আত্মীয়স্বজন, ছেলেমেয়ে, ভৃত্যকুল নিয়ে একটি বিরাট দল আমরা কাশী গেলাম। সেখান থেকে মা, বাবা, আমি ও আমার সদ্যজাত শিশু ভগ্নীটিকে নিয়ে দিল্লী, আগ্রা হয়ে ঋষিকেশ লছমনছোলা যাব। ঋষিকেশ যাব ভেবেই আমার মনটা আনন্দে ভরে গিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন ওখানে গেলেই ওর সঙ্গে দেখা হবে—অথচ আমি তো জানি, ও দেশে চলে গেছে। তবে এমন মনে হচ্ছে কেন? যুক্তির নাগালের বাইরে যেসব ভাব আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে এও তার একটি। আমাদের ভ্রমণের অন্য কোনো অংশ আমার মনে নেই শুধু হরিদ্বার ও ঋষিকেশ ছাড়া। হরিদ্বার থেকে একটা মোটর ও একজন গাইড যোগাড় করে আমরা স্বর্গদ্বারের দিকে রওনা হলাম। এই প্রথম হিমালয়ের আশ্রয় পেয়েছি—দেবতার আশ্রয়ের মতো তার নিশ্চিন্ত শান্তি। সমুদ্রের বাতাসের প্রভাব আছে মনের উপরে কিন্তু পাহাড়ের মতো নয়। চারধারে বড় বড় সোজা সোজা গাছ, এদের নাম জানি না। নদীর এত গতি কখনো দেখি নি—বাতাসের এমন সুখস্পর্শ আগে কখনো পাই নি। আমার বুকের ভিতর সবগুলি ফুলিঙ্গের উপর ঠাণ্ডা বাতাস লাগছে, মনে হচ্ছে আগুনটা নিবে যাবে! মির্চা এখানে এসে ভালোই করেছিল। বাতাস শুধু তো ঠাণ্ডা নয়–বাতাসে আরো কিছু আছে। কি আছে? হিমালয় নামে নগাধিরাজের কি মহিমা আমি কি জানি? আমি তো আগে কখনো ভাবতেই পারিনি প্রকৃতি মানুষের মনকে শান্ত করতে পারে। শকুন্তলা পদ্ম-পাতায় শুয়েছিল—আমি ভাবতাম কবিত্বের মধ্যেও একটা সম্ভবপরতা থাকা চাই—আমাকে পদ্মফুল দিয়ে কবর দিলেও শান্তি পাব না।
আমরা একটা সমতলভূমি দিয়ে চলেছি। দুধারে শণবন, গাড়ির মাথার চেয়েও উঁচু, সেটা ঠিক কোন্ জায়গা পরে আর চিনতে পারি নি। হঠাৎ গাড়ি বিগড়ে গেল। মা আর আমি তো রোরুদ্যমান শিশুটিকে নিয়ে বিব্রত—এমন সময় গাইড হঠাৎ বললে, এই শণের বনে শের থাকে। আমি আবার হিন্দী বিদ্যায় একেবারে অজ্ঞ—আমি ভাবছি ‘সের তো ওজন, এখানে যে ‘শের’ থাকে, সে বস্তুটা কি? বাবা আঁতকে উঠেছেন—“কি সর্বনাশ। শের, থাকে। তবে এখানে আনলি কেন রে হতভাগা।” বাবা যত রেগে উঠছেন গাইড তত নির্বিকার মুখে বলে যাচ্ছে—“মৎ ঘাবড়াইয়ে” শেরেরও তো প্রাণের ভয় আছে—আমরা হর্ন বাজালেই পালিয়ে যাবে।
আমি মনে মনে ভাবছি-দেখ আমরা এতজন আছি তবু ভয় পাচ্ছি—এখানে একলা একলা ঘুরতে লাগবে কেমন? হাসির কথা নয় মোটেই। স্বর্গদ্বারে গিয়ে আমরা নৌকায় ওপারে গেলাম—এই প্রথম আমি পার্বত্য নদী দেখলাম, এর পরে তো তারই তীরে জীবন কাটিয়েছি। ঢালুর উপর দিয়ে বয়ে আসছে বলে সে প্রবলা, পাথরে পাথরে ঘা খেয়ে খেয়ে তার স্বচ্ছ জলরাশি ঘূর্ণমান, কখনো ঊর্ধোঙ্খিত চূর্ণীকৃত। মুখে চোখে এসে বিন্দু বিন্দু ঠাণ্ডা জল লাগছে। বাবা এক অঞ্জলি ভরে পান করলেন। আমরাও করলাম, কি অপূর্ব স্বাদ! অমন মিষ্টি প্রাণ জুড়ানো জল আগে কখনও খাই