“এই রকম করে পড়ে পড়ে কাঁদলেই চলবে? পরীক্ষা দেওয়া হবে না? ছুটকি পর্যন্ত পরীক্ষা দিচ্ছে। আশ্চর্য ব্যাপার! এত শোকের হয়েছেটা কি!” বাবা খুব জোরে জোরে বকছেন রীতিমত চীৎকার করে।।
মা তাড়াতাড়ি উঠে গেলেন। দরজার কাছ থেকে বাবাকে সরিয়ে বন্ধ দরজার দিকে নিয়ে গেলেন। ও দরজাটাও বন্ধ নয়, একটু ফাক আছে—আমি সব শুনতে পাচ্ছি। কারণ আমি উৎকর্ণ। মা বলছেন, “সব কিছু নিয়ে কি জবরদস্তি করা যায়? নিষ্ঠুরতার একটা সীমা আছে?”
“তাই বলে এরকম করে আমাদের চোখের সামনে জীবনটা নষ্ট করবে। পরীক্ষা দেবে না?”
“পরীক্ষা দেওয়াটা যদি অত দরকার মনে কর তবে স্কুল ছাড়ালে কেন? এ বছরেই হয়ে যেত পরীক্ষা।”
“বাঃ স্কুলে পড়াশুনো হয় নাকি—স্কুল গেলে ও এত সাহিত্য পড়তে পারত? সমস্ত রবীন্দ্রকাব্য ওর মুখস্ত। এম. এ. ক্লাসের ছেলেরাও অত পড়ে নি—এত কবিতা লিখতে পারত? হোম ওয়ার্ক দ্যান মাস্টারনীরা, হোম ওয়ার্ক! লাল কালি দিয়ে ‘গুড্’ ‘ব্যাড্’ অশ্বডিম্ব!”
“তাহলে তো হয়েছেই। পড়াশুনো তো করেছে। পরীক্ষা না হয় পরেই দেবে।” “না না তা হয় না, পরীক্ষা দিতে হবে-বাঃ, আমার মেয়ে পাশ করবে না? কি যে সর্বনাশ হয়ে গেল, কিছু হবে না, এত করে আমি ওকে তৈরী করছিলাম। সব আমার নষ্ট হয়ে গেল, ও আর কবিতা লিখবে না, পড়াশুনো করবে না, আমার আশা ভরসা সম্পূর্ণ নিমূল, তাহলে দেখে শুনে একটা বিয়েই দিয়ে দাও”, বাবা হাহাকার করে উঠলেন।
মা যেন ছোট শিশুকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, “আমায় একটু সময় দাও লক্ষ্মীটি। একটু সময় লাগবে। তোমার সব যেমন ছিলে আমি তেমনি করে দেব।”
“তুমি তো ঠিক ভাবে চলছ না। তুমি ওর মনটাকে বিমুখ কর! মেয়েকে বল, ওরা ইয়োরোপের নাগরিক, ওরা মৃগয়াপটু।”
“তা আমি কিছুতেই পারব না। বেচারা পরের ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার জন্য কিছু করতে না পারি অপবাদ দিতে পারব না।”
“ওকে এ কথা বললে তার কি ক্ষতি হবে? সে তো টেরও পাবে না। তার সঙ্গে কি আমি খারাপ ব্যবহার করতে বলছি? যুদ্ধ জিততে হলে বুদ্ধির ব্যবহার কর, খালি ভাবালুতায় হবে—nothing is wrong in love and war”
“আমার সে মত নয়। মন্দ যা তা মন্দই, বিবেকের বিরুদ্ধে আমার বুদ্ধি বড় হবে না।”
মা বাবার সঙ্গে কঠিন তর্ক করছেন। মা সব সময় তা করেন। মার নিজস্ব মত আছে কিন্তু তা প্রয়োগ করতে পারেন না। স্নেহের কাছে পরাভূত হয়ে যান।
মা বাবার তর্ক শুনছি কিন্তু কি আশ্চর্য আমার যন্ত্রণাবিদ্ধ মন বাবার কথাই গ্রহণ করেছে। ‘মৃগয়া’ ঠিকই বটে! নৈলে চিঠির উত্তর দিল না কেন? আমাকে জানালো না কেন আমি কি করব। ও তো পুরুষ মানুষ। আমার চেয়ে বড়। ও যদি না বলেকে আমার পথ ঠিক করে দেবে? তার মানে ও চায় না আমাকে আর। খেলা শেষ হয়ে গেছে। মৃগয়া!
একদিন বাবা আমাদের শকুন্তলা পড়াচ্ছিলেন, আমরা মাটিতে মাদুরে বসে আছি মাঝখানে বাবা। আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি। বাবার মুখে সংস্কৃত পড়া যে শোনে নি সে জানবে না কি তার অপূর্ব সৌন্দর্য। সংস্কৃত ভাষা তার সমস্ত মাধুর্য, ঐশ্বর্য নিয়ে কাব্যের অর্থকে শব্দার্থের থেকে ছাড়িয়ে মনের পর্বে পর্বে ঝঙ্কার তুলছে। বাবা বলছেন,—“ন খলু ন খলু বাণঃ সন্নিপাতেহয়মস্মিন্ মৃদুনি মৃগশরীরে তুলারাশাবিবাগ্নিঃ–”
“মৃগয়াপটু নাগরিক দুষ্মন্ত এসেছেন বনে শিকার করতে। বনের মৃগয়া সরল অসহায়, মৃদু অর্থাৎ কোমল—দুষ্মন্ত রথের উপর থেকে উদ্যতধনু, এখনই তিনি বাণ ছুঁড়বেন। বনবাসীরা এই নিষ্ঠুরতা করতে নিষেধ করছেন—তারা দুই হাত তুলে বলছেন, মেরো না, মেরো না বাণ—তুলার রাশিতে আগুন দিও না!’ এই বাণ কার? মদনের! এই মৃগ কে? শকুন্তলা। কুসুমতুল্যকোমলা, বলেও মনোজ্ঞা পুষ্পভরণা শকুন্তলা, অনভিজ্ঞ, সরলা-নাগরিকদের আচার আচরণ তিনি কিছুই জানেন না। তিনিই মৃগ। দুষ্মন্ত একটু পরেই তাকে শরবিদ্ধ করবেন। পুষ্পরাশিতে আগুন দেবেন। এখানে তারই পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে, এটা suggestive, যে ঘটনা পরে ঘটবে তারই আভাস দেওয়া হল।”
আমি ভাবছি, ভাবছি, ভাবছি, বাবা ঠিকই বলেছেন ‘মৃগয়া কিন্তু আমি সরলা তো নই নিশ্চয়ই। অভিজ্ঞতাও তো অনেক হল। এ শর আমি তুলে ফেলবই ফেলব।
পরের দিন আমি মাকে বললাম, “মা তুমি বাবাকে বল আমি পরীক্ষা দেব, এখনও তো তিন মাস আছে। সিলেবাস এনে দিন, যথেষ্ট সময় আছে।”
“যথেষ্ট বৈকি। ইচ্ছা হলে তোমার আর কতক্ষণ লাগবে।”
মার খুব আনন্দ হয়েছে—আমাকে খোশামোদ করছেন, “তোমার বাবