বাবা, মা এগিয়ে যেতে আমি সেই জজসাহেব সাধুর কাছে গিয়ে বললাম—“আপনি তো কথা বলেন না, কিন্তু আপনারা তো সাধু-জগতের দুঃখকষ্ট দূর করাও তো আপনাদের কাজ। ঐ গুহায় যে সাহেব ছিল তার কথা একটু বলবেন? তার নাম কি মির্চা?”
সন্ন্যাসীর মুখে রেখাপাত হল না। অনিমেষ দূরবদ্ধ দৃষ্টিতে কোনো ভাব নেই। আমি কাঁদতে লাগলাম—“বলুন না, বলুন আমার বড় জানা দরকার। একটা কথা বললেই কি আর আপনার সাধনা নষ্ট হয়ে যাবে?” কোনো ফল হল না। আর একজন আগন্তুক এসে পঁড়িয়েছে—সে এ ব্যাপার দেখে অবাক হয়ে গেছে। হঠাৎ এই বনের মধ্যে জটাধারী গুহাবাসীর কাছে বসে সুন্দরী তরুণীর রোদনের দৃশ্য তাকে খুবই অভিভূত করেছে—মানুষের উপর সম্পূর্ণ নির্দয় হয়ে ওঠার মত উপযুক্ত সিদ্ধিলাভ তার তখনো হয়নি। সে বললে, “মৎ রোইয়ে, মৎ রোইয়ে—কারণ যতই না কেন তুমি কাঁদ উনি কিছুতেই কথা বলবেন না। তুমি কি জানতে চাও মা?”
“ঐ গুহায় যে সাহেব ছিল তার নাম কি?”
“নাম তো জানি না। সাধুসন্ন্যাসীদের নাম কে জিজ্ঞাসা করে?”
“তুমি তাকে দেখেছ?”
“হ্যাঁ।”
“দেখতে কি রকম?”
“সাহেবের মতো?”
“সাহেবের মতো মানে?”
“মানে ফর্সা।”
“কতটা লম্বা, চোখে চশমা আছে?”
লম্বা সে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল। চোখে চশমা আছে কিনা সে বলতে পারে না। আমি ফিরে ঐ গুহায় গিয়ে ঢুকলাম। চারিদিকে দেখছি কোথাও নাম লেখা আছে কিনা, কিছু লিখে রেখে গেছে কিনা। তন্ন তন্ন করে দেখছি। আমার বুক ধড়ফড় করছে, যেন দেওয়ালের গায়ে নামটা দেখলেই ওকে দেখা হবে। আমি পাগলের মতো খুঁজছি, এক্ষুনি মা বাবা এসে পড়বেন। কোনোেখানে কিছু লেখা নেই। বাংলা অক্ষরে কয়েকটা অঙ্ক কষা আছে। আবার আমার বুদ্ধি ও নির্বুদ্ধিতে লড়াই লেগেছে। নির্বুদ্ধি বলছে, এ তো ইচ্ছে করে আমায় কষ্ট দেওয়া—এখানে একটা নাম কি লিখে যেতে পারত না? তাতে তো আর বাবা ওকে বকতেন না—এটুকু করতে কি হত? আর বুদ্ধি বলছে—বা রে, সে কি করে জানবে তুমি এখানে আসবে? এজন্য অত উতলা হবার কারণ কি? অত রাগই বা করছ কেন? কিন্তু আমি অভিমানের সমুদ্রকে শাসন করতে পারছি না। তার তরঙ্গ উত্তাল হয়েছে আমার কি শক্তি আছে, কি সাধনা আছে, যে এর সঙ্গে লড়াই করব? এখানে যে একটা নাম লেখা নেই সেটা ইচ্ছা করেই করা হয়েছে, আমার সঙ্গে সম্বন্ধচ্ছেদ করবার জন্যই করা হয়েছে…আর কিছু নয়। দূরে গাইডের সঙ্গে বাবা কথা বলছেন গলা পাওয়া গেল, আমি বেরিয়ে জজ সাধুর কাছে বসলাম। এ লোকটা কথা বলে না ভালই, নইলে বাবাকে বলে দিত।
