সেবারে আমার পরীক্ষার বিষয় বলতে গেলে একটা কথা আজকের দিনে বিশেষ করে মনে হয় যখন দেখি মা বাবাও সন্তানের জন্য প্রশ্নপত্রের সন্ধানে ঘোরেন, জালজুয়াচুরিতে দ্বিধাহীন হন।
আমি যে পরীক্ষা দেব সেটা আগে থেকে ঠিক ছিল না বলে বাবা সংস্কৃত প্রশ্নপত্র করেছিলেন কিন্তু পরে আমি পরীক্ষা দেওয়ায় পরীক্ষকের পদ ছেড়ে দিলেন। প্রশ্নপত্র বাবাই করেছিলেন, আমাকে পড়িয়েছিলেনও তিনিই, কিন্তু কিছুমাত্র বুঝতে পারিনি প্রশ্নে কি আছে–। পরীক্ষা দিয়ে আসার পর বাবা খুব হাসছেন-“কি আগেকিছু বুঝতে পারিস নি তো?” আজকের দিনে এটা হয়ত অসম্ভব আষাঢ়ে গল্প শোনাবে। তখনকার দিনে বাপ-মা’রা চাইতেন যে ছেলেমেয়েরা যেন লেখা-পড়া শেখে, এখন চান শুধু ডিগ্রী! দেশের এ একটা পরিবর্তন বটে!
নয় দশ মাস কেটে গেছে কিম্বা এক বছর, এর মধ্যে আমি ওর কোনো খবর পাইনি। খোকাও আসে না। ওর বইয়ের দোকানে গিয়েও আর ওকে ধরা আমার হয় না। আমার ছোট একটি বোন হয়েছে। কাকারা চলে গেছে, বাবার সঙ্গে খুব ঝগড়া করেছে—মুখোমুখি নয়, সে সাহস তার হয় নি, সে মাকে বকাবকি করেছে—মা স্বামীর পক্ষ নিয়ে ঝগড়া করেছেন। আমারও কাকার উপর রাগ হয়েছে, আমিও ঝগড়া করেছি। কাকীমা তো বাপের বাড়ি গিয়ে বসে আছে নাগালের বাইরে। কাকার রাগের ভিতরের কারণটা কি তা আমি বুঝতে পারি নি কিন্তু এরকমভাবে চলে যাওয়ায় আমার দুঃখ হয়েছে খুবই। কাকাকে এত ভালোবাসতাম, প্রতিজ্ঞা করেছি কোনদিন আর তার মুখ দেখব না।
মা বললেন, সংসারটা ভাঙতে শুরু করল। আত্মীয় পরিজন আশ্রিত অতিথি সবাইকে নিয়ে যে সাজান সংসারটা গল্পে হাসিতে কবিতায় উল্লাসে গত একবছর ঝলমল করছিল মা তো সেখানে রাজেন্দ্রাণী, একে একে যেন এক একটা বাতি নিবে যাচ্ছে।
একদিন আমি সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছি, বাবা বসবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন—“কাল মির্চা এসেছিল?” আমার ভিতরটা ধ্বকধ্বক করে উঠেছে–হা ঈশ্বর কি শুনব এখন? “দাড়ি রেখেছেন, একমুখ দাড়ি। সন্ন্যাসী হয়েছেন, আমি তো চিনতেই পারি না। হাঃ হাঃ হাঃ।” আমি কোনো উত্তর না দিয়ে বাবার দিকে মুখ না ফিরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলাম। বাবা ডাকলেন—“রু, রু, সে দেশে চলে যাবে তার যে কিউরিওগুলো পড়ে আছে গাড়িতে তুলে দিস।” আমি ভাবছি কেন ও দাড়ি রাখল, এটা কি শোক? আমি তো কিছুই করতে পারলাম না। চুলও কাটা হল না। স্বার্থপর আমি স্বার্থপর।
