ভবানীপুরের বাড়ি ছেড়ে আমরা ১৯৩১ সালেই অন্য বাড়িতে এসেছি। এ সময় থেকেই আমার মায়ের সুন্দর সাজানো সংসারটাতে ভাঙন ধরেছে। পুরানো লোকেরা সব চলে গেছে—এখন একজন নূতন মানুষ এসেছে যে ধীরে ধীরে এই সংসারের স্নেহভালোবাসার বন্ধনগুলি সব খুলে ফেলতে সমর্থ হচ্ছে। সেই মেয়েটির নাম রমা। তার আকৃতি সুন্দর নয়, মুখ চক্রাকার, চোখ বের করা, নাসিকা ঈষৎ বর্তুল এবং মুখের তুলনায় ছোট। সে খুব বেঁটে। কিন্তু তার গলার স্বর মিষ্টি। সে খুব আস্তে কথা বলে, নম্র এবং ভদ্র। তার শান্ত ভাব, আমরা যেরকম হুড়মুড়ে দুদ্দাড় সেরকম নয়। আমি তাকে খুব ভালোবাসতাম, তার কথাবার্তা প্রীতিপদ, সে বিদূষী। বিদূষী বটে অর্থাৎ পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে। কিন্তু কবিতা একেবারে পড়ে নি। তার শিল্পরুচি নেই। এক লাইন লিখতে পারে না বা সুন্দর করে কথা বলতে পারে না, কিন্তু তার ধৈর্য আছে—একটা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকতে পারে, যাকে বলে পারসিভিয়ারেন্স—তার প্রমাণ সে দিয়েছে ১৯৩১ সালে শুরু করে দশ বছর লেগেছে তার ডক্টরেট করতে! এ কর্ম আমার দ্বারা হত না। আমার ধৈর্য নেই। তাকে আমরা আপন জনের মতো কাছে টেনে নিয়েছি। মা যেমন আমাদের সেবা করছেন। সব সময়, তারও করছেন। সে বাবাকে খুব সাহায্য করে। সব সময় তার সঙ্গে থাকে, যখন কাজে যান তখনও। এই আগ্রহ আমার খারাপ লাগে না। শুধু ক্রমে ক্রমে সংসারে মার আসনটা নড়ে যাচ্ছে তাতে আমি পীড়িত। মাকে বাবা সব সময় বকছেন। মার ত্রুটি যেন বেড়েই চলেছে। আগে মা সর্বময়ী কত্রী ছিলেন, এখন যত দিন যাচ্ছে প্রতিদিনই যেন মা একটু একটু করে সরে যাচ্ছেন। মা কাতর, খুব খোসামোদ করেন। আমার তাতে লজ্জা বোধ হয়।
পৃথিবীতে যদি একজনও কেউ জানে তবে আমি জানি যে ভালোবাসার জন্য কোনো আত্মীয়সম্পর্ক প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমি এও জানি যে ভালোবাসা আলোর মত—তা সকলকেই উজ্জ্বল করে! সেটা তো একটা পদার্থ নয় যে এক জনের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে অন্যকে দিতে হবে। আমি আরো জানি ভালোবাসলে তার সম্পর্কে যে যেখানে আছে সবাই প্রিয় হয় তার বাড়ির ভৃত্যটি পর্যন্ত আপন মনে হয়। সে ক্ষেত্রে আমি কি দেখছি? কেবল সাংসারিক অধিকার বাড়াবার চেষ্টা এবং মাকে অপদস্থ করবার চেষ্টা, আরো আমার অসহ্য হয়েছে মিথ্যার আশ্রয়—সত্যকে স্বীকার করলেই হয়। যত কষ্টই হোক সত্যের মুখোমুখি আমি দাঁড়াতে পারি কিন্তু আমি মার মতো চোখ বুজে থাকতে পারি না। কাজেই প্রতিটি দিন আমার অসহ্য হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে আমাদের উপরও বাবার টান কমে যাচ্ছে। আমাকে যে কারণে বিদেশে বিয়ে দিতে রাজী হলেন না তাও তো শুনছি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবেন না বলে। কিন্তু এখন আমার পড়াশুনোর উপরও তার টান কমে গেছে। আমার উপরও। আমি কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমাদের সংসারের ভিতর যে একটা ভিন্ন স্রোত বইছে তা বাইরে থেকে কেউ বুঝতে পারে না। মা সবটা ঢেকে রাখছেন। কিন্তু নিরাপত্তাবোধ হারিয়ে ফেলেছেন। মার মনে হচ্ছে আমার খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়া দরকার। আমারও তাই মত। এ সংসারে আমার একটুও থাকবার ইচ্ছে নেই—আমি এখান থেকে পালাতে চাই। আমি নিজেই বুঝতে পারছি রাগে দুঃখে আমার ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছে, মিথ্যার সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে বলে। আমি যা জানি, ভালো করে বুঝতে পারছি, তা যেন বুঝতে পারি নি, যেন তা নয় এইভাবে চলতে হচ্ছে বলে।