আমরা রাস্তা পেরিয়ে ঘাটের দিকে চলেছি। নৌকায় অনেক ভীড়। দড়ি ধরে বসতে হয়। কিছুদিন আগে পাথরে ধাক্কা খেয়ে নৌকা উল্টে ত্রিশ জন লোক মারা গেছে—এ নদীতে নাকি একবার পড়লে আর রক্ষা নেই। এত স্রোত যে অত্যন্ত বেগের সঙ্গে পাথরে পাথরে ধাক্কা লেগে লেগে মুহূর্তের মধ্যে মানুষের শরীর চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আমি নৌকার কিনারে বসেছি। ডান হাত বাড়িয়ে জল ঠুচ্ছি। আর মনে হচ্ছে নাম না লিখে যাওয়ার উপযুক্ত শাস্তি দেবার এই সময়। আমি যদি এখানে পড়ে যাই মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যাব। আমি তো কৃচ্ছসাধন করতে পারিনা, এবার একটা চূড়ান্ত শারীরিক কষ্ট পেয়ে দেখাই যাক না, উপযুক্ত শাস্তি হবে তাহলে। কি করে উপযুক্ত শাস্তি হবে? সে তো টেরই পাবে না—টেরপাবে না আর কি! বাবা যা একখানা চিঠি লিখবেন, এক নম্বর মেলডি স্ট্রীটে সেই মহাশয়টি সে চিঠিখানা পড়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে। বাবা লিখবেন, “তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম, আশ্রয় দিয়েছিলাম, অন্ন দিয়েছিলাম, শিক্ষা দিয়েছিলাম। পরিবর্তে তুমি আমায় মৃত্যু দিয়েছ, তোমার প্রতি স্নেহই আমার সেই ছিদ্র যে-পথে শনি হয়ে প্রবেশ করে তুমি আমার সংসার ধ্বংস করেছ।” আর মা বাবা দুজনেরই উপযুক্ত শিক্ষা হবে। প্রতিহিংসার উল্লাস আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ মা বললেন, “রু একটু সরে বোস, ও কি অত ঝুঁকছিস কেন?”
আমি কল্পনা করছি মীলুকে; ও মাথা কুটে কুটে কাঁদবে। দিদিমা, শান্তি, খোকা সকলকে মনে পড়ছে। ঠাকুমা বলতেন, ঠিক মৃত্যু সময়ে সকলের মুখ মনে পড়ে, আমার তাই হয়েছে নিশ্চয়, সকলকে মনে পড়ছে। সকলকে? হঠাৎ আমার কোনো মানুষ নয়—ভবানীপুরের আমার ঘরের দেওয়ালে যে ছবিটা টাঙান আছে, মখমলের টুপি পরা—যে ছবির দৃষ্টি তুমি যেদিকেই যাও তোমাকে অনুসরণ করে ফিরবে, সেই ছবিটা দেখতে পেলাম। সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমায় বলছে “ছিঃ তুমি এই? এত অল্পে পরাজিত হয়ে গেলে? তাহলে আমার গান তোমার জন্য নয়।” আমি যেন মোহাচ্ছন্ন অন্ধকার থেকে মুখ বাড়িয়ে সকালের আলো দেখতে পেলাম। বাবা হাত বাড়িয়ে আমাকে টেনে নিলেন, “সরে আয়, অত ধারে কেন?” আমি যে বাবাকে শিক্ষা দেব বলে ঝাঁপ দিতে চাইছিলাম তারই গলা জড়িয়ে বুকে মাথা রেখে কাঁদতে লাগলাম।
মা খুব ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, বলতে লাগলেন, “ও আবার কাদে কেন?” বাবা বললেন, “চারিদিকে সুন্দর দৃশ্য সুন্দর জায়গা দেখলে বরাবরই ওর চোখ দিয়ে জল পড়ে।” বাবা সবটা হাল্কা করে দিচ্ছেন—আর পারছেন না ওরাও—এ শোকভার সহ্য হচ্ছে না।
আমরা হরিদ্বারে ফিরে এলাম। বাংলোর বারান্দায় বসে আছিনদীর শব্দ শোনা যাচ্ছে—কল্লোলিনী নদী, এদেশের প্রাণবহা পুণ্যসলিলা গঙ্গার ধারা আমাকে ধুইয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আমি চোখ বুজে ভাবছি এতদিনে ঐ গানটার মানে বুঝলাম—