মির্চা যখন একবার দার্জিলিঙে গিয়েছিল তখন সেখান থেকে খুব সুন্দর সুন্দর বড় বড় তিব্বতী কিউরিও এনেছিল, সেগুলো এখানেই সিঁড়ির তাকে সাজান ছিল—সে চিহ্নগুলো আমি দেখতাম। আজ নিজের হাতে সেগুলো গাড়িতে তুলে দিলাম। যাক, তাতে আমার দুঃখ নেই। কোনোও দিনই অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই আমি মূর্তিপূজক নই। অর্থাৎ কোনো বস্তু আমার কাছে ভাবের প্রতীক হয় না। ওর যে একটাও ছবি নেই আমার কাছে সেজন্য আমার দুঃখ হয় না। ছবি দিয়ে কি হবে? ছবি তো মানুষকে দেবে না।
বাবা যখন ওর একমুখ দাঁড়ির কথা বলছিলেন তখন আমার বুকের ভিতরটা থেঁতলে যাচ্ছিল—আমি ভাবছি বাবা হাসছেন কেন? তাহলেই কি ব্যাপারটা আমার কাছে হাস্যকর ছেলেমানুষী বলে মনে হবে? মনে দুঃখ পেলেই কি এভাবে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো সোজা কথা। মনে দুঃখ তো ছিলই, তার সঙ্গে আবার শরীরের দুঃখও যোগ হল। কিন্তু এ কাজে সে পারঙ্গম—নিজেকে কষ্ট দিতে তার জুড়ি নেই—নিজেকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই—হয়ত সেটা বোকামি, তবুও মানুষ সে কাজকে সম্মান করে, সতীদাহের মত ভয়াবহ জিনিস আর নেই তবু যখন ঠাকুমা বলতেন তাদের পূর্বপুরুষে একজন সতী হয়েছিলেন, তখন তাঁর মুখটা আলো হয়ে যেত। নিরাভরণ উপবাসজর্জর বৈধব্য ঠাট্টার বস্তু নয়। কিউরিওগুলো গাড়িতে তুলছি আর ভাবছি বাবা পারবেন কার জন্য নিজেকে কষ্ট দিতে, নিজেকে একটু বঞ্চিত করতে? অসম্ভব। কেন ওকে বিদ্রুপ করলেন—he jests at scars who never felt a wound! মহিমাময় শেক্সপীয়রের জ্ঞানচক্ষু আমার মধ্যে উন্মীলিত হল।।
আমাদের করুরই শরীর ঠিকমত ভালো হয়নি—তাই আবার আমরা বাইরে যাব। কাশীতে যাওয়া হবে। আমাকে তো আমি দেখতে পাচ্ছি না, আমার ধারণা আমি খুব স্বাভাবিকভাবে চলেছি, আর কেউ আমার মনোবিকার বুঝতে পারছে না। মনোবিকার! আবার কি! প্রেম-ট্রেম সব বাজে কথা। কিন্তু মার মনে শান্তি নেই—শান্তি না থাকার প্রধান কারণ মার নিজের ভিতরে! মা ভাবছেন তিনি আমায় বিয়ে দেবেন কি করে? আমি কি আর কোনো মানুষকে ভালোবাসতে পারব? না সেটা উচিত হবে? ভালোবাসা যে একটা বস্তু নয়, তা একজনের কাছ থেকে অপহরণ করে তবেই অন্যকে দিতে হয় তাও নয়, একথা তখন বোধ হয় ঠিকমত জানা ছিল না। মানুষ নিশ্চয় জানত, সমাজ জানত না। মা একদিন আমাকে বললেন, “রু তোরা কি কোনো বিবাহের মন্ত্র পাঠ করে কোনো অনুষ্ঠান করেছিলি?”
“মা তুমি আর একবারও জিজ্ঞাসা করেছিলে, আমি বলেছি তো তোমাকে ওসব আমাদের মনেও আসে নি।”
“তবে হাসপাতালে যে দিন পড়ে গিয়েছিলি, সেদিন ঐ মন্ত্র বলবি কেন?”
“কি মন্ত্র? মমব্রতে তে হৃদয়ং দধান?”
“না, না, ইংরেজী মন্ত্র।”
“ইংরেজি মন্ত্র! ওদের বিয়ে কি আমি দেখেছি কোনো দিন যে সে মন্ত্র জানব? কেন আমায় মিছিমিছি অপবাদ দেওয়া।”
“অপবাদ নয় রু, যদি বলেই থাকি আমায় বল না।”
