বই ফেলে বাবা উঠে পড়েছেন, “অসহ্য, অসহায় ওর এই গোয়ার্তুমি, ইচ্ছে করে পড়বে না।”
মা চুপ করে রইলেন। সেদিন বাবার উপর নয়, মার উপরই আমার অভিমান হয়েছিল। কারণ, বাবা যা ঠিক মনে করেছেন তাই করেছেন। মা যা ঠিক মনে করেছেন তা তো করতে পারছেন না। মা জবরদস্তির কাছে মাথা নিচু করেন, এ ভুলের খেসারত তাকে দিতে হয়েছিল। বাইরে বেরিয়ে অর্থাৎ বসবার ঘরে যেখানে আমি পড়তে বসেছিলাম সেখান থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে দেখি শান্তি দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার দিকে জল ভরা চোখে চাইল—“দেখ রু আমি আর এ বাড়িতে থাকব না।”
আমি ভাবছি আমাকে তো থাকতেই হবে কারণ সে তো আর আমার খোঁজই করল। আমি আর যাব কোথায়?
মধুপুরে গিয়ে কারুরই শরীর ভালো হল না। সেখানে পুকুরের জলে স্নান করে প্রত্যেকেই এক একরকম ব্যাধি সংগ্রহ করল, ভাইটির বয়স চার, তার সাংঘাতিক টাইফয়েড। সাবির যৌবনে প্রবেশের অসুখ, সেই সময়ে ও মানসিক আঘাত পেয়েছে আমার জন্য। তারপর আমি তো মাকে হয়রাণ করে ফেলেছি। মার কষ্টের চুড়ান্ত হচ্ছে—এর মধ্যে বাবা বললেন তার সব রকম পরীক্ষা করান দরকার সেজন্য হাসপাতালে কেবিন নিয়ে থাকবেন। মেডিকেল কলেজে কেবিন নেওয়া হল—বিরাট ঘর, তখনকার হাসপাতাল কি পরিচ্ছন্নই না ছিল, পাথরের মেঝে, ধপধপ করছে বিছানা, আসবাব চমৎকার। বাবার সব রকম পরীক্ষা হচ্ছে, শরীরে তো কষ্ট নেই, রাশি রাশি বই আসছে—পড়া হচ্ছে—সন্ধ্যেবেলা অগুনতি ভক্ত শিষ্য সমাবেশ—আড্ডা, গল্প, আলোচনা। খাবার হাসপাতালে যা দেয় ও বাড়ি থেকে যা নেওয়া হয় তা প্রচুর, অতিথিদের খাওয়ান চলে। কেবিনে আত্মীয়স্বজনকে থাকতে দেয়, মা তো আসতে পারেন না, আমি সারাদিন থাকি। মা এক টাইফয়েডের রুগী নিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন—তখনকার দিনে টাইফয়েড বড় ভয়ঙ্কর অসুখ ছিল। মাকে সাহায্য করবার কেই নেই শান্তি ছাড়া। আমি তো বাবার কাছে সারাদিন তার পরিচর্যা করছি।
একদিন হাসপাতালে বাবা আমাকে আস্তে আস্তে বললেন, “রু তুই আর কবিতা লিখবি না?” আমি চুপ করে রইলাম। আসলে আমি তখন কবিতা লিখছিলাম কিন্তু যা লিখতে চাই তা এত স্পষ্ট হয়ে পড়ে যে তাতে কোনো আড়াল থাকে না। অমন লেখা কি কাউকে দেখান যায়? সবাই যে মনের ভিতরটা দেখে ফেলবে। প্রায় একটা বই লেখা হয়েছিল—আমি শুনেছি ব্যক্তিগত জিনিসকে নৈর্ব্যক্তিক করে ভোলাই সাহিত্যের কাজ। আমার যা, তা সকলের হল, কিন্তু তা হচ্ছিল নাবড় নির্লজ্জ রকম আমার কথা হয়ে যাচ্ছিল। ঐ সময়কার একটা কবিতা আমার মনে আছে, আমি শেক্সপীয়রকে জিজ্ঞাসা করছিলাম—“তখন তুমি কোথায় ছিলে শেক্সপীয়র যখন আমি বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম? ওটা জানালা নয়, বারান্দা, তাতে তফাৎ কি? সে বাড়ি সামান্য একটা দোতলা ভাড়াটে বাড়ি, ধনীগৃহের অলিন্দ নয়, আর সে নিচে ছিল, রাস্তার উপরে, বাগানে নয়, সেখানে কোনো প্রাচীর ছিল না, কিন্তু একটা মাধবীলতা তো ছিল, বাগানে না হয় নাই হল। পাশে রাস্তা ছিল, কলকাতায় ঐ মলিন রাস্তায় ফুল ফোটে নি, তা নাই বা ফুটল—তাতেই কি ঘটনাটা তুচ্ছ হয়ে গেল? মহাকবি! আমি তো আশা করেছিলাম যে মুহূর্তে সে বিদায় নিচ্ছিল তুমি তাকে দেখেছ—তুমি আমার পিছনে ছিলে মণ্ডলীকৃত—প্রতিমার পিছনে যেমন চালচিত্র থাকে—আমি তো ভেবেছি আমার ঐ আহত প্রেমকে তুমি আবার প্রাণ দেবে! স্বর্ণমূর্তি কি জুলিয়েটকে অমর করতে পারে? আমি তাকে অমর করেছি বলে তুমি আমার ভক্ত হবে—আমার বন্দনা কর মহাকবি—আমার ঘরে এস—”
