আমাদের বাড়িতে আমাদের ব্যক্তিত্বের ছাপ আছে, লোকে বুঝতে পারে এটা তামাদেরই বাড়ি। কাজ শিখছি ইংরেজ মহিলাদের কাছেও—দের’ নয়, এখানে চার ঘর ইংরেজ আছেন তাদের মধ্যে একজন মহিলাই ঠিকমতো সংসার করেন। অন্যেরা? তাঁদের কথা আর বলে কাজ নেই। টেনিস খেলা, ব্রীজ, মদ্যপান ও বলনৃত্য, মাঝে মাঝে ফ্লার্টেশন—এছাড়া অন্য কিছু তারা জানে না। পুরুষগুলো মূখ এবং বেহেড মাতাল। ওদের ভিতরেও হয়ত লুকিয়ে কোথায় মনুষ্যত্ব থাকতে পারে কিন্তু সে দেখবার আমার চোখ নেই, মন নেই। মন বেশি সূক্ষ্ম হয়ে গেছে—এদের সংস্পর্শে সংকুচিত হয়ে যায়। আমি জানি এটা একটা ক্রটি।
এই ত্রুটিটি অবশ্য ওদের চোখে পড়ে অন্যভাবে—ওরা ইংরেজ, আমরা তুচ্ছ নেটিভ, ওরা যে দয়া করে আমাদের সঙ্গে মিশতে চায়, আমাদের বলড্যান্স করতে ডাকে, আমাদের বাড়িতে আসে তাতেই তো কৃতার্থ হওয়া উচিত—তা নয় সব কিছুতে আপত্তি! তাস খেললে কি চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে? তাস খেললে চরিত্র নষ্ট হয় না ঠিকই কিন্তু সময় নষ্ট হয়। একে তো মনের মত কাউকে পাই না, কারু সঙ্গে চিন্তার আদানপ্রদান হয় না। মনের যে-স্তরে আমার সঙ্গী দরকার সেখানটা দিগন্তহীন সাহারা হয়ে আছে, তার উপর যদি এদের সঙ্গে বেশি মিশি তাহলে আমার ব্যক্তিত্ব বদলে যাবে—সেই অল্পবয়সেই আমার একথা মনে হত। কারণ ওদের প্রাণােচ্ছ্বলতা দেখলে লোভ হয়, একেবারেই যে তা মনকে টানে না তা নয়। কিন্তু এ লোভ সংবরণ করতে হবে। আমি জানি সব দিক থেকে এক অসীম শূন্যতা আমায় ছেয়ে আছে, তাই আমি যদি খুব শক্ত হাতে নিজের হাল ধরে না থাকি আমিও বিভ্রান্ত হতে পারি। আমি জানি আমার স্বামী এমন মানুষ ওঁর কেউ ক্ষতি করতে পারবে না কিন্তু আমার হতে পারে, আমার মধ্যে নানারকম দুর্বলতা। আমি তাই নিজের মধ্যে পুলিশ বসিয়ে রেখেছি এতটুকু যেন নড়চড় না হয়, সেই রাধার গানটার মতো, ‘পাহারা রেখেছে, আমি পাছে পা হারাই বলে পাহারা রেখেছে!
মদ্যপান নিয়ে একটা বিরোধ ঘনিয়ে উঠেছে। কিন্তু এটাতে হার মানব না কারণ ঐ যা বললাম, ‘সংসর্গজা দোষগুণাঃ ভবন্তি’—এদের সঙ্গে থাকলে মনটাও শেষ পর্যন্ত ঐ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। আমার জীবনের তার যে সুরে বেঁধেছি তা নেমে যাবে।
আজকাল হয়ত লোকে এটাকে গোড়ামী মনে করবে, তখনও করত কিন্তু সত্যি বলতে কি মদ্যপানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাদের বেশ শক্তিক্ষয় হতে লাগল—আমি যদি এত জোর না করতাম তাহলে আমার স্বামী হয়ত নিজে না খেলেও ওদের জন্য ব্যবস্থা করতেনবস্তুত করেও ছিলেন অর্থাৎ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, আমি তা হতে দিলাম না। একে আমরা বিলিতি জিনিস ছুঁই না। আমার বিয়েতে একটিও বিলিতি জিনিস কেনা হয় নি, কলম পর্যন্ত গুপ্তর ফাউনন্টেন পেন—“আর এদের বিলাতি মদ্য খাওয়াতে হবে?”
“ওরা তা না হলে আমাদের কৃপণ ভাববে।”
“কেন, সন্দেশ খাওয়াব?”
