ইতি–১৪ই শ্রাবণ, ১৩৩৮
এই চিঠি পাবার ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ ১৩৩৭ সালের ভাদ্র মাসের শেষের দিকে মির্চা চলে গেছে। হিন্দু নিয়ম অনুসারে ভাদ্র মাসে মানুষ দূরের কথা পশুকেও তাড়ান হয় না কিন্তু আমরা আধুনিক পরিবার ওসব কুসংস্কারে বিশ্বাসী নই।
চিঠিটা বহুবার পড়লাম। ভালো লাগছে তবু বিষাদে মন ছেয়ে আছে, আমার মনের যা অবস্থা এ চিঠি তার চেয়ে বহুদূরে। কলকাতায় ফিরে আমি খুব স্বাভাবিকভাবে চলছি। বাবা জানেন আমার মনে আর কোনো দাগ নেই কিন্তু মা এখন খুব চোখ খুলে আছেন। এখন বাড়ি শূন্য। শান্তি ও থোকা চলে গেছে, কাকা কাকীমাও, মির্চার ঘর খা খা করছে। ছোট্ট বোনটির জন্য একজন দক্ষ পরিচারিকা এসেছে, আমাকে আর বিশেষ কিছু কাজ করতে হয় না। সেদিন চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে আছি এসে ঘরে ঢুকলেন। আমি মাকে চিঠিটা দিলাম। মা পড়ে আমার হাতে ফিরিয়ে দিলেন।
আমরা মাতাপুত্রী বসে আছি—অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসছে। আমি বললাম, “মা আমি একবার শান্তিনিকেতনে যেতে চাই, পাঠিয়ে দেবে?”
মা বললেন, “আমিই তোকে কয়েকদিন থেকে বলব ভাবছিলাম। আমার মা খুব ভালো করে কথা বলতে পারেন। অনেক পণ্ডিত দেখেছি, পি. এইচ. ডি-ও কম দেখলাম না, কিন্তু মার মত করে হৃদয় দিয়ে বুঝতে ও কথা বলতে কম লোককেই দেখেছি।
সেদিন সেই সন্ধ্যার অন্ধকারে মা আমাকে কোলে টেনে নিয়ে বলতে লাগলেন, “রু তোমার জীবনে আশ্চর্য জিনিস তুমি পেয়েছ। এ সৌভাগ্য ক’জনের হয়? যে শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসা এ সংসারের সম্বন্ধের সঙ্গে জড়িত নয়, স্বার্থশূন্য, জাগতিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্বন্ধরহিত সে ভালোবাসার স্বর্গীয় রূপ ক’জন দেখতে পায়? ক’জনের জীবনে ঘটে? তোমার জ্ঞান হবার আগে থেকেই যেন তুমি প্রস্তুত হয়ে রয়েছ-পুষ্প যেমন আলোর লাগি না জেনে রাত কাটায় জাগি—তারপর প্রতিদিন তার কবিতায়, গানে, চিন্তায়, মননে তোমার মন উর্ধ্বমুখী হয়েছে। এ তো একটা তপস্যার ফল—নিজেকে ভেঙেচুরে ফেলে এ দুর্লভ সৌভাগ্যকে বিফল করো না। তুমি তার কাছে যাও, মনে কোনো দ্বিধা সংকোচ
করে সব তাকে খুলে বল। আমি যা বুঝতে পারছি চিঠিতে তুমি সংকোচ করে লিখেছ। এটা ঠিক নয়। তোমার যখন এমন জায়গা আছে যেখানে সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করতে পার, তোমার সুখদুঃখ পাপপুণ্য সমস্ত অকপটে বলে তুমি শুদ্ধ পবিত্র হয়ে যাও মা। তিনিই তোমাকে পথ দেখাবেন।”
“মা আমি একলা যেতে চাই।”
“নিশ্চয়।”
কিন্তু আমি মার কথা রাখতে পারলাম না। কোন্ তারিখে কার সঙ্গে আমি শান্তিনিকেতনে পৌঁছেছিলাম, সে সময়টা দুপুর না বিকেল তাও ঠিক মনে পড়ে না।
তার কাছে যখন আমি যাই সব সময়ই একটা দুর্গম পথ পার হতে হয়। বেন্টিঙ্ক স্ট্রীটের মোড় থেকেই আমার বুক ধড়ফড় করে। দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলির মোড়ে এসে দ্রুততর হয়। যতক্ষণ না আমি তার কাছে পৌঁছে কথাবার্তা শুরু করি ততক্ষণ রীতিমত হৃদরোগাক্রান্ত—পাহাড়ে উঠতে গেলে যেমন অবস্থা হয়। সেদিন শান্তিনিকেতনের পথটা দুর্গমতম হয়েছিল-মনে হচ্ছিল বাতাসে সব অক্সিজেন ফুরিয়ে গেছে।
আমি যখন তাঁর ঘরে ঢুকলাম তখন তিনি ইজিচেয়ারে বসেছিলেন, চারদিকে ছবি ছড়ানো তখন ছবি আঁকার যুগ চলেছে। উনি আমাকে হঠাৎ দেখে অবাক হন নি, আমি এমনি খবর না দিয়ে হঠাৎই আসি, বললেন “বৌমারা কেউ নেই, এখন আতিথ্যের জন্য গণপতিই ভরসা।”
আমি পায়ের কাছে বসে পড়লুম।
“তুমি ভূতুড়ে লেখাগুলো পড়বে?”—অর্থাৎ প্ল্যাঞ্চেটের লেখাগুলো। আমার তখন ভূতের দিকে মন নেই বর্তমানের উৎপীড়নেই অভিভূত।
“আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছি।”
“হ্যাঁ, আমি তোমার দুটো চিঠিই পেয়েছি। কি হয়েছে অমৃতা?”
আমি চুপ করে বসে আছি—আমার, মাথা হেঁট—আমি ওঁর ইজিচেয়ারের একটা অংশ ধরে আছি। কি করে বলি, কিই বা বলি। আর বলেই বা কি হবে, আমি কিছুতেই চাই না বাবার সঙ্গে এর মনোমালিন্য হয়ে যাক, তাহলে আমার সর্বনাশটা পুরো হবে।
উনি আমার হাতটা তুলে নিলেন, আমাকে সাহায্য করবার জন্য বলতে লাগলেন, “বল অমৃতা বল, কি হয়েছে?”
“আমাদের বাড়িতে সেই যে একজন ছেলে ছিল না…”
“কোন্ ছেলে?”
“আপনি তাকে দেখেছেন।”
“কে সে? আমি কোথায় দেখেছি?”
“এইখানে আমরা এসেছিলাম—”
“এইখানে এসেছিলে? কবে? তোমার কাকার কথা বলছ?”
“না, বাবার ছাত্র—”
“কোন্ ছাত্র? রবীন্দ্র সমিতির?”
“ন্না। বলছি…সেই যে আমরা টেনিসকোর্টের কাছে বেড়াচ্ছিলাম, আপনার মনে নেই?”
“ও হ্যাঁ, সেই সায়েব? তারপর কি হল?”
আমি সে কথার উত্তর না দিয়ে বললাম—“আপনি এতদিন চলে গেলেন কেন?”
উনি একটু হাসছেন, এ সব কথার উনি খুব ভালো উত্তর দিতে পারেন। সামান্য একটু কথা দিয়ে সুধাসিন্ধু বইয়ে দিতে পারেন। প্রত্যেক সম্পর্কের মাধুর্য বিকাশ করে অথচ তাকে এতটুকু বিপর্যস্ত না করে, যথাস্থানে রেখে, তার থেকে যতটুকু পাবার তা গ্রহণ করে, তার পূর্ণ মূল্য চুকিয়ে দিতে পারেন। কারণ একই সঙ্গে নির্মম দূরত্ব বজায় রেখে অন্তরের গভীরতম স্থানে পৌঁছবার আশ্চর্য কৌশল তাঁর জানা আছে—’থাক থাক নিজ মনে দূরেতে—আমি শুধু বাঁশরীর সুরেতে পরশ করিব তার প্রাণ মন’। এ একটা শিল্প এতে কারু ক্ষতি হয় না—কেউ ধ্বংস হয় না, শুধু তার জীবনের দীপটা উজ্জ্বলতর হয়।
“চলে গেলুম কেন? ছবি দেখাতে…ছবি দেখাতে…এদেশে তো কেউ ছবি দেখতে জানে না…তা তুমি তো বারণ কর নি, তাহলে না হয় নাই যেতুম।” উনি আমার মাথাটা একটু নেড়ে দিলেন। জানি এটা পরিহাস কিন্তু মধুর।