নি, এ যে অলকানন্দা! আমরা তো স্বর্গে পৌঁছে গেছি—স্বর্গের দরজা পার হলাম—আমি মুখে চোখে জল দিয়ে নদীর বন্দনা করলাম—সুরনর-নিস্তারিণী পাপতাপনিবারিণী পতিতপাবনী সাগরগামিনী গঙ্গে—স্বাভাবিকভাবে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে কবিতা বলায় বাবা খুশি—“বল বল সবটা বল”—আমরা ওপারে এসে পৌঁছেছি। পাহাড়ে পায়েচলা পথ দিয়ে আমরা এগুচ্ছি—ছোট্ট বোনটাকে একবার মা নিচ্ছেন, একবার আমি। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছোট ছোট গুহার মতন আছে—গাইড বললে ওখানে বসে সাধুরা তপস্যা করেন। এক একটা গুহায় এক একজন বসে আছেন–নানা রকম আসনে পদ্মাসনেই বেশি। কেউ ছাইমাখা জটাধারী, কেউ মুণ্ডিতমস্তক—দু’একজন সন্ন্যাসী হাতে কমণ্ডলু ঝুলিয়ে, কেউ বা ত্রিশূল নিয়ে পথ ধরে এদিক ওদিক যাচ্ছে। এদের খাবার দিয়ে যায় কালীকম্বলিওয়ালার ধর্মশালা থেকে, বিনা মূল্যে। পুণ্যলোভী ধনী ব্যক্তিরা চমৎকার ব্যবস্থা করেছেন, যারা ঘোরাফেরা করেন তাঁরা গিয়ে খেয়ে আসেন, আর যারা ধ্যানাসনে বসে আছেন তাদের খাবার দিয়ে যায়। আমরা এগিয়ে চলেছি এমন সময় গাইড একটা গুহা দেখিয়ে বলল-এইখানে একজন সাহেব ছিল, কিছুদিন, সে চলে গেছে। গুহাটি খালি। বাবা দাঁড়িয়ে গেলেন। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ল, “সে-ই নিশ্চয়, একেই বলে কর্মফল। এল পড়াশুনো করতে তা নয়, বনেরাদাড়ে ঘুরে দেশে ফিরে গেল।” বাবা বকতে বকতে এগোচ্ছেন, আমি বুঝতে পেরেছি তার মন কেমন করছে। তিনি ওকে ভালোবাসতেন। তার পক্ষে যতটা ভালোবাসা সম্ভব। তা বাসতেন। আমার জন্যই এমনটা হল। বাঃ, কে আগে খেলা শুরু করেছিল? আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করছি। কিন্তু আমার মনে পড়ছে না এর আরম্ভটা কোথায়—শেষ কোথায় তা তো জানি। জানি কি?
বড় বড় গাছের ছায়াঢাকা পাথুরে বন্ধুর পথ—আমরা সারিবদ্ধ এগোচ্ছি—এর পরের গুহাটায় একজন সাধু বসে আছেন একটা ছোট লাঠির উপর থুতনিটা রেখে। তার চোখ বড় বড়, দৃষ্টি দূরে নিবদ্ধ। মুখ দেখে বোঝা যায় এতক্ষণ যে সব সাধু দেখেছি তার চেয়ে ইনি অন্যরকম। গাইড বলল, ইনি একজন বাঙালী জজ ছিলেন—ঈশ্বরের আহ্বান শুনতে পেয়ে সব ছেড়ে এখানে চলে এসেছেন দুবছর। ইনি কোথাও যান না। দুদিন অন্তর একবার খান। একটিও কথা বলেন না। ঘুমোতেও কেউ দেখে নি, এইরকম বসে থাকেন। কৃচ্ছ্রসাধনের কথা শুনলেই আমার খুব ভক্তি হয়—আমি যে একটুও কৃচ্ছ্রসাধন করতে পারি না। আমি মনে মনে ভাবছি পাশের গুহায় যে সাহেব ছিল সে মির্চা কিনা এর কাছ থেকে জানতে হবে। স্বর্গদ্বারের এই জঙ্গলে তো আর দলে দলে সাহেব ঘুরে বেড়াচ্ছে না। আমি ঐ জজ সন্ন্যাসীর গুহার সামনে হোঁচট খেলাম। আমার পায়ে লাগল। আমি বাবাকে বললাম, “তোমরা একটু এগিয়ে যাবে তো যাও, আমি এখানে অপেক্ষা করি, আমার পায়ে লেগেছে।”
