কখনো বিপথে যদি ভ্রমিতে চাহে এ হৃদি
অমনি ও মুখ হেরি শরমে সে হয় সারা।
২.১ আমাদের অল্প বয়সে রবীন্দ্রনাথ
আমাদের অল্প বয়সে অর্থাৎ আমি যে সময়ের কথা লিখছি তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্ব পর্যন্ত তাকে সকলে অর্থাৎ বাঙালীরা ‘রবিবাবু’ বলত, ছোট বড় সকলেই। বিদেশে বলত তাগোর, তাগোরে বা টেগোর। আজকাল দেখি বাঙালীরাও ‘ট’ তে একট ‘য’ফলা লাগিয়ে বলে ট্যাগোর, এর চেয়ে শ্রুতিকটু উচ্চারণ আর নেই। ‘রবিবাবু’ও উপযুক্ত সম্ভাষণ নয়, তবু ঐটাই চল ছিল। কেউ কেউ রবিঠাকুরও বলতেন, রবীন্দ্রনাথ বলা অনেক পরে চালু হয়েছে। রামানন্দবাবু কবি বলতেন, আমি তার কাছ থেকে সেটা শিখেছিলাম। আমি জীবনেও তাকে গুরুদেব বলি নি। তাকে যে ‘গুরুদেব’ বলা হয় সেটা ধর্মগুরু হিসাবে নয়। তাকে তার বিদ্যালয়ের ছাত্ররা গুরু বলেছে শিক্ষককে যেভাবে গুরু বলা হত সেই অর্থে। তিনি ধর্মগুরু নন, শিক্ষক। সে অর্থে এ দেশের সকলেই তাকে গুরু বলতে পারে কিন্তু তার কবি পরিচয়টাই তিনি মনে করতেন সত্যতর। উনিশ শ’ ত্রিশ সালটা তিনি পুরোপুরিই প্রায় বিদেশে ছিলেন। শেষের দিকে রাশিয়া গিয়েছিলেন। রুশ পণ্ডিত বগদানফ একবার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, মনে হয় তিনি বাবার কাছে কবির রুশদেশে যাওয়া সম্বন্ধে কোনো বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন, বাবাও রুশদেশ থেকে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন কিন্তু সরকারী অনুমতি পান নি। একটা গল্প তিনি প্রায়ই করতেন—যখন তিনি ইংলণ্ডে থাকতেন, তখন একজন উচ্চপদস্থ রুশ কর্মচারী তাকে নিমন্ত্রণ করে ভোজ খাওয়াতেন, বাবাও বুঝতে পেরেছিলেন তার কোন উদ্দেশ্য আছে। অবশেষে একদিন রুশ কর্মচারিটি অনুরোধ জানালেন যে বাবা যেন তার সঙ্গে ভারতীয় বিপ্লবীদের যোগাযোগ করিয়ে দেনকারণ স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতকে সাহায্য করবার উদ্দেশ্য তাদের আছে। প্রত্যুত্তরে বাবা তাকে বলেন যে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন ঠিকই যদি তিনি বলতে পারেন যে তাদের সাহায্যে ইংরাজকে তাড়াবার পরে কার সাহায্যে আমরা তাদের তাড়াব? বলা বাহুল্য, সেই রুশ কর্মচারী এর সদুত্তর দিতে পারেন নি। এই গল্পটা খুব গর্বভরে বলতেন বাবা, কোনোরকম রাজনৈতিক কাজকর্মের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না। বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চাই তার জীবনের উদ্দেশ্য।
রবীন্দ্রনাথ দেশে ফিরে এসেছেন প্রায় আট-ন মাস। এর মধ্যে তার সঙ্গে দু একবার দেখা হয়েছে কিন্তু কোনো কথা বলবার সুযোগ হয় নি। যখনই আমি গিয়েছি, বাবার সঙ্গে গিয়েছি নয়ত সেখানে কেউ উপস্থিত আছেন। নবীন’ নামে নৃত্যোৎসব কলকাতায় মঞ্চস্থ হল, সেই সময় আমি দুদিন জোড়াসাঁকোয় গিয়েছি। কিছু বলা হয় নি। ঋষিকেশ থেকে ফিরে আমি তাকে একটা চিঠি লিখলাম। চিঠিতে কি লিখেছিলাম তা আমার একেবারেই মনে নেই। কিন্তু আমার মানসিক অবস্থার একটা আভাস দিয়েছিলাম মাত্র। খুলে কিছু লেখবার আমার সাহস হয় নি, লজ্জাও ছিল। সাহস হয় নি কারণ উত্তরটা যদি বাবা দেখতে চান তাহলে তো জানতে পারবেন।
