“কি মন্ত্রটা কি?”
“আমি তো ঠিক বুঝলাম না ওটা মন্ত্র কি করে হবে—কোনো মন্ত্রর মত তো শোনাচ্ছে।, কিন্তু তোর বাবা বললেন, ওটা বিবাহের মন্ত্র—অবশ্য তিনি যখন বলছেন—”
“কথাটা কি?”
“–in sickness and in health…”
“এ আবার কি মন্ত্র—এ আমি কোনো দিন শুনিই নি।” মা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। অনেক পর আমার মনে পড়েছে আমি একটা সিনেমায় ঐ মন্ত্রটা লেখা দেখেছিলাম—তখন নীরব সিনেমা ছিল। তার অর্থ—সুখে দুঃখে রোগে স্বাস্থ্যে পরস্পরকে অতিক্রম করব না till death do us part—সেইটা হয়ত অজ্ঞাতসারে বলে থাকব। জ্ঞাতসারে ঐ মন্ত্র আমি কখনো ভাবি নি। ব্যাপারটা কিছুই তাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু মা ঐ কথাটার আশ্রয় চেয়েছিলেন—আমার এত কষ্ট-মির্চার এত কষ্ট সেটা উপেক্ষা করা যায় কিন্তু একটা যদি মন্ত্র পাঠ হয়ে থাকে সেটা অনতিক্ৰমণীয়—মানুষ কিছুই নয়, অনুষ্ঠানই সব। এই ছিল আমাদের দেশ। হয়ত এখনও আছে।
কিন্তু মা যে সত্যই অনুষ্ঠানের এত মূল্য দেন বা গোড়ামীতে ভরা এ কথা ভাবলে তার প্রতি অবিচার করা হবে, তা নয়–কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাবার সঙ্গে লড়াই করবার একটা হাতিয়ার খুঁজছিলেন, এই মাত্র।
যখন আমার সাত বছর বয়স আর সাবির দুই-তখন ঠাকুমা, মা, আমরা দুই বোন ও চাপাপিসি আমরা দু বছর পুরীতে ছিলাম, বাবা তখন বিলাতে। একদিন জগন্নাথের মন্দিরে গর্ভগৃহের সামনে দাঁড়িয়ে আছি—সেদিন কোনো পুণ্য দিবসলোকের ভীড়— চারিদিকে ঠেলাঠেলি—হঠাৎ একজন মধ্যবয়সী বিধবা ও তার সঙ্গে পনের-ষোল বছরের একটি ছেলে আমাদের দিকে এগিয়ে এল-সোজা আমাদের কাছে এসে সাবির হাতে একটা মিষ্টি ও আমার গলায় একটা ফুলের মালা পরিয়ে দিয়ে বললে, জগন্নাথ সাক্ষী তোমাকে মাল্যদান করলাম তারপর ভীড়ের মধ্যে দ্রুত চলে গেল মাতা পুত্র। ঠাকুমা চিৎকার করে উঠলেন, “কেডারে, কেডারে” —তারপর ভিড়ের মধ্যে খুঁজতে গেলেন। মা আমার গলা থেকে মালাটা টান মেরে ফেলে দিয়ে খুব শান্তভাবে বাড়ির দিকে এগিয়ে চললেন আমাদের নিয়ে। ঠাকুমা কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসেছেন, উদ্ভ্রান্ত—“ও বৌমা, কি সর্বনাশ হইল, জগন্নাথ সাক্ষী কইল যে!”
“চুপ করুন। কোন্ পাগলে কি বলেছে তাতে কি হবে, জগন্নাথ কারু প্রলাপ শোনে না।”
“ও বৌমা”, ঠাকুমা কপালে করাঘাত করছেন, “আজ যে অমুক তিথি”—
“আপনি একেবারে চুপ করুন। আর একটিবারও একথা বলবেন না। আমি তাহলে কালই কলকাতা চলে যাব।” পরে মা আমাকে বলেছিলেন, ওদের হয়ত কোনো মানত ছিল জগন্নাথের সামনে অমুক তিথিতে কোনো কুমারী কন্যাকে মাল্যদান করবে। অদ্ভুত এই দেশ! বিচিত্র তার সংস্কার যা বুদ্ধিমান মানুষকেও নির্বোধ করে তোলে।
অন্তরের দিক থেকে মা কতখানি সত্যাশ্রয়ী ও সংস্কারমুক্ত ছিলেন তার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তার একটি কাজে তা বোঝা যাবে। এরকম কাজ আজও এদেশে কম মেয়েই পারবে।
১৯২৪ বা ২৫ সালে আমার বয়স তখন দশ, আমরা কালীঘাটে একটা বড় বাড়িতে ছিলাম। সে বাড়ির দুপাশে দুটো দারোয়ানের ঘর ছিল। একটা ঘরে আমাদের দুর্দান্তপ্রতাপ দারোয়ান সুরজপাল থাকত। একদিন দেখি সে বিমর্ষভাবে তার জিনিসপত্র বার করে অন্য ঘরে যেখানে দুটি ভৃত্য থাকে—তাদের সঙ্গে রাখছে। “দারওয়ান এ ঘর খালি করছ কেন?”
