“চল” তারপর একটু ভেবে, “তোর বাবা কিন্তু তোকে বকবেন।”
“বকুন। চল যাই।”
আমরা সেই জনসমুদ্রে নেমে গেলাম। এমন ভীড় এর আগে কখনো দেখি নি। জগন্নাথের রথযাত্রায় দড়ি ধরেছি কিন্তু এ তার চেয়ে বেশি। হঠাৎ সাদা ঘোড়ায় চড়া এক গোরা সার্জেন্ট ভীড়ের মধ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে ঢুকলো। সেই নৃশংস আক্রমণে জনতা দলিত পিষ্ট হয়ে গেল। আমরাও কিছুটা আহত হলাম। বাড়ি যখন ফিরলাম তখন কাপড়চোপড় ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে, ধূলিধূসরিত অবস্থা। ভেবেছিলাম মিথ্যা কথা বলব বললাম না। মনটা সে সময় এত উঁচু তারে বাধা ছিল যে মনে হল মহৎ মৃত্যুর অসম্মান করব যদি মিথ্যা কথা বলি। সত্যই বললাম। সেদিন বাবা আমায় এত বকেছিলেন। যে আমার মাথার ভিতরটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল।
আমি কি করে স্বাধীন হব এই আমার সর্বক্ষণের চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা তো আগেও স্বাধীন ছিলেন না, ইচ্ছেমতো কাউকে কুড়ি টাকাও দিতে পারতেন না—লুকিয়ে ছাড়া। তবু তখন বাবার উপর তার যথেষ্ট প্রভাব ছিল, বুঝিয়ে অনেক কিছুই করতে পারতেন, এখন আর কোনো প্রভাব নেই। বাবা মাকে খুঁটিনাটি নিয়ে সর্বক্ষণ বকছেন। আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম যারা নিজের স্বাধীনতা ভালোবাসে তারা অন্যকে পরাধীন করে রাখে কোন যুক্তিতে? অবশ্য এই যুক্তি-হীনতাই তো সর্বত্র, কি পরিবারে, কি রাষ্ট্রে! Rule Britania rule the waves-Britons will never never be slaves’ অথচ সেই ব্রিটনরাই তো আমাদের পরাধীন করে রেখেছে, শুধু আমাদের কেন আরো কত জাতিকে, আবার সেটাও তাদের গর্ব Sun never sets in British Empire :মানুষ যুক্তির প্রয়োগ করে কমই।
মা পাত্রের সন্ধানে উদ্ব্যস্ত। রীতিমত একখানি খাতা করা হয়েছে তাতে উপযুক্ত পাত্রদের নাম, গুণাবলী, তাদের অভিভাবকদের নাম-ঠিকানা সব লেখা হয়েছে। ভালো পাত্র অর্থাৎ দামী সরকারী চাকরি করবে, বিষয়আশয় থাকবে আবার বিদ্যাও থাকবে এমন পাত্রের আকাল সব সময়ই। তখন আরো ছিল। একটি উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান পেলে সমস্ত অবিবাহিত কন্যার মায়েরা জাল পাততেন। সেই সময়ে নিন্দার প্রতিষ্ঠানটির একটি উপশাখা ‘ভাংচির’ কাজ শুরু হয়ে যেত। মা সেই ভয়ে ভয়ে আছেন। একে তো মির্চার কথা আত্মীয়স্বজন অনেকে জেনে গেছেই—আবার বাবা এই কাণ্ড শুরু করেছেন, তা না হলে রূপ, গুণ, বিদ্যায় ফেলনা মেয়ে তো নয়, এত ভাবনা কেন?
এই সময় থেকে ভাবছি এদেশের সবচেয়ে যে বড় অন্যায় জাতিভেদ তার জন্য আমি কিছু করব। কি করে কি করি! কেই বা আমার কথা শুনবে? আমি ছাড়া। তাই বাবাকে একদিন বললাম, “তোমরা তো আমার বিয়ে দেবে তা অন্য জাতে দেও না কেন? তাহলে তো খুব ভালো হয়।”
“অন্য জাতে?” বাবা বিস্মিত। “কেন আমাদের জাত দোষটা করল কি?”
