“বল, কি হল সে সায়েবের, সে কোথায়?”
“চলে গেছে”…
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। আমি ওর কাছ থেকে উঠে গিয়ে পশ্চিমদিকের দরজাটার কাছে উপুড় হয়ে কাঁদতে লাগলাম।
“এদিকে এসো অমৃতা, এদিকে এসো, আমি শুনি সবটা!”
আর আমার ক্ষমতা নেই উঠে যাবার বা বলবার। আমি ঝড়ে পড়েছি, কান্না থামিয়ে তিন-চার গজ দূরত্ব পার হয়ে আবার ওর কাছে যাওয়া? অসম্ভব। আমি মার কথা শুনছি না। ওই সব কথা বলতে আমার বুক ফেটে যাবে। আমি কি করে বলব? কোথা থেকে শুরু করব? কার দোষ? ওর, না আমার? আমি বুঝতে পারছি আমি অবাধ্যতা করছি—যদি সম্ভব হত আমি এখনই এই দরজা দিয়ে উড়ে মার কাছে ফিরে যেতাম, আমি এ পরীক্ষায় পাশ করতে পারব না। হঠাৎ বুঝতে পারলাম উনি চেয়ার ছেড়ে উঠে এসেছেন। আমার পাশে একটা মোড়াতে বসেছেন—“অমৃতা, ওঠ, স্থির হও”
আমি উঠলাম। উনি আমাকে ঠেসান দিয়ে বসতে সাহায্য করলেন—“তোমার কি আমাকে বলতে কষ্ট হচ্ছে?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে কিছু বলতে হবে না। বলবার দরকার নেই। শান্ত হও, শান্ত হও।” আমি শান্ত হবার চেষ্টা করছি।
উনি আবার বললেন, “তোমাকে কিছু আর বলতে হবে না, অমৃতা, শুধু বল, আমি তোমার জন্য কিছু করব? কোনো সাহায্য চাও?”
উনি সাধারণত যখন কারু সঙ্গে কথা বলেন তখন তার দিকে তাকিয়ে বলেন না। হয় নিচের দিকে, নয় দূরের দিকেই চেয়ে থাকেন বেশির ভাগ সময়। উনি মানুষকে সম্ভাষণ করছেন, সামনের ঐ ব্যক্তিটিকে নয়—তার সমস্যা মানুষের সমস্যা। একথা পরে বুঝেছি, তখন বুঝতাম না–তখন আমার অভিমান হত। এখন বুঝতে পারি মানুষ তার প্রেম ও আনন্দ নিয়ে, সুখ দুঃখ কাতরতা নিয়ে, তার হৃদয়ভরা জিজ্ঞাসা নিয়ে, তার কাছে এসেছে। কোনো একজন ব্যক্তি নয়। এখন বুঝতে পারি এই নির্মমতা না থাকলে তার সংবেদনশীল মন এই দুরূহ কঠিন কর্মসাগর পার হতে পারত না, জ্ঞানের ঐ পর্বতচূড়ায় পৌঁছতে পারত, আঘাতে প্রত্যাঘাতে তা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেত। তিনি কোনোদিন কাউকে বলতেন না, আজ যেও না দুদিন থেকে যাও। অবশ্য অসুস্থ হয়ে যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তখনকার কথা বলছি না, তখন আমাদের জন্য তার চোখ দিয়ে জল পড়তেও আমি দেখেছি–
কিন্তু সেদিন সেই দ্বিপ্রহরে তিনি আমার সঙ্গেই কথা বলেছিলেন,—“বল অমৃতা, বল, আমার দিকে তাকাও”–উনি আমার চোখের দিকে চেয়ে বললেন, “তুমি যা বলবে আমি তাই করব।”
…“তুমি যা বলবে আমি তাই করব”…কথাটা যেন নেচে উঠল,—’তোমার সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত নাচাও যে ঝঙ্কারে’। সেই মুহূর্তে আমার মনের ভাবটা ঠিক কি রকম হয়েছিল তা বর্ণনা করবার আমার সাধ্য নেই—কিন্তু বর্ণনাটা আমি পরে পেয়েছিলাম যখন চণ্ডালিকা দেখতে যাই। চণ্ডালিনী বলছে—‘আমার কূপ যে হলো অকূল সমুদ্র’–কূপ কি করে একটি কথায় অকূল সমুদ্র হতে পারে শত শত দর্শক যারা দেখছে তারা জানে কি? ওটা যে সত্য তা জানে কি? ‘একটি গণ্ডুষ জলে’র মত একটি কথায় জীবনের গণ্ডীর মধ্যে অসীম নেমে আসতে পারে।
উনি আবার কথাটার পুনরাবৃত্তি করলেন, “বল বল—কি চাও? তুমি যা বলবে আমি তাই করব।”
আমার শরীর মন জুড়িয়ে যাচ্ছে, আমি চন্দনের সুবাস পাচ্ছি—কি আর চাইবার আছে? আমি বললাম, “আমাকে আপনার কাছে থাকতে দিন।”
