* * *
২.৩ দিনগুলি গড়িয়ে চলে
দিনগুলি গড়িয়ে চলে সকাল থেকে সন্ধ্যা একই নিয়মে—এক এক দিন ভাবি হঠাৎ যেভাবে আমার বিয়ে হল এটা উভয়ের প্রতিই অন্যায় করা হয়েছে। এ কথা যখন আমার মনে হয়, তখন আমি লজ্জা পাই—প্রশ্ন করি এটা আমার স্বামীর সম্বন্ধে বিরুদ্ধভাব নয় তো? কিন্তু তা নয়, ওর মহত্ব সত্ত্বেও এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আমরা সম্পূর্ণ দুই জাতের মানুষ। এই জাতিভেদটা আমার স্বামীকে কোনো পীড়া দেয় কিনা আমি জানি, কারণ ওর তো কোনো ভাবেরই অভিব্যক্তি নেই, তা যদি থাকত তবে জাতিভেদের প্রশ্নই উঠত না। উনি আমাকে যে কতটা ভালোবাসেন তার পরিচয় আমি পাই, শুধু আমি কেন যে যেখানে আছে সকলেই জানে—আমি যদি পনের দিন কলকাতায় থাকি ওর জ্বর হয়ে যায়। আমিও বেশিদিন থাকি না, আমার মন কেমন করে, ওর জন্য চিন্তা হয়। ‘তবু’—তবু ঐ পাহাড়ের দিনগুলোর শূন্যতা আমায় চেপে ধরে। আমি যে কথা বলতে পারি না। আমার কথা বলার বড় প্রয়োজন। আমি মাঝে মাঝে নিজেক প্রশ্ন করি আমি যে জাতিভেদের কথা ভাবছি এর কি অন্য রকম কোনো উপায় ছিল? আমার যদি ফট করে চারদিনের মধ্যে এর সঙ্গে বিয়ে না হয়ে ঐ বাঙালী জাতির উন্নতিপ্রয়াসী ডাক্তারটির সঙ্গে বিয়ে হত, তাহলে কি হত? তার সঙ্গে কি জাত মিলত? সে তো সাংঘাতিক—যে মানুষ চেনে না, মানুষের মুখ দেখে না, মন, দেখে না, খালি শরীরের উচ্চতা দেখে! কাজেই ঠিকমতো জোড় কখনই মেলে না। তা নিয়ে আক্ষেপ করে কোন লাভ নেই। ‘তবু। তবু আমাকে ছাড়তে চায় না। যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করে কি তুমি পাও নি, স্বামীর ভালোবাসা, শ্বশুরবাড়িতে সম্মান, স্বাধীনতা? কোনটা পাওনি? আমায় মানতে হবে যে অভিযোগ করবার মত কিছু নেই। যদি আমি বলি, আর কিছুই নয়, গত মাসের প্রবাসীতে রবীন্দ্রনাথের যে কবিতাটা বের হয়েছে সেটা এক মাসের মধ্যে কারুর সঙ্গে পড়তে বা আলোচনা করতে পারলাম না, তাহলে কি কেউ আমার জন্য শোক করতে বসবে? তা কি হয়? হাসবে লোকে কিন্তু অনেক লোকেরই যা প্রয়োজন নেই আমার তা আছে। কোনো কোনো মানুষ আছে যাদের অঞ্জলি পূর্ণ হয় না কোনো পার্থিব বস্তুতে। যাদের আকাঙক্ষা ফুরাতে চায় না। যারা এই জগতে কোনো সূক্ষ্ম অনির্দিষ্ট জিনিস খুঁজে বেড়াচ্ছে যার কোনো বাস্তব মূল্য নেই।
আমাদের মনটাকে এমন করে তৈরী করল কে? কোনো কোনো লোকের যে অনেকের সঙ্গে জাতিভেদ হয়ে গেল এর জন্য দায়ী কে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আবার কে? আমরা যারা তার গানের ভিতর দিয়ে জগৎটাকে দেখছি আর যারা তা দেখে নি এদের জগৎ পৃথক হয়ে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই দুই জগতের চলার ছন্দ মেলে না।
আমি যদিও পাহাড়ে বাস করছি আমার জীবনের স্রোত পাহাড়ী নদীর মতোবেগবতী নয়—–উপলে লেগে তা উঞ্ছিত হচ্ছে না, তা একেবারে নিস্তরঙ্গ পুকুরের জল হয়ে যাচ্ছে। বহির্জগতের সঙ্গে যোগ নেই, সংসারের তরীটা ভাসিয়ে দিয়ে বসে আছি—এ, ঘোর এ। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় তিনি যে কথা দিয়েছিলেন আসবেন—সে কথা রাখবেন তো?
