায়ামূর্তি—এই জীবনটা কি চেয়েছিলাম? হা ঈশ্বর কীটপতঙ্গও সঙ্গী পায়, আমাকে একজন সঙ্গী দিলে না? অবসাদ কেটে যায় যখন বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে হঠাৎ পার্বত্যনদীকে দেখতে পাই উপলশয়না কলনিনাদিনী জলধারা-স্রোতের মাঝে মাঝে পাথরে আটকে হ্রদ হয়ে থাকে সেখানে ঝাপিয়ে পড়ে আমরা স্নান করি। “তিতাপতি’ বলে এক রকম সুগন্ধ পাতা আছে—পাথরে থেঁতলে জলে ফেলে দিলে সে জল পান করে মাছগুলো মত্ত হয়ে ওঠে—তখন সেই মাছ ধরা হয়। পাথরের চুলো তৈরী করে কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বেলে মাছ ভাজা হয়। বড় বড় পাথর নদীর মাঝে মাঝেই আছে তার পাশ দিয়ে জল ঘুরে ঘুরে ফেনা তুলে তুলে সাদা হয়ে যায় সেই পাথরের উপর বসে আমার ‘সাগরিকা’ কবিতাটি পড়তে ইচ্ছে করে—‘বসিয়াছিলে উপল উপকূলে–’
“ম্যাকডোনাল্ড, জাভা বলে একটা দ্বীপ আছে জানো?”