“সে আর মুশকিল কি? এখানে ভর্তি হয়ে যাও না। ভোরবেলায় আমি যখন বারান্দায় বসব তখন তুমি গন্ধরাজ ফুল নিয়ে এসে আমার সঙ্গে বসবে। সন্ধ্যাবেলায় কবিতা পড়া হবে। কিন্তু আমার লেখার সময় কোনো গোলমাল করবে না।”
শান্তিতে আমার মন ভরে গেছে, আমি ভাবছি এ তো স্বর্গের বর্ণনা, আমার জীবনে এ কখনো হবে না, বাবা আমায় কিছুতে এখানে ভর্তি করবেন না।
পরে সেদিন আমায় তিনি বললেন, “আজ তো তোমাকে ছেড়ে দিতে পারছি না— তুমি আজ রাতটা ভালো করে ভেবে দেখ, কাল আমায় বলো আমি কিছু করতে পারি কি না। এসব কথার তো দু’মিনিটে মীমাংসা হয় না…তোমার চলনদারের যদি তাড়া থাকে ছেড়ে দাও…নেপালবাবু কাল তোমায় পৌঁছে দিতে পারবেন।”
সেদিন রাত্রে নিচের ঘরে একলা শুয়ে ঘুম তো আর আসে না। চারিদিক নিঝুম। যতক্ষণ ভৃত্যকুল জেগে ছিল ততক্ষণ একটু একটু শব্দ, শক্তিপদ বা গণপতির গলা পাচ্ছিলাম, আস্তে আস্তে সব নীরব হয়ে গেছে। আমি ভাবছি ওকে কি বলব! উনি কি কিছু করতে পারবেন? পারবেন না কেন? উনি এজ সাহেবকে বলতে পারেন—“এই কন্যাটিকে আপনি ইউরোপে পৌঁছে দিন তাহলে আমারই কাজ করা হবে।” এজ সাহেব নিশ্চয় করবেন। তিনি সাধু সন্ন্যাসী যাই হোন, মানুষের দুঃখ বোঝেন। কিন্তু তা কি এঁরা পারেন? বাবাকে বাদ দিয়ে? ইনি রামানন্দবাবু এঁরা দুজনে যদি বাবাকে ডেকে বলেন, “দেখুন নরেনবাবু এই যা আপনি করেছেন এটা ঠিক নয়—-”তাহলে? তাহলে বাবার ব্রহ্মরন্ধ্র জ্বলে যাবে। বাবা বলবেন, “দেখুন রবিবাবু আপনি যখন আপনার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন তখন কি আমার সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন? আপনি খুব ভালো কবিতা লেখেন ঠিকই, কিন্তু আমার সংসারটা আমারই।” তখন? তখন কি রকম লাগবে? আমার জন্য কি উনি অপমানিত হবেন? তাছাড়া যাবই বা কোথায়? কার কাছে? এক বছর হয়ে গেছে সে একটি খবর দেয় নি—সেই যে এবাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল আর তার চিহ্ন নেই। খোকাকেও তো একটা চিঠি দিতে পারত? তাও দিল না। তবে? আমি কি উপাচিকা হব? সব সংস্কৃত কথাগুলো মনে পড়ছে—স্বৈরিণী, উপচিকা! ধিক্কারে আমার মন ভরে যাচ্ছে। যথেষ্ট হয়েছে। ইউরোপের মৃগয়াপটু নাগরিক, তোমার ঐ বিষাক্ত শর আমি তুলে ফেলব। তোমাকে ভুলব, ভুলব, ভুলব। আমি কাল সকালে ওকে বলব আমার জন্য কিছুই করবার দরকার নেই। আমার মন শান্ত হয়ে গেছে। আমাকে কবি শিখিয়ে দিয়েছিলেন যখন মন উদ্বিগ্ন হবে তখন বলবে-‘আনন্দম্ পরমানন্দম্ পরম সুখ পরমা তৃপ্তি’—আমি বার বার বলতে লাগলাম, চন্দনের সুগন্ধে আবার সেই অন্ধকার রাত্রি ভরে গেল। আমার বুকের ভিতর যে দগদগে ঘা-টা এই এক বছরে একটু শুখায়নি তার উপর চন্দনের প্রলেপ পড়ল। খোলা জানালাটা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখা যাচ্ছে—আমি ভাবছি এই তো কত সহজে ভুলে গেলাম। একদিন অধচৈতন্যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ভুলব না—আজ সজাগ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে স্থির করলাম ভুলব, ভুলবই। জ্বলজ্বলে তারাটা তাকিয়ে আছে—এ তারার চোখ আছে, তা হাসছে, হাসছে, এই অব্যবস্থিত মনের উপর কৃপাদৃষ্টি মেলে হাসছে।…