এইখানে কবির সঙ্গে বাবার সম্পর্কটা একটু বলি। বাবা রবীন্দ্রকাব্য ভালো করে পড়েছেন, কাব্য ব্যাখ্যায় তিনি পারঙ্গম। কবির সম্বন্ধে তার আকর্ষণ গভীর এবং প্রবল, তা সত্ত্বেও তারা দুজনে সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্র। সেজন্য তাঁর কবির প্রতি বিরূপতাও যথেষ্ট—অপর পক্ষে কবিও যে বাবার প্রতি খুব অনুকূল তা নয়। এমন অবস্থায় আমার বিপদটা অনুমেয়। বাবা জানেন আমি তার কাছে সহজে পৌঁছতে পারি। তিনি আমার প্রতি অনুকূল। কাজেই আমি যখন কোনো চিঠি লিখি তখন বাবা চান তার মধ্যে তিনি তার নিজের কথাটাও লিখে দেবেন, আমার চিঠি আর আমার চিঠি হয়ই না। এ আমার আর এক কষ্ট। ছোটবেলা থেকে এই কষ্ট পাচ্ছি আমি। বাবা বলে দেবেন, আমি চিঠি লিখব, তারপর বাবা তার বানান শুদ্ধ করবেন, ভাষা শুদ্ধ করবেন, ভাব ঢোকাবেন— তারপর সে চিঠি যাবে এবং উত্তর এলে বাবা তার সমালোচনা করবেন; এ বন্দীদশা সহ্য হয়? কবি একবার আমাকে হেসে বলেছিলেন, “তুমি যখন আমায় চিঠি লেখ তখন দর্শনশাস্ত্র না লিখে তোমার মনে সহজভাবে যা আসে যদি লেখ তাহলে ভালো হয়।” আমি জানি দুচারটে বানান ভুল থাকলেও তার খারাপ লাগবে না। তার অন্য ভক্তদের যে স্বাধীনতা আছে আমার তা নেই। আমি তো ইচ্ছে করলে তার কাছে যেতেও পারি না।
এবারে আমি কাউকে না দেখিয়ে তাকে চিঠি লিখলাম। যথাসময়ে অর্থাৎ চিঠি পাবার দুদিন পরই যে উত্তরটা পেয়েছিলাম তা এখানে তুলে দিচ্ছি—
কল্যাণীয়াসু,
তোমার চিঠিতে যে বেদনা প্রকাশ পেয়েছে তাতে আমি অত্যন্ত পীড়া বোধ করলুম। জীবনের সঙ্গে সংসারের যদি অসামঞ্জস্য ঘটে তবে সেটা সহজে সহ্য করে ধীরে ধীরে সুর বেঁধে তোলা তোমার বয়স ও তোমার অভিজ্ঞতায় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তোমাকে কি পরামর্শ দেব ভেবে পাইনে। নিজের অল্প বয়সের কথা মনে পড়ে, তীব্র দুঃখে যখন দিনগুলো কণ্টকিত হয়ে উঠেছিল তখন কোনোেমতে সেগুলো উত্তীর্ণ হয়ে যাবার রাস্তা পাই নি। মনে করেছিলাম অন্তহীন এই দুর্গমতা। কিন্তু জীবনের পরিণতি একান্ত বিস্মৃতির ভিতর দিয়ে নয়, দিনে দিনে বেদনাকে বোধনার মধ্যে নিয়ে গিয়ে কঠোরকে ললিতে, অম্লতাকে মাধুর্যে পরিপক্ক করে তোলাই হচ্ছে পরিণতি। তোমার যে তা ঘটবে না তা আমি মনে করিনে—কেননা তোমার কল্পনাশক্তি আছে, এই শক্তিই সৃষ্টিশক্তি। অবস্থার হাতে নিস্ক্রিয়ভাবে নিজেকে সমর্পণ করে তুমি থাকতে পারবে না—নিজেকে পূর্ণতর করে তুমি সৃষ্টি করতে পারবে। আমি জানি আমাদের দেশের পক্ষে উদার শক্তিতে আত্মবিকাশ সহজ নয়–বাইরের দিকে প্রসারতার ক্ষেত্র তাদের অবরুদ্ধ-অন্তরলোকে প্রবেশের যে সাধনা সে সম্বন্ধেও আনুকূল্য তাদের দুর্লভ। তবু তুমি হতাশ হয়ো না নিজের উপর শ্রদ্ধা, রেখ, চারিদিক থেকে আপনাকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে সেই গভীর নিভৃতে নিজেকে স্তব্ধ কর যেখানে তোমার মহিমা তোমার ভাগ্যকেও অতিক্রম করে। তোমার পীড়িত চিত্তকে সান্ত্বনা দেবার শক্তি যদি আমার থাকত তাহলে চেষ্টা করতুম। কিন্তু একান্তমনে তোমার শুভকামনা করা ছাড়া আমার আর কিছু করবার নেই। যদি বাহিরের কোনো ক্ষুদ্রতা তোমাকে পীড়ন করে থাকে তবে তার কাছে পরাভর স্বীকার করতে লজ্জা বোধ করো।
