এই কবিতার তত্ত্ববাণী গীতারই কথা—দুঃখে অনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখে বিগত স্পৃহঃ—সুখেদুঃখে অবিচলিত অনাসক্ত এবং নিরহঙ্কার এ সবগুলি গুণই আমার স্বামীর পূর্ণমাত্রায় আছে—এগুলো তাকে সাধনা করে উপার্জন করতে হয় নি। এ তাঁর স্বাভাবিক বিধিদত্ত গুণ। আমি তো উপার্জন করতে চেষ্টা করি, কিছুই পারি না। আমি উদ্বিগ্ন অসহিষ্ণু ও নানাবিধ দোষের আকর—জল যেমন মাছের আকর আমিও তেমনি দোষের আকর, আমার মধ্যে দোষগুলো কিলবিল করছে। সম্ভবত সেই জন্যই প্রায় সর্বদাই আমার মনের মধ্যে হু হু করে—এই যেমন একদিন সন্ধ্যেবেলা আমি বসে বসে ভাবছিলাম অর্থাৎ গুনছিলাম আমি সারা দিনে ক’টা কথা বলেছি—গুনে দেখলাম সাত-আটটার বেশি হবে না—সেগুলো এই রকম—আজ আধঘণ্টা দেরী কেন? বিকালে কি টেনিস আছে? পরশু কি অসবোর্নরা খেতে আসবে? সামশের বেয়ারা কি একা পারবে? আর কি কথা হবে? আমরা যে দুই জগতের মানুষ—উনি যা পড়েছেন আমি তা পড়ি নিতা নাই বা হল—আমি না হয় কেমিস্ট্রিই পড়তুম—যদি উনি পড়াতেন, আমার তাতে আপত্তি নেই—যে কোনো জ্ঞানের বিষয় থেকে আমি আনন্দ পেতে পারি কিন্তু উনি তা পারবেন না। অত কথা বলা ওর কর্ম নয়। আর আমি যা পড়েছি তা উনি পড়েন নি, পাঠ্যপুস্তক ছাড়া কোনো ভাষায় এক লাইন কবিতা উনি পড়েন নি। তা আমি তো ওকে শোনাতে পারি? তা কি হয়? কবিতা যে বোঝে না তাকে শোনান যায় না। যদিও আমি শোনালে উনি খুব সহিষ্ণুভাবে শুনবেন, কখনই সেই ভদ্রলোকের মতো করবেন না যার কথা আমি আমার এক আত্মীয়ার কাছে শুনেছিলাম। আমার কবিতারসিকা আত্মীয়া নববিবাহের পর স্বামীকে একটি ‘মহুয়া’র কবিতা শোনাবেন বলে বেশ গুছিয়ে বসেছেন। স্বামীও খুব উৎসাহ দেখিয়েছেন, কবিতাটি পড়তে শুরু করবার আগে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন—একটু দেখি’, বইটা হাতে নিয়ে একটু দেখে ফেরৎ দিলেন। মেয়েটি অবাক হয়ে গেছে—“কি ‘দেখলে?”
“দেখলুম কবিতাটি কত বড়। আমার স্বামী এরকম কখনো করবেন না। আমি যদি টালি এডিশনের সমগ্র রচনাবলী তাঁকে শোনাই তিনি পরম ধৈর্যে শুনে যাবেন, বললেন, “খুবই তো ভালো।”
এক একদিন তা নয়, প্রায় প্রত্যেকদিনই নির্জনতা আমাকে চেপে ধরে। দুপুরবেলা আমি ঘুমোই না, পড়ব কি? এ তল্লাটে বই নেই। যে ক’খানা বই আছে বহুবার করে পড়া হয়ে গেছে। বই এত কিনবই বা কি করে? কেই বা বই পাঠাচ্ছে আমায়? তবু যখনই কলকাতায় যাই কিছু বই সংগ্রহ করে আনি। আমার স্বামী যে কথা বলতে একেবারেই ভালোবাসেন না তবুও তাঁরও এই নির্জনতা কষ্টকর বোধ হয়। একবার আমায় লিখেছিলেন, “দিন পনের আয়নায় ছাড়া আর কোন শিক্ষিত মানুষ দেখি নি।”
সন্ধ্যেবেলাটা যেন আরো নির্জন। বারান্দায় আমি আর আমার স্বামী বসে থাকি—আমি দু’চারটে কথা বলবার চেষ্টা করি। কিন্তু কোন ভাষায় কথা বলব? আমাদের ভাষাই যে পৃথক। তাই একটু পরেই দু’জনেই চুপ। এই মানবহীন দেশে শব্দগুলি যেন নির্জনতাকে আরো বাড়িয়ে তোলে—অন্ধকার বন থেকে একটা রাত-কো-চরা ডেকে ওঠে, একটা বাদুড় ঝুপ করে পড়ে যায়। ঝিঝি পোকা ডাকতে থাকে অবিশ্রান্ত ঝি ঝি ঝি—পাশের ঝরনাটাও তো থামে না, ঝর ঝর ঝর ঝর চলেইছে চলেইছে—এ শব্দগুলো মানুষের সঙ্গী নয়—এরা