চিঠিটা পড়ে আমি অবাক হয়ে গেছি–ঝড়ের দুর্যোগের মধ্যে এক পশলা রোদের ধারা। হাসির মত জিনিস আছে? আমি হাসতে হাসতে মাকে দিলাম, “চিঠিটা তোমরা পড়েছ?”
“হ্যাঁ, তোর বাবা একটু একটু…”
“আমাকে কাল দাও নি কেন?”
“আমরা ভালবাম কি জানি, কে কি লিখল-”
“কি জানি কে কি? নিচে তো নাম দেওয়াই আছে—”
আমি ভাবছি কাল চিঠিটা পেলে দু’একটা কথা বলার বিষয় পাওয়া যেত, অন্তত বলতে পারতাম—“আপনি তো খুব হাসাতে পারেন!” তা হল না। কি যে করেন এঁরা!
এ বাড়ি থেকে আমি প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাব, তারপর চলে যাব হিমালয়ের দূরতম প্রান্তে কোনও নির্জন স্থানে যার নামও কেউ শোনে নি। দেওয়ালে যে একটা প্রকাণ্ড ম্যাপ টাঙানো আছে সেখানে খুঁজে দেখেছি ঐ পাণ্ডববর্জিত দেশটির নাম কোথাও নেই। বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় বাবা ছেলেমানুষের মতো কাঁদতে লাগলেন। আমি তো কাঁদছিই অবিরাম। বাবার উপর সব অভিমান চলে গেছে, আমি ভুল বুঝেছিলাম, যা করেছেন আমার ভালোর জন্যই করেছেন। রমার জন্যও আমার মন কেমন করছে, আমার বিয়েতে ও কম তো খাটে নি।
আমার বিয়ের তিন-চার দিন পর কবি সিলোন থেকে ফিরেছেন। তার সঙ্গে আমরা দেখা করতে যাব কিন্তু আমি বাবার সঙ্গে যেতে রাজি নই। সাহস করে বললাম, “তোমরা আগে যাও আমি পরে একলা যাব।”
বাবা খুব গম্ভীরভাবে বললেন, “বেশ কথা, আমি আমার জামাইকে নিয়ে সকালে যাচ্ছি তুমি দুপুরে যেয়ো।”
দুপুরবেলা আমি গাড়িতে একলা যাব ভেবেছি তা রমা আমার সঙ্গে চলল। ও যে কেন এল জানি না, ওর সঙ্গে কথা বলবারও আমার ইচ্ছে হচ্ছে না। আমার মনের ভিতরটা একটা অদ্ভুত আবেগে কম্পমান, কি কারণে আমি এত অস্থির ও উদ্ভ্রান্ত তা জানি না। ঘোরান সিঁড়িটা দিয়ে আমি দ্রুত উঠছি, আমার পরনে বেনারসী, তার আঁচলটা লুণ্ঠিত হচ্ছে, রমা তুলে দিচ্ছে–হাতে গলায় কানে গয়না, মাথায় সিঁথি, পায়ে নূপুর ও নূতন সিদুরে আমার বধূবেশ সম্পূর্ণ। উনি অপেক্ষা করছিলেন—আমাকে দেখেই দুই হাত বাড়িয়ে দিলেন—“এসো অমৃতা–”
আমি তার কোলের উপর পড়ে কাঁদতে লাগলাম। আমি শুনতে পেলাম, উনি বললেন, “রমা, তুমি পাশের ঘরে গিয়ে একটু বসো, আমি ওর সঙ্গে কয়েকটা কথা বলব।”
রমা চলে গেল। উনি আমাকে একটুক্ষণ সময় দিয়ে তারপর বললেন, “উঠে বোসো।” আমি উঠে বসলাম। উনি বলতে লাগলেন—“আমি উপদেশ দিতে ভালোবাসি না। বড় বড় কথার পাথর চাপিয়ে আমি আর্ত মনকে আরো ক্লান্ত করে দিতে চাই না। তবু আজকে আমার তোমাকে কয়েকটা কথা বলতেই হবে।” একটুক্ষণ নীরবতার পর—“তোমার বাবা আজ সকালে ছেলেটিকে নিয়ে এসেছিলেন, তার সঙ্গে আর কি কথা বলব? কেবল পণ্ডিতরাই এরকম নিষ্ঠুরতা করতে পারে। কিন্তু তোমার উপর কেউ নিষ্ঠুরতা করেছে। বলে তুমিও নিজের উপর নিষ্ঠুরতা করবে এটা কোনো কাজের কথা নয়। আর কেউ আমাদের হাতে নেই অমৃতা, আমরা কেবল নিজেই নিজের হাতে আছি। আমি জানি না যার সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়েছে তিনি কেমন, তার পারিপার্শ্বিক তোমার অনুকূল কিনা, কিন্তু অবস্থা যেমনই হোক, ভাগ্য যেমনই হোক, তুমি তার চেয়ে বড়ো হবে। আমি আশা করছি, তুমি তোমার চারপাশে যারা আছে তাদের সকলকে সুখী করবে, সবচেয়ে বড় কথা নিজে সুখী হবে। যদি তুমি সুখী না হও অমৃতা, যদি তুমি ভেঙে পড়, পরাজিত হও প্রতিকূল অবস্থার হাতে, তাহলে আমি মনে করব সে আমারি পরাজয়। কিন্তু আমি জানি তা হবে না। তুমি নিশ্চয়ই পারবে। যদি তুমি একখানি নীড় তৈরী করতে পার যেখানে তোমার আনন্দের সংসারে সকলে আনন্দিত তাহলে আমি কথা দিচ্ছি আমি যাব তোমার সেই ঘরে।”
উনি পরম স্নেহে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, আমি নিচু হয়ে তার পায়ের উপর মাথা রাখলাম—নরম মসৃণ পায়ের পাতা চুম্বন করে বললাম—“তাই হবে, তাই হবে, তাই হবে।”
বাড়ি ফিরে রমা গোপনে বাবাকে সব বলে দিল। কি বললে কে জানে? আড়ি না পাতলে তো ওর জানবার কথা নয়। আর আড়ি পাতলেও তো এমন কোন কথা হয় নি যা নিন্দনীয় বা আমি কোনো নালিশ করেছি। আমার অশ্রুজল যদি নালিশ হয় তাহলে তো নাচার। কিন্তু সেদিন বাবা আমাকে এমন বকলেন অমন ভয়ানক বকুনী আমি আগে আর কখনো খাইনি। সে আর থামেই না, থামেই না। আমাদের সে যুগটা ছিল অদ্ভুত, গুরুজনেরা মনে করতেন ধমক দিয়ে কান্না থামাবেন, ধমক দিয়ে হাসাবেন ও ধমক দিয়েই ভালোবাসাবেন। যাহোক আমি সেদিন ভেবেছিলাম এই যে চলে যাচ্ছি আর কোনোদিনও আসব না, কিন্তু সেটা একটা অভিমানের কথা। আমার নির্জন গিরিবাস থেকে আমি প্রতি দু’মাস অন্তর একবার করে সাধ্যাতিরিক্ত ব্যয় করে এসেছি বাবাকে দেখব বলেই।
ধমকের দৌড় যে কতদূর পর্যন্ত পৌঁছয় তা এ যুগের লোক বিশ্বাস করবে না। বেশ কিছুদিন পর্যন্ত মা খবর নিতেন আমাদের স্বামীস্ত্রীর ভাব কতদূর এগিয়েছে, যখন টের পেতেন বিশেষ কিছু এগোচ্ছে না, তখন খুব রাগ করতেন।
কিন্তু উদ্বেগের কারণ ছিল না, ভাব আমাদের হয়ে গেল।
***
২.২ নির্জন গিরিবাস
আমি যখন সেই নির্জন গিরিবাসে এলাম তখন বর্ষাকাল—গভীর আদিম অরণ্য পার হয়ে যখন বাড়িতে, এসে পৌঁছলাম তখন সেই বাগানঘেরা বাড়িটা যেন আমার দিকে চেয়ে হেসে উঠল। শান্ত নির্জন বনভূমি—দূরে নীলাভ দিগন্তে বরফের সাদা রেখা। গৃহ সুসজ্জিত, ভৃত্যকুল পরিমার্জিত। আমাকে ‘ব্যাচিলারের’ এলোমেলো বাড়িতে আসতে হয় নি। আমরা যদিও এদের চেয়ে সঙ্গতিসম্পন্ন তবু সত্যি বলতে কি, এত আরামে পূর্বে থাকি নি। কিন্তু আমাদের আত্মীয়-স্বজনেরা নিন্দা করতেই লাগল—তারা বললে যথোপযুক্ত বিয়ে হয় নি, ইত্যাদি ইত্যাদি—বিশেষত আমার সমবয়সীরা আমার দুঃখে গলে যেতে লাগল—শেষ পর্যন্ত এই! আমার ভারি রাগ হত। গোপালের সঙ্গে তো আমার জন্মের মতো ঝগড়া হয়ে গেল। এক বান্ধবী মুখ টিপে বললেন-“পতিনিন্দা শুনি সতী হৈল অতি রোষবতী”—আর একজন বললেন, “তোর যখন পছন্দ হয়েছে আমাদের আর বলার কি আছে, তবে বলিহারি যাই তোর পছন্দে—”।
