বাবা খুব রেগে গেছেন, “সায়েন্স আর আর্টস এক হল? সায়েন্সে খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যায়!”
আমার বাবা পাত্রকে নিমন্ত্রণ করে এলেন। কিন্তু তিনি এলেন না। পরে শুনেছি তার আসবার কারণ হচ্ছে তিনি শুনেছিলেন পাত্রী সুন্দরী। দেখতে এসে তিনি যদি প্রেমে পড়ে যান যার সম্ভাবনা খুবই আছে, আর মেয়েটি যদি তাকে দেখে বিমুখ হয় যার সম্ভাবনাও ততোধিক—তাহলে? কাজেই কাজ কি গোলেমালে! দেখাশোনার চেষ্টা না করাই ভালো। জীবনে এই প্রথম ও শেষ বোধহয় তিনি নিজের জন্য একটি চাতুরী, অবলম্বন করেছিলেন।
বিয়ের আয়োজন এগিয়ে চলেছে। আত্মীয়স্বজন কেউ আসতে পারবে না। অত তাড়াতাড়ি আসবে কে? মাও তো সুস্থ নন। মন খারাপ হলে যে অসুখ হয় মার তারই সুত্রপাত হয়েছে—গ্যাস্ট্রিক আলসারের মতো। মার অস্থির লাগছে, শত হলেও তার মেয়ে তো পূর্ববঙ্গের গ্রাম থেকে আসে নি, এত লেখাপড়া কবিতা লেখা ইত্যাদি করে নামডাক হবার পর একেবারে দেখাশোনা না করে গ্রাম্যবিবাহ! মা খুঁত খুঁত করছেন। অবশেষে একদিন বললেন, “আমি যাই ওকে ডেকে নিয়ে আসি। তুই তো দেখবি একবার? না দেখে কি করে হয়?”
“কখনো না–কোনো দরকার নেই।”
“দরকার নেই? দেখতে চাস না?”
“মা তোমার লজ্জা করে না একথা আমাকে বলতে? কি জন্য দেখব? ধর যদি দেখে আমি বলি, একে আমার পছন্দ হয় নি, আমি অমুককে বিয়ে করব, সে অন্য জাত, তা হোক আমার তাকেই পছন্দ, তাহলে তোমরা শুনবে? তোমরা তো তখন যুক্তি বিস্তার করবে, তবে?”
“বাঃ, অপছন্দই বা হবে কেন? পুরুষ মানুষের চেহারাই তো সব নয়। ধলামূলো কত আছে?”
“মা, বাজে কথা বোলো না। তোমরা সব এক—তোমাদের সত্যকে স্বীকার করবার সাহস নেই। আর তুমি, তুমিই সবচেয়ে দোষী। তুমি চোখ বুজে থাক।”
মা কাঁদতে শুরু করেছেন—“তোদের জন্য যত করি তোরা সকলে মিলে আমাকে তত বকিস।”
কথাটা সত্যিই। মার উপর রীতিমত নির্যাতন করি আমি। কথায় কথায় আমার রাগ। সাবি গেল ও বাড়িতে। ফিরে এসে আমার গলা জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করেছে—“ও দিদি তুই এখানে বিয়ে করিস না, করিস না, আমার একটুও পছন্দ হয় নি।” আমি খুব হাসছি। মনে মনে বলছি, আমি যাকে পছন্দ করি তুমি তো তাকে তাড়াও। মুখে কিছু বলছি না, ও নিশ্চয় সে সব কথা ভুলে গেছে। ছেলেমানুষ। ভুলে যাওয়াই ভালো। কেন যে এ রকম একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটল আমার জীবনে। জীবনের উপর তো রবার চালানো যায় না। যে ছবিটা একবার আঁকা হয়ে গেছে তা আর মোছবার সাধ্য নেই। সাহিত্যে যায়। দেখি তো কবিকে কেটে কেটে লাইন বাদ দিচ্ছেন, পাতার পর পাতা লেখা বরবাদ হয়ে যাচ্ছে—কিন্তু জীবনে যে লেখাটা হয়েছে তার উপর আর রবার চালান যাবে না। যদি যেত আমি এই মুহূর্তে সমস্ত শক্তি দিয়ে রবার ঘষে ঘষে উনিশ শ ত্রিশ সালটা মুছে ফেলতাম। আমার জীবনের বৃন্ত থেকে ঐ বছরটা শুকনো পাতার মত উড়ে চলে যাক, যেমন মির্চার প্রতি ভালোবাসাটা গেছে। তার মুখও আর আমার মনে পড়ে না, পড়লে হর্ষও হয় না বিষাদও নয়। চার বছর তো হয়ে গেল আর কতকাল মনে থাকবে।
