আমি মনে মনে ভাবছি, বাপ্ রে, এই মেয়ের মনে জোর আছে। “তারও পর আছে নাকি?”
“আছে। সেই ছেলেটি সেই রাত্রেই ঐ মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছিল, সে যেন কেমন হয়ে গেল—উদভ্রান্ত-মাঝে মাঝে ওদের বাড়ি যেত।” তারপর একদিন সে মরে গেল। তার ঘরে স্টোভে আগুন জ্বলছিল, খাট থেকে গড়িয়ে পড়ে আগুন লেগে গেল। পুড়ে মরল বেচারা। কেউ কেউ বলে আত্মহত্যা করেছিল।
“নিশ্চয়ই আত্মহত্যা।”
কী ভীষণ ব্যাপার, বঞ্চিত প্রেমের এই পরিণামে সৌন্দর্য তো নেই…সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্—শিবও নেই সুন্দরও নেই—সৌন্দর্য ছাড়া সত্যের রূপ ভয়ঙ্কর–প্রেমের মধ্যে যদি সৌন্দর্য ফুরিয়ে যায় তাহলে রইল কি? আমি মানসচক্ষে একটা দগ্ধ লোককে দেখতে পেলাম—তার গায়ের মাংস দগদগে, তার চুল পুড়ে গেছে, তার মুখ ঝলসে গেছে—সে গোঙাচ্ছে! কী ভয়ানক! আমাকে ভালোবেসে যদি কারু এই পরিণাম হয় তাহলে আমিও বাঁচতে পারব না। আমার ভয় করতে লাগল, এর বন্ধু যদি এই রকম তবে ইনিও এই। আর কোনো কথা বলে কাজ নেই, ওর মনে এতটুকু দুঃখ দিতে পারব না। মির্চা যদি এই মুহূর্তে এসে বলে ‘চল’ আমি কি যেতে পারি? কখনো না, আর হয় না। এই ভদ্র মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে কোনো স্বর্গ থেকে আমি সুখ পেড়ে আনতে পারব না। আমার এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে, আমি জানি সুখ বাহিরের কোনো অবস্থায় বা বস্তুতে নেই—অন্তরে তার আয়োজন সুসম্পূর্ণ থাকলে তবেই বাহিরের স্পর্শে তা উচ্ছ্বসিত হতে পারে। বিবেকের দহনে অন্তর যদি ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে, নিন্দায় কুবাক্যে ইতর জনের রসনায় যদি তা লেহ্যমান হয় তাহলে মির্চাকে জড়িয়ে ধরলেই কি আমি সুখ পাব? শরীর সুখ দিতে পারে না, সুখ দেয় মন, আমার মন অন্যকে দুঃখ দিয়ে সুখী হতে পারবে না, এটুকু আমি জানি।
অন্যকে দুঃখ দিয়ে সুখী হওয়া যায় না, অন্যকে বঞ্চিত করে সুখী হওয়া যায় না—এগুলো সোজা কথা, বার বার শুনেছি। আমি তো আবিষ্কার করি নি, সবাই জানে। জানে কি? তাহলে রমা এই মুহূর্তে আমার মাকে কেন তুষানলে দগ্ধ করছে। যাক, যার যা ইচ্ছে করুক। আমি এই নির্বিরোধী ভালোমানুষকে কখনো দুঃখ দেব না। এটা কি শুধু কর্তব্য? কখনই নয়, আমি তো এঁকে ভালোবাসছি, খুবই ভালোবাসছি। সেদিন সেটা বুঝতে পারলাম যেদিন রাত আটটা নাগাদ বেহারা বলল, “সাহেব যেখানে গেছেন সেখান থেকে আসতে পথ হারিয়ে ফেলতেও পারেন। সাহেব যদি ঘোড়ায় যেতেন পথ হারাতেন না, ঘোড়া ঠিক বাড়ি এনে হাজির করত। কিন্তু…” অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ছে-নিচ্ছিদ্র অন্ধকার রাত্রি, কোনোখানে জনমানবের চিহ্ন নেই—ওরা বলাবলি