বছরের পর বছর গড়িয়ে চলেছে, প্রতিদিনই মার পক্ষে অপমানজনক ও অপ্রীতিকর কিছু ঘটে। বিশেষত বাইরের লোক এখন খুব নিন্দা শুরু করেছে। কাগজেও লিখছে! বাবার নিন্দা মাকে শুনতে হয়, সহ্য করতে হয়। আমি বুঝতে পারছি রমার ভালোবাসায় স্বার্থের খাদ বড় বেশি। শ্রদ্ধার ও ভালোবাসার পাত্রকে কেউ নিন্দিত অপমানিত করতে পারে? তার সংসারে বিশৃঙ্খলা, অশান্তি আনতে পারে? আমাদের দেশে নিন্দা একটা ‘ইনস্টিট্যুশন’, এই প্রতিষ্ঠানের কাজ খুব বেড়ে গিয়েছে—মা যতই আড়াল করবার চেষ্টা করুন, ‘এও একটি আমার মেয়ে বলে পরিচয় দিন, লোকের জিহ্বা বশ মানছে না। যা হোক এ কাহিনী মার জীবনী নয়, কাজেই একথার বিশদ ব্যাখ্যায় তত প্রয়োজন নেই। শুধু এটুকু আমি বুঝতে পেরেছি—এই ভালোবাসার দুটো রূপ পাশাপাশি ঘেষাঘেষি করে বাস করে, একটা মানুষকে ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে যেখান থেকে ক্ষুদ্র স্বার্থ দূর হয়ে যায়,যা চারপাশ আলোয় ভরে দেয়, যে আলো পড়ে সামান্য জিনিস অসামান্য হয়ে ওঠে, প্রিয় প্রিয়তর হয়—এমন কি অপ্রিয়ও প্রিয় হয়, কাউকে তাড়িয়ে দিতে হয় না। আর একটা, সেও ঐ একই নাম ধরে আসে, কিন্তু সে গলায় ফাঁস দিয়ে টানে, শিকল দিয়ে বঁধে, সে বলে কৈ প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকা বের কর, ইনসিওরেন্স আমার নামে লিখে দাও। বাড়িটা পেলেও ভালো হয়। বইয়ের কপিরাইট আমায় লিখে দাও, তোমার নাম খ্যাতিটাই বা নয় কেন? অন্তত আমি তোমার নামটা নেব।
মানুষ যেন সার্কাসের জানোয়ারের মতো দড়ির উপর দিয়ে চলেছে—চলতে জানলে ওপারে যথাস্থানে পৌঁছে দেবে, নৈলে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে।
মার দিনে রাত্রে ঘুম নেই, আমারও। কি করে এই বাড়ি ছেড়ে যাই, আবার ভাবি মাকে কার কাছে রেখে যাব? বাবা আমাকেও খুব বকেন আজকাল কারণ আমার চোখে তিনি নিশ্চয় নীরব ভর্ৎসনা দেখতে পান। যখন আমি বি. এ. পড়ি বন্ধুদের সঙ্গে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম, এমন কিছু দুষ্য ব্যাপার নয়, তাতেই বাবা এত বকলেন যে আমি দিশাহারা হয়ে গেলাম। তারপর সেদিনটাও ভুলতে পারি না যেদিন যতীন দাসের মৃতদেহ নিয়ে প্রশেসন চলেছিল রসা রোড দিয়ে। আমি আমার সমবয়সী কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি, কী উৎসাহ কী উদ্দীপনা। সুভাষ বোস চলেছেন আগে আগে। কত লোক চলেছে খালি পায়ে। বিচিত্র ধ্বনি উঠছে বাতাস ভেদ করে, সে জয়ধ্বনি আমাদের কানে এসে মন্ত্রের মত আমাদের অভিভূত করে দিচ্ছে, আমাদের সমস্ত মন টানছে নেমে যেতে, ঐ শোভাযাত্রায় যোগ দিতে। প্লাকার্ডে নানা কথা লেখা আছে—তার মধ্যে দেখছি ঐ লাইনগুলি—“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই, ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। কবিতা আমার রক্তে চলে যায়, আমাকে ব্যাকুল করে তোলে, আমি বারান্দা থেকে আবৃত্তি করছি পরের লাইনগুলো যা ওখানে লেখা নেই—“হে রুদ্র তব সঙ্গীত আমি কেমনে গাহিব কহি দাও স্বামী, মরণ নৃত্যে ছন্দ মিলায়ে হৃদয় ডমরু বাজাব—ভীষণ দুঃখে ডালি ভরে লয়ে তোমার অর্ঘ্য সাজাব’ কবিতাটা বলতে বলতে আমার মন যেন মন্ত্রাবিষ্ট হয়ে গেছে—ঐ পুষ্পচ্ছাদিত শবাধারের দিকে চেয়ে আমরা যেন হিপ্নটাইজড়। “ছুটকু চল ভাই আমরাও শোভাযাত্রায় যোগ দিই।”
