আমি যখন ওদের সঙ্গে তর্ক করতাম সেটা তোক দেখাবার জন্য নয় বা মান বাচানর জন্যও নয়, এবাড়ির পুরুষদের দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তারা কর্তৃত্ব করে না, সমস্ত মেয়েদের উপর ছেড়ে দিয়েছে—এ বাড়ির মেয়েরা সম্পূর্ণ স্বাধীন। অন্য বাড়িতে যেমন দেখি বাড়ির কর্তার জন্য ভালো জিনিসটা তোলা রইল এখানে তা হতেই পারবে না–কর্তারা ফুলস্থুল বাধিয়ে দেবেন। স্ত্রী রাধতে বসলে কর্তা হয়তো পাখা নিয়ে তাকে বাতাস করতে গেলেন! সত্যি বলতে কি এক বাড়িতে এতগুলি কর্তব্যপরায়ণ, উদার ও সৎ লোক আমি পূর্বে দেখি নি।
আমি আমার সংসারযাত্রার পূর্ণ চিত্র এখানে আঁকতে বসি নি। এটা আমার জীবনী নয়—এটা আমার জীবনের একটা অংশ মাত্র, সেখানে নায়ক মির্চা কিন্তু এই গল্পটা সম্পূর্ণ করতে গেলেও আমার স্বামীর কথা কিছুটা বলতে হবে, কারণ তাঁকে বাদ দিয়ে তো আমি নয়। আমরা আটত্রিশ বছর ধরে একসঙ্গে যে সংসার রচনা করেছি তাতে কোনো খুঁত ছিল না, বলতে গেলে কখনো আমাদের বিরোধ হয় নি। আমরা প্রত্যেকটি ফার্নিচার তৈরী থেকে সন্তানপালন একসঙ্গে একমত হয়ে করেছি এবং এসব কাজ মোটামুটি সুসম্পন্ন হয়েছে। আমাদের সন্তানেরা বিরাট প্রতিভাধর না হলেও মানুষ হিসাবে তারা শ্রেষ্ঠ মানুষের শ্রেণীতে যেতে পেরেছে। যে শূন্যতা নিয়ে আমি জীবন শুরু করেছিলাম আমার সংসারের মধ্যে তা ফঁাকির বাঁশি বাজায় নি। বিবাহের পূর্বে আমার প্রধান আকাঙ্ক্ষা যা ছিল, স্বাধীনতা, তাও আমি পূর্ণমাত্রায় পেয়েছি। আমার ঘরে পা দিয়েই আমি বুঝতে পেরেছি, আমার শৃঙ্খল খুলে গেছে, আমি যা উচিত মনে করব তা করতে পারব। স্বাধীনতার অর্থ স্বেচ্ছাচারিতা নয়, আমার অফুরন্ত স্বাধীনতা আমি এমন কোনো কাজে লাগাই নি যা আমার যোগ্য নয়।
বিয়ের অল্প কিছুদিন পরে আমার মনে হল মির্চার ব্যাপারটা আমার স্বামীকে বলা প্রয়োজন—আমি একদিন শুরু করলাম—“আমাদের বাড়িতে একজন বিদেশী ছাত্র ছিল, সে আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, বাবা দিলেন না, তখন সে হিমালয়ে চলে গেল!” একটি বাক্যে আমি সংক্ষেপে কাহিনীটা শুরু করলাম। আমার স্বামী বললেন, “ও তাই নাকি?”