“তাহলে বিয়েও হয়। দেশের একটা কাজও হয়।”
বাবার বিস্ময় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, “কি! বিয়েও হয় দেশের একটা কাজও হয় আমি ওসব রিফর্মেটরি ম্যারেজের মধ্যে নেই।”
একটি পাত্র এল, ডাক্তার, দামী সরকারী চাকুরে, বিষয়আশয় বোধ হয় লবডঙ্কা, তা হোক আসল দোষ হচ্ছে রংটি বেশ ঘোর কৃষ্ণ। আমরাও তো বর্ণবিদ্বেষী কম নয়। মা খুব কাতর হয়ে বলছেন, “বড্ড যে কালো রে, কি করি?”
আমার খুব মজা লাগছে, ভাবলাম বলি, ফর্সা তো আবার তোমাদের পছন্দ নয়। থাক, ও সব কথা না তোলাই ভালো। ডাক্তারের বৃদ্ধ বাবা আমাকে ছাড়তেই চান না, কিন্তু ডাক্তারের আমাকে পছন্দ হল না। তার একটা নিজস্ব মত ছিল। তিনি বাঙালি জাতির উন্নতির জন্য চিন্তিত। দোষ দিতে পারি না, আমি যেমন জাতিভেদ দূর করে বাঙালি জাতির আত্মিক উন্নতির জন্য চিন্তা করি তিনিও দৈহিক উন্নতির চেষ্টা করছেন। তার নিজের উচ্চতা পাঁচ ফুট তিন চার ইঞ্চি হবে, তাই তিনি অন্তত পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি মেয়ে খুঁজছেন। আমি তো পাঁচ ফুট দুই বা তিন। তার ধারণা ছেলে যদি বেঁটে হয় তার লম্বা মেয়ে দরকার। তা না হলে বেঁটের সঙ্গে বেঁটের বিয়ে হলে বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ কোথায়? ঐ পাত্রটি উচ্চপদে আছেন, তাই স্বজাতির ঘরে যত অবিবাহিত কন্যা আছে মেপে মেপে বেড়াচ্ছেন, অবশেষে এক বাড়িতে গিয়ে দেখেন পাত্রীর দিদিমা খুব লম্বা। রোগা লম্বা, চ্যালা কাঠের মত শরীর বৃদ্ধার। তা তিনি রসিকা মন্দ নন। তাকে দেখে ডাক্তারের ভালো লেগেছে—“আপনি তো খুব লম্বা।”
তিনি তার রোগা লিকলিকে হাতখানি ঘুরিয়ে উত্তর দিলেন, “তাহলেও তো তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে না বাপু।”
শুনেছি ঐ পাত্রের আর কোনদিন বিয়েই হয় নি, মাপসই পাত্রীই পাওয়া গেল না। পাত্রের বৃদ্ধ বাবা আমাকে খুব স্নেহ করেছিলেন, তিনি তার মৃত্যুশয্যা থেকে আমার বাবাকে লিখেছিলেন, আমার মুখ ছেলে অমন লক্ষ্মীকে আমার ঘরে এনে দিল না, কিন্তু আমি আশীর্বাদ করে যাচ্ছি আমার ছেলের চেয়ে শতগুণে ভালো ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হবে। সেই স্নেহপরায়ণ বৃদ্ধের জন্য আমি এইখানে একটি প্রণাম রেখে দিলাম।
অবশেষে পাত্র পাওয়া গেল। বাঁচলাম। মা ঠিক করেছিলেন ভাংচির আপিসে খবরটা পৌঁছবার আগেই কাজটা সেরে ফেলা ভালো। কাজেই ঠিক পাঁচদিনের মধ্যেই বিয়ের ব্যবস্থা হল। পাত্র বিদ্বান ব্যক্তি, বাবা বলছেন, “পাঁচ বছরে ডক্টরেট করেছে, কম কথা নয়!” মা বলছেন, “তোমার ছাত্র ছাত্রীরা তো ঘেসটাচ্ছেই, ঘেসটাচ্ছেই, কত দিনে করবে?”