কেবল বলতে থাকে, তুমি একলা, তুমি একলা–আমি বুঝতে পারি, প্রত্যেকদিন বুঝতে পারি আমার জগৎটা হারিয়ে গেল। আমার লিখতেও আর ভালো লাগে নাকি লিখব? লেখা আমার এই জনহীন জগতে দিকভ্রান্ত হয়েছে। অনেকে মনে করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বোধ হয় লেখকের প্রেরণা জোগায়—ফুলের বাগানে বসে কবিতা লিখলে কবিতার গুণ বেড়ে ওঠে। যে জন্য শুনি শান্তিনিকেতনে আজকাল গাইডরা দেখায়, “ঐ গাছের নীচে বসে কবি ‘রক্তকরবী’ লিখেছিলেন, ঐ কুঞ্জের পাশে বসে ‘মহুয়া’ ইত্যাদি…মূঢ়তার যেন শেষ নেই। শান্তিনিকেতনের এই নির্জন প্রান্তরে বিশ্বের লোককে ডাক দিয়ে আনলেন কবি লেখারই প্রয়োজনে।
মানুষের সঙ্গে সংস্পর্শে সুখদুঃখের ঘাতপ্রতিঘাতে ভালোমন্দের দ্বন্দ্বে নিত্য মথিত হওয়াই লেখকের প্রেরণার উৎস। নিস্তরঙ্গ শান্ত অবস্থা, জনবিরল অরণ্য সাধুসন্ন্যাসীদের দরকার থাকতে পারে, আমার নয়। এই প্রকৃতি আমায় জীবন দিচ্ছে না বরং হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মানুষকে দরকার। অন্তত আমার দরকার। মির্চার বদলে একটা পুষ্পিত তরু হলে কি ভালো হত? হাঃ হাঃ হাঃ একটা কথা মনে পড়ে গেল—“প্রথম কাকে ভালোবেসেছিলে, বল বল”-“একটা গাছকে গো একটা গাছকে”—এখন থাক গাছে ঝুলে!
আমার বাইশ বছর অরণ্যবাসের তিনটি বছর স্মরণীয়—ঐ তিন বছরই আমরা বেঁচেছিলাম। বাকি দিনগুলি খালি পুনরাবৃত্তি। যখন আমার জীবনের সেই সুন্দরতম পর্ব শুরু হতে চলেছে যতদূর মনে পড়ে সেই সময়ে অর্থাৎ ১৯৩৮ সালে অল্পদিনের জন্য কলকাতায় এসেছি। বাবা আমাকে বললেন, “ইউক্লিড তোমাকে একটা বই উৎসর্গ করেছে, উৎসর্গপত্রে তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে।” কথাটা শোনবার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না—হৃৎপিণ্ড লাফাতে লাগল, বাধাই মানে না—আমি প্রস্তরীভূত দাঁড়িয়েই রইলাম, কিছু বললাম না। কয়েক মিনিট পর তিনি আবার বললেন, “পর্নগ্রাফি লেখার জন্য তার জেল হয়েছে।”পর্নগ্রাফি কথাটার অর্থ আমি জানতাম না। বাবাকে জিজ্ঞাসা করবার ইচ্ছা ছিল না। যা লিখলে জেল হয় তা নিশ্চয় কোনো সৎসাহিত্য নয়। আমি কোনো উত্তর না দিয়ে প্রশ্নও না করে চলে গেলাম। ডিকশনারিতে ঐ শব্দটা দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। একি বিশ্রী ব্যাপার! আমাকে যে বইটা উৎসর্গ করেছে সেটাই ওরকম না তো! আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না আমাকে বই উৎসর্গ করবারই বা দরকার কি, ক্ষমা চাওয়ারই বা প্রয়োজন কি! বইটা সম্বন্ধে আমার কোনো কৌতূহল হল না। শুধু ঘৃণায় আমার মন সঙ্কুচিত হয়ে গেল, অপবিত্র বোধ হতে লাগল এবং এই রকম একজন লোকের সঙ্গে আমার এক দিন ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল এবং এর জন্য আমি এত আগ্রহী ছিলাম ভাবতেই আমি শিউরে উঠলাম। আমার এতই খারাপ লেগেছিল যে আমি ঐ বইটার কথা ভুলে গেলাম, অর্থাৎ মনেই আনতে চাইলাম না, তারপর থেকে প্রায় পনের বছর ওর নামটাও আমার মনে পড়ে নি। ঘৃণার একটা প্রকাণ্ড পাথর দিয়ে স্মৃতির সেই আলোকিত গুহাটার মুখ আমি নিচ্ছিদ্র বন্ধ করে দিলাম…করে দিলাম’ বলা ভুল হবে—এটা হয়ে গেল।