ব্যস্ ফুরিয়ে গেল। ওর কোনো কৌতূহল নেই। কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো, কোনো দায়ে পড়ে দু-চারটে বেশি কথা বলতে হলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। খুব সংক্ষেপে একটা হাসির কথা বলে উনি বাক্যালাপ চুকিয়ে ফেলতে পারলে বাঁচেন। হিমালয়ে চলে গেল তো গেল, আমার কথাটি ফুরলো নটেগাছটি মুড়লো। তারপর আর কি? কাজেই সেদিন আর আমার কিছু বলা হল না। বেশ কিছুদিন পরে আমি আবার একদিন মনস্থির করে তোড়জোড় করে শুরু করলাম—আজ বলতেই হবে। না বলাটা খুব অন্যায় হচ্ছে, “আচ্ছা বাসরঘরে যখন আমি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম তোমার কি মনে হয়েছিল?” নীরবতা, নিচ্ছিদ্র নীরবতা।
“বল না বলতেই হবে তোমার খারাপ লেগেছিল কি না।”
নীরবতা দুর্ভেদ্য। আমিও স্থিরসংকল্প আজকে বলবই—
“কিছু নিশ্চয় মনে হয়েছিল, আমার ভাবভঙ্গী তো ঠিক সহজ ছিল না,”…বহু প্রশ্নের পর উত্তর এই, “তা সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন লোকের সঙ্গে হঠাৎ রাত্রে একঘরে থাকতে অসুবিধা তো লাগতেই পারে। খারাপও লাগতে পারে।”
“তোমার অসুবিধা বা খারাপ লাগে নি?”
“একটুও না।”
“ভালো লেগেছিল?”
“খুবই। অবাক হয়ে গিয়েছিলাম তোমাকে দেখে।”
“তবে আমারই বা খারাপ লাগছে কেন তা তোমার মনে হয় নি?”
এই প্রকারে অশেষ প্রশ্নবাণে নির্যাতিত হবার পর বললেন—“আমার বন্ধু ভূপেশের কথা মনে হয়েছিল, তার মতো হল না তো?”
গল্পটা এই—ভূপেশের বিয়ে হল যেমন কথাবার্তা হয়ে বিয়ে হয়ে থাকে, ভূপেশও মেয়েটিকে আগে দেখে নি। বাসরঘরে মেয়েটি ভূপেশকে বললে, “দেখুন, আমি আপনার স্ত্রী নই, হতে পারি না, আমি একজনকে পতিত্বে বরণ করেছি, সেও আমাকে ভালোবাসে কিন্তু আমার বাবা কিছুতেই রাজি হলেন না। তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন আমি কি করি? আপনারও আমাকে বিয়ে করা উচিত নয়।”
ভূপেশ স্তম্ভিত। মেয়েটির কথা ঠিকই, যুক্তিযুক্ত। ভূপেশ সেই ছেলেটির নাম ঠিকানা নিল, তারপর বরবেশী ভূপেশ বাসরঘর থেকে, বিবাহ বাড়ি থেকে বেরিয়ে সেই পলাতক প্রেমিকের সন্ধানে রাত্রির অন্ধকারে যাত্রা করল। ওদের তখনও কুশণ্ডিকা হয় নি—শুধু সম্প্রদান হয়েছে অর্থাৎ বিবাহের আসল অংশ হয় নি। ঐ কন্যা ভূপেশের ধর্মপত্নী নয়, ওরা একসঙ্গে ধর্মানুষ্ঠান করে নি, সপ্তপদী করে নি, শুধু কন্যার পিতা অন্যান্য তৈজসপত্রের সঙ্গে সালঙ্কারা কন্যাটিকে ভূপেশকে সম্প্রদান করেছেন—তুভ্যঅহং সম্প্রদদে-সম্পত্তি হাত বদল হয়েছে মাত্র! এই কন্যা এখন ভূপেশের সম্পত্তি। ঠিকানা নিয়ে ভূপেশ সেই ভদ্রলোকের বাড়িতে উপস্থিত, “বেশ মানুষ তো আপনি, পড়ে পড়ে শোক করছেন, আপনার কর্তব্য কিছু নেই?”
ছেলেটিকে নিয়ে ভূপেশ বিবাহ বাড়িতে ফিরে এল। সে কর্তব্য স্থির করে ফেলেছে। মেয়ের বাপকে ঘুম ভাঙিয়ে বললে, “আপনি গর্হিত অন্যায় কাজ করেছেন। যাহোক আপনি তো আপনার কন্যাকে আমার হাতে সম্প্রদান করে দিয়েছেন, তার উপর আপনার আর কোনো অধিকার নেই…এখন আমি তাকে তার মনোনীত পাত্রের হাতে সম্প্রদান করে দিচ্ছি। ওদের বিবাহ হবে, আপনার বাধা দেবার কোনো অধিকার নেই।”
“তারপর?”
“তারপর ওদের বিয়ে হয়ে গেল।”