এ সব কবিতার চার-পাঁচ বছর পরে আমি ব্যুৎসব করেছি, কিন্তু আমি এখন জানি বাবাকে যদি তখনও দেখাতাম তিনি রাগ করতেন না, যে বস্তু লেখা হয়েছে তা যদি ভালো হয়ে থাকে তাহলে তা ঈশ্বর হয়ে গেছে—তখন কে লিখল, কেন লিখল তা নিয়ে তিনি মাথা ঘামাবেন না। আমার প্রেমে পড়ায় তার আপত্তি ছিল কিন্তু প্রেমের কবিতা লেখায় নয়! তখন বলবেন—“নানা অভিজ্ঞতা হওয়া ভালো। এ তো সব অবিদ্যা, মায়া, এই অবিদ্যার জগতের ভিতর দিয়েই তো জ্ঞানের জগতে পৌঁছতে হবে—অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীৰ্বা, বিদ্যয়াহমৃতণুতে”—জ্ঞানের অমৃত পানে বাবা সতত উন্মুখ—অবিদ্যার—জগতে সুখ-দুঃখকাতর যে মানুষ বাস করে তাদের জন্য তিনি তত ভাবিত নন—সবার উপরে মানুষ সত্য, এ তার জীবনের বাণী নয়।”
হাসপাতালে রুগী পরিচর্যা করতে যেতাম, করতামও। সারাদিন বাবাকে পড়ে শোনান, বিকালে যে সব অতিথি অভ্যাগত আসবে স্টোভে তাদের জন্য খাবার তৈরী করে রাখা ইত্যাদি কাজ করতাম। বাইরে থেকে এখন আমি স্বাভাবিক কিন্তু ভিতরটা কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না—সন্ন্যাসী হয়ে বনে বাদাড়ে বেড়াবার কথা ভাবলেই আমার বুক ভেঙে কান্না আসে—অনুশোচনায় জ্বলতে থাকি। আমার মনে হয় সাপে কামড়ে দেয় যদি তাহলে ওকে আমিই খুন করলাম। ও কি করে জঙ্গলে রয়েছে, ও তো সাহেব। ওদের কত ভালোভাবে থাকা অভ্যাস। বাবা সব সময় আমায় বলতেন, “একদিন অন্তর খাবার টেবিলের চাদর বদলে দিও রু যেন ঝোলের দাগটা না থাকে, ওরা ইয়োরোপে কত পরিচ্ছন্ন থাকে জানো?” এ সব কথা যখন মনে পড়ত তখন বাইরেটা স্বাভাবিক রাখতে হত বলেই ভিতরটা রক্তাক্ত হয়ে যেত। বাবার সামনে দুর্বলতা প্রকাশ করতে আমার লজ্জা বোধ হত। আত্মসম্মানে লাগত। তাই আমি খুব হাসিখুশি থাকতে চেষ্টা করতাম, তা সত্ত্বেও একদিন হাসপাতালেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম। ঠিক অব্যবহিত কারণটা কি ছিল মনে পড়ছে না, হয়ত ছিলই না কিছু। ডাক্তার বললেন, নার্ভাস ব্রেকডাউন হবার উপক্রম হয়েছে। মা তো ভেবেই অস্থির। বাবা বলতে লাগলেন, একটু মনের জোর করলেই ঠিক হয়ে যায়, তা করবে না তো কি হবে! ইচ্ছে করে এরকম করছে—আমায় জব্দ করবে। ডাক্তার যদি অন্য কেউ হতেন তবে বাবা তাকে ডাক্তারী বিষয়েই প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্ন করে ডাক্তারী শাস্ত্রে তার অজ্ঞতা প্রমাণ করে তার মাথা হেঁট করে দিতেন। কিন্তু ডাক্তার তো আর কেউ নয়, চিকিৎসক-শ্রেষ্ঠ নীলরতন সরকার যিনি রুগীর গন্ধ পেয়ে টাইফয়েড বা নিউমোনিয়া চিনে ফেলেন—যিনি ঘরে ঢুকলে মৃত্যুভীত অভয় পায়, আমাদের চিরশুভানুধ্যায়ী সেই ডাক্তার আমাকে আরোগ্য করলেন। সাত আট মাসের মধ্যে আমি সেরে উঠলাম। পরীক্ষাও দেওয়া হল, ফলও ভালই হল। রোগটা যখন সেরে গেল তখন আমার ভারি দুঃখ হতে লাগল, যেন যুদ্ধের প্রধান অস্ত্রটাই ভোতা হয়ে গেছে, আর লড়ব কি দিয়ে।