“সন্দেশ ওরা সন্ধ্যেবেলা খাবেই না” উনি হাসছেন, “তোমার যা ইচ্ছা কর, এটা তোমার সংসার তোমার দিতে ইচ্ছা দেবে না হয় দেবে না।”
আমার ইচ্ছা এবং মত দৃঢ় কিন্তু সেদিন আমি জানতাম না যে আমি ছোটখাট একটি যুদ্ধে নামলাম কারণ আমি ইংরেজদের বিরূপ করে দিলাম। আমি জানতাম না সময়মতো ওরা এর প্রতিশোধ নেবে। এ যুগে কি অবস্থা জানি না, তখন দেখতাম যারা মদ্যপান করে তারা যারা করে না তাদের উপর খুব রেগে যায়–কারণ তাদের মনে হয় এটা বুঝি তাদের চরিত্রের উপর কটাক্ষপাত করা! এ মনোভাব অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। যে যাই, করুক অন্যের সমর্থনের লোভ ছাড়তে পারে না!
আমি বেয়ারাকে বললাম, “সবগুলো বোতল নিয়ে ঝরনার জলে ফেলে দাও–” সে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে আছে—ঝরনার জলে উৎক্ষিপ্ত হবে এই ঝকঝকে বোতলের বিলাতি মদ্য! গুর্খাদের স্ত্রীপুরুষের এই বস্তুটির তৃষ্ণা তৃপ্ত করবার সাধ্য কারু নেই। পরের দিন সকালবেলা কুলীকামিনরা ঘাস কাটতে এসে বোতলগুলো পেল—সব ভাঙ্গে নি কিছু কিছু মাটিতে বসে গেছে—তখনকার দিনে গুর্খাদের সততা এতখানি ছিল যে ফেলে দেওয়া জিনিসও কেউ না বলে নেবে না। মাসের পর মাস ঘর খুলে রেখে যাও, ভেজান দরজা ঠেলে ঢুকে কেউ তোমার ঘড়িটা নিয়ে যাবে না। আমার দুঃখ এই যে এই মানুষদের দেখবার চোখ তৈরী হতে আমার দেরি হল। আমার চোখ অন্তর্মুখী ছিল। সেই গানের উল্টোটা ‘বাহির পানে চোখ মেলেছি আমার হৃদয় পানে চাই নি আমি চাই নি। এক্ষেত্রে বাইরেই দ্রষ্টব্য ছিল। বেয়ারা বলল, “ওগুলো তো আপনি ফেলেই দিয়েছেন, ওরা নেবে?” ওরা নিল। তারপর সেই বিশুদ্ধ স্কচ হুইস্কি উদকমিশ্রিত না হয়ে বোতলের পর বোতল উদরে পড়ার ফল যা হল তা বোঝা শক্ত নয়—স্ট্রেচারে করে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল—এবং আমার কীর্তিও রটে গেল সাহেবকুলে। আজকের দিনে এই মনোভাব দুর্বোধ্য ঠেকবে যখন মদ্যের চেয়ে বহু বেশিগুণে প্রমত্তকারী বস্তুর আমদানী হয়েছে এবং গুণী সমাজে সমাদৃত হয়েছে।
এদের ডিনার পার্টিতে দূর দূর পাহাড় থেকে প্ল্যানটার সাহেবরা আসত-দেখতুম আস্তে আস্তে যত রাত গভীর হচ্ছে গেলাসের পর গেলাস মদ্যপান করে এরা তুরীয় হয়ে যাচ্ছে—যে গাইতে পারে না সে হঠাৎ হেঁড়ে গলায় গান জুড়ে দিল, কেউ বা ঢুলতে লাগল—কেউ যেখানে কোনো স্ত্রীলোক বসেছে তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ল, কেউ বা ফট করে আমার পায়ের কাছে বসে কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, “I shall be your dear”—deer শব্দটার উপর pun হচ্ছে কারণ আমি একটা হরিণ পুষেছিলাম। আমি কিছুতেই বুঝতে পারতাম না মানুষ কি করে স্বেচ্ছায় বুদ্ধি হারায়। সুসজ্জিত ঘরে বসে চৰ্যচোষ্যলেহ্যপেয়ে আকণ্ঠ ভরে বয়স্ক লোকেরা ইচ্ছে করে পাগল হয়ে যাচ্ছে এই দেখে দেখে আমার মনের অবস্থা দুষ্মন্তের রাজপুরীতে সুখী লোকদের দেখে শারদ্বতের মতো হত, ‘স্নাত ব্যক্তির যেমন তৈলাক্তকে, শুচির যেমন অশুচিকে, জাগরিত ব্যক্তির যেমন প্রসুপ্তকে, মুক্ত ব্যক্তির যেমন বদ্ধকে দেখলে মনে হয়—তেমনি হয়েছিল শারদ্বতের অবস্থা।