করছিল ঐ রাস্তায় ভাল্লুক বেরোয়। আমি এত অস্থির হয়ে পড়েছিলাম যে ওরা যদি না যেত আমি নিজেই ম্যাকিন্টস চাপিয়ে, গামবুট পরে লণ্ঠন নিয়ে বেরুতাম—তা বাঘই থাক আর ভাল্লুকই থাক, এটা কি ভালোবাসা নয়? তবে, তবে আবার কি? কিছু তবে আছে নাকি? আছে আছে আছে—এই সাজানো সংসারের মধ্যে বসে আমার স্বামীর সস্নেহ ভালোবাসার আশ্রয়ে থেকেও আমার মন কেন এত শূন্যতায় ভরে থাকে কে বলবে? ‘শূন্য হাতে ফিরি হেনাথ-পথে পথে…।
আমাদের বিবাহিত জীবন মসৃণ পথে চলেছে, আত্মীয়স্বজন যাই বলুক, বন্ধুবান্ধবরা যা-ই ইঙ্গিত করুক, আমরা বেশ আছি। আমার স্বামীর সঙ্গে সবচেয়ে যে বিষয়ে আমার সঙ্গে মিলেছে তা হচ্ছে তারও কোনো সংস্কার নেই। তিনি কোনো আচারে বদ্ধ নন, তিনিও জাতিভেদ মানেন না, সামাজিক ব্যবস্থাগুলি যুক্তি দিয়ে বোঝেন। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম যেদিন শুনলাম যে তিনি প্রথম যে দিন মাংস খেলেন সেটা ছিল গোমাংস। আমিও চমকে উঠেছি। ইনি মাংস খেতেন না, প্রথম যে দিন পাহাড়ে এসে পৌঁছেছেন এক সাহেবের বাড়ি সেদিন খাবার ব্যবস্থা হয়েছে, তার মেম আবার দারুণ কৃপণ। অতিথি নিমন্ত্রণ করে একখানাই মাছভাজা রেখে বলে, একখানা মাছ খেতেই হবে। সেদিন সে মাছভাজা রাখে নি রেখেছিল বীফস্টেক।
“তুমি খেলে কেন?”
“আর তো কিছু ছিল না, ওরা অপ্রস্তুত হবে, মাংস যদি খেতেই হয় তো ছাগলই বা কি গরুই বা কি, বরং গরুই ভালো, একটা প্রাণী হত্যা করে অনেকটা মাংস পাওয়া যায়, হাতি আরো ভালো।”
অকাট্য যুক্তি। সেযুগে মধ্যবিত্ত ঘরের হিন্দু সন্তানের পক্ষে এটা কঠিন কাজ। কিন্তু এটা কোনো কঠিন কাজ করার মত করে করা নয়—উনি কোনো বিপ্লবী নন, আমি যে রকম জাতিভেদ ভাঙবার জন্য উদ্যত সে রকমও নয়—খুব সহজ স্বাভাবিকভাবে সত্যকে পাওয়া।
পরে যখন রবীন্দ্রনাথ, একে ভালোমতো চিনলেন তখন বলেছিলেন, “গল্পস্বল্পের ভালোমানুষ কবিতাটিতে এরই পরিচয় রেখে দিয়েছি–”
মনিরাম সত্যই স্যায়না
বাহিরের ধাক্কা সে নেয় না।
বেশি করে আপনারে দেখাতে
চায় যেন কোনোমতে ঠেকাতে–
যোগ্যতা থাকে যদি থাক না
ঢাকে তার চাপ দিয়ে ঢাকনা
আপনারে ঠেলে রেখে কোণেতে
তবে সে আরাম পায় মনেতে।
যেথা তারে নিতে চায় আগিয়ে
দূরে থাকে সে সভায় না গিয়ে
বলে না সে আরো দে বা খুবই দে
ঠেলা নাহি মারে পেলে সুবিধে।
যদি দেখে টানাটানি খাবারে
বলে কি যে পেট ভার বাবারে।
ব্যঞ্জনে মুন নেই খাবে তা
মুখ দেখে বোঝা নাহি যাবে তা।
যদি শোনে যা তা বলে লোকেরা
বলে, আহা ওরা ছেলে ছোকরা।
পাঁচু বই নিয়ে গেল না বলে
বলে খোঁটা দিও নাকো তা বলে।
বন্ধু ঠকায় যদি সইবে–
বলে হিসাবের ভুল দৈবে
ধার নিয়ে যার কোনো সাড়া নেই–
বলে তারে বিশেষ তো তাড়া নেই–
যত কেন যায় তারে ঘা মারি
বলে দোষ ছিল বুঝি আমারই!