“মাজি কা হুকুম।”
“কেন? কার জন্য?”
“মহারানীকা বাস্তে।” অনেক জিজ্ঞাসার পর জানলাম পঁচি হচ্ছে সেই মহারানী। পঁচি আমাদের বাসন মাজার ঠিকা-ঝি। কয়েক দিন আগে মাকে দেখেছি তাকে খুব বকছেন আর সে মার পা ধরে কাঁদছে। সেই পাচির জন্য দারোয়ানকে ঘর ছাড়তে হল—আমি ভাবছি ও হয়ত কান্নাকাটি করে আদায় করেছে। অবিচারের বিরুদ্ধে আমি সর্বদাই সংগ্রামী তাই আমার রাগ হচ্ছে, আশ্চর্যও লাগছে—দারোয়ান এ রহস্যভেদ করতে নারাজ। তাই আমার সমস্ত রকম জ্ঞানদায়িনী ঠাকুমার কাছে গেলাম—ঠাকুমারও সমস্ত অভিযোগ জানাবার জায়গা আমি—তার ধারণা বাড়ির মধ্যে কেবল আমিই আঁকে ভালোবাসি। “ঠাকুমা তুমি কাঁদছ কেন?”
“এ বাড়িতে আর থাকব না খুকি—এ বাড়ি অপবিত্র হয়ে গেছে—”।
“কি হয়েছে ঠাকুমা, কি হয়েছে?” আমি তার গলা জড়িয়ে ধরলাম, “তুমি চলে গেলে আমিও চলে যাব।”
“ঐ পাচি-সাত বাড়ি কাজ করে বেড়ায়, কোথা থেকে পাপ এনেছে—ওটা পাপিষ্ঠা, ওর সঙ্গে এক বাড়িতে থাকলে চৌদ্দ পুরুষ নরকে যায়—তা তোর মা দয়ায় গলে গেছেন—ওকে দারোয়ানের ঘরে রাখবে—ওর সেবা করবে। আর তোর বাবা হয়েছে বৌয়ের ভেড়য়া। বৌ যা বলবে তাই-মা কেউ নয়।”
বাবাকে হঠাৎ ভেড়া কল্পনা করে আমার খুব হাসি পেল…কিন্তু পঁচি কেন পাপিষ্ঠা, কি কি পাপ করেছে তা জানবার জন্য ঠাকুমাকে অতিষ্ঠ করে তুললাম। ঠাকুমা মার ভয়ে বলতে নারাজ—তা আমার সঙ্গে পারবেন কেন—আর তার নিজেরও যথেষ্ট বলার ইচ্ছা। “ওর যে সন্তান হবে—বিধবার সন্তান হওয়া মহাপাপ, তার ছায়া মাড়ানোও পাপ।” আমি মার কাছে গিয়ে বললাম, “মা পাচির কেন সন্তান হবে? বিধবার সন্তান হওয়া মহাপাপ—তাকে তুমি এ বাড়িতে রাখবে কেন?”
মা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছেন, “তোমাকে এসব বলল কে? ঠাকুমা নিশ্চয়।” খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে মা বললেন, “রু, ছেলে হওয়া তো মানুষের হাতে নয়, তাই না? ভগবানের কাজ। মানুষ কি মানুষ বানাতে পারে? বিধবার সন্তান না হওয়াই উচিত কিন্তু ভগবানও মাঝে মাঝে ভুল করে ফেলেন, তখন মানুষের বড় কষ্ট হয় মানুষের কষ্ট হলে, বিপদ হলে, মানুষকে সাহায্য করতে হয়। সেটা কখনো অন্যায় নয়।”