সংসারটাকে আমি খুব ভালোবেসেছি। আমি ঘরবাড়ি সাজাতে ভালোবাসি—আমার মায়ের বাড়ির এলোমেলো কখনো ঠিক করে উঠতে পারতাম না—এই নিয়ে অষ্টপ্রহর খিটিমিটি লেগে থাকত—কেউ পর্দায় হাত মুছে ফেলল, দেওয়ালে আঁক কেটে বসল—কাগজ ছড়িয়ে ফেলল উপর থেকে উঠোনে। সোফার কাপড় পরিষ্কার করেছি, বাবার কোনো টুলো পণ্ডিত ভক্ত এসে তার উপর উবু হয়ে বসে পায়ের দাগ লাগিয়ে গেল, আবার কালই হয়ত ইয়োরোপের কোনো নামী ব্যক্তি আসবেন। এই নিয়ে আমি খেটে খেটে হয়রান হতাম। এখানে আমি অবাধ সুযোগ পাচ্ছি। আমার বাড়ি ঝকঝকে একটা গয়নার মতো। কাঠের মেঝে সপ্তাহে একদিন ঘষে ঘষে সুগন্ধি মোম দিয়ে পালিশ করা হয়। এত পালিশ হয় যে মেঝেতে মুখ দেখা যায়। কাচের জানালার কাচ মেথিলেটেড স্পিরিট দিয়ে চকচকে করে মোছা হয়। ফুলদানী ও কিউরিও তো বটেই, দরজার কজা ও হাতল ব্রাসো দিয়ে ঝকঝকে করা হয়। মাসে একবার বারান্দায় ফুলের টবগুলো রং করি। আমার রান্নাঘরে বাসনগুলো সোজা করে রাখা, কলঙ্কশূন্য। সবগুলি আলমারীর ভিতরে প্রত্যেকটি তাকে জিনিস স্বস্থানে থাকে। আমার কুড়ি বিঘা বাগানের গাছপালা ছিমছাম যত্নে ঘঁটা। খাবার টেবিলে কাটাচামচ ঝকঝক করে, ন্যাপকিন একেক দিন এক এক রকম করে ভাজ করা থাকে—মাখনদানিতে মাখনের ফুল কাটা। দুপুরে আমরা পাথরের থালায় খাই, রাত্রে ডিনারসেট ব্যবহার হয়।
ভোরবেলা বেয়ারা এসে দরজায় টোকা দেয়—তার মাথায় পাগড়ি বাধা, পরনে চাপকান সাদা ধপধপ করছে, ট্রেতে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে এসেছে—বেড়টি। কফি পারকুলেটারে সকাল বেলাতেই কফি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার সুগন্ধ সারা বাড়িতে ছড়িয়ে আছে—মালি ফুলের তূপ নিয়ে এসেছে, কোনোদিন বা আমিই মালির সঙ্গে কঁচি নিয়ে বেরিয়েছি, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি ও ফুল কাটছে। জাপানী ফুল সাজান আজকাল খুব দেখছি। আমার তত ভাল লাগে না, ওটা কৃত্রিম একটা খেলনার মতো। আর বাঙালীরা তো ফুল সাজাতে জানেই না। বৌবাজারে যে তোড়াগুলো বিক্রি হয় তা দেখেই বোঝা যায়। দেবদারুপাতা দিয়ে আষ্ঠেপৃষ্ঠে চেপে ধরে তার দিয়ে বাধা। ফুলের প্রাণ কতক্ষণ এ অত্যাচারে বাঁচে? তা না হলে একটা টিকটিকে ফুলদানিতে দুটো চারটে করে খুঁজে দেওয়া। আমি এখানে ইংরেজ এক মহিলার ফুল সাজান দেখে চমৎকৃত। ঘরের কোণে একটা ফুলসুদ্ধ ডালই বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফুল রাখবার পাত্রগুলোও এমন হওয়া চাই যাতে ফুল পাতা ছড়িয়ে পড়ে। আমি দেখে দেখে শিখি, যা দেখেছি ঠাকুরবাড়িতে। ঠাকুরবাড়ির আসবাবেই দেখেছি স্বদেশী নকশা। এখানে নানারঙের কাঠ পাওয়া যায়, আমরা তাই দিয়ে নানা স্বদেশী নক্শার আসবাব বানাই, আমাদের পর্দা ও কুশন কিছুই বিলাতী ছিটের নয়—উড়িষ্যার গ্রাম থেকে উড়িয়া পুরোহিতেরা যে ধুতি পরে তার আঁচলটাই পুরো থান বুনিয়েছি। এ সময়ে দেশী নক্শার কোনো জিনিসই বাজারে সুলভ ছিল না। নানা প্রদেশের গ্রামের লোকদের কাছে লোকশিল্পের নমুনা পাওয়া যেত। তাতিকে যখন বললাম, এই আঁচলটাই দুটো থান বুনে দাও—তার চক্ষুস্থির। কিছুতে রাজি নয়। “তোমার ক্ষতি কি হবে? টাকা তো পাবে?” “এ রকম তো কখনো করি নি মা।” এ দেশের মানুষের বিপদ ঐ, যা কখনো করে নি তা করবে না—তা সে তাতিই হোক কি পণ্ডিতই হোক। ছোট ছোট অচলায়তন বসে আছে পদে পদে মন জুড়ে।