আশীর্বাদের দিন থেকে আমি কাঁদতে শুরু করেছি। অবিশ্রান্ত কাঁদছি, কিছুতেই সংবরণ করতে পারছি না। কেন কাঁদছি নিজেই জানি না। যদি কেউ বলতো “থাক তবে তোমার আর বিয়েতে দরকার নেই”—আমি কি রাজি হতাম? কখনো নয়। কত কষ্টে বলে এ বাড়ি থেকে বেরুবার দরজাটা পেয়েছি। আমি স্বাধীন হতে পারব। আর কিছু না হোক শান্তিনিকেতনে তো ইচ্ছে মতো যেতে পারবো। কিন্তু তবু আমি কাঁদছিই, কেন কে জানে? লোকে ভাবছে পিতৃমাতৃভক্ত কন্যা, এঁদের ছেড়ে যেতেই বোধ হয় কাঁদছে। ঠিক তার উল্টো। আমার কিছু ভালো লাগছে না।
বিয়ের দিন ভোরবেলা সানাই বাজছে। দধিমঙ্গল হয়ে গেল। আমার একজন ব্রাহ্ম জ্যাঠামশাই খুব ভালো গান করতেন। তার একটি সুন্দর অন্তজীবন ছিল। তাকে আমি শ্রদ্ধা করতাম। তিনি কয়েকটি গান করলেন। আমি তাকে বললাম, ‘জ্যেঠামশাই আজ রাত্রে আপনি আমায় একটা গান শুনিয়ে যাবেন।‘
বিয়ে হয়ে গেল।
এই সময় কবি সিলোনে ছিলেন। বাবা টেলিগ্রামে আশীর্বাদ চেয়েছিলেন, টেলিগ্রামেই আশীর্বাদ এসেছে। বিয়ের সময় থেকেই আমি বুঝতে পেরেছি আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল—আমি একে গুছিয়ে নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারব তো? রাত্রে বাসরঘরে কড়িখেলা হচ্ছে আমি দেখলাম ঘরের সামনে দিয়ে জ্যেঠামশাই যাচ্ছেন। আমি কড়ি খেলা ফেলে রেখে উঠে এলাম,—একটা গান শোনা আমার বড় দরকার, কড়িখেলা নয়। জ্যেঠামশায় বিশ্বাসই করতে পারেন নি যে আমি উঠে আসতে পারব। তিনি বিস্মিত এবং হৃষ্ট। জ্যেঠামশায় বারান্দায় বসে গান করলেন—
‘মোদের কে বা আপন কে বা অপর, কোথায় বাহির কোথা বা ঘর—ওগো কর্ণধার–চেয়ে তোমার মুখে মনের সুখে নেব সকল ভার—আমাদের যাত্রা হলো শুরু এখন ওগো কর্ণধার তোমারে করি নমস্কার’—“যাও মা তোমার ঘরে যাও—নিবিঘ্ন হোক তোমার সংসারযাত্রা–”
আমার স্বামীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমায় আশীর্বাদ করে আমার বাবা-মা চলে গেলেন বাসরঘরের দরজাটা বন্ধ করে। আমার স্বামীর বয়স চৌত্রিশ বছর, তিনি আমার চেয়ে চৌদ্দ বছরের বড়। আমরা পরস্পরকে দেখছি। ইনি দেখতে ভালো নয়, আরো ত্রুটি আছে কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি একান্ত ভালো লোক, আমার ভয়ও করছে না, বিরক্তও লাগছে না। আমি সবুজ ডুরে সুতির শাড়ি পরে আছি, আমার কপালে কনেচন্দন কিন্তু সিঁথিতে সিঁদুর নেই কারণ কুশণ্ডিকা হয় নি। কুশণ্ডিকা না হলে বিবাহ সম্পূর্ণ নয়। এমন অবস্থায় হিন্দু সমাজের সাধারণ নিয়মে বর কনে এক ঘরে থাকে না। ঘরে কয়েকজন বালকবালিকা অন্তত পাহারা থাকে। কিন্তু আমরা ও সব কুসংস্কার মানি না আমরা তো আধুনিক।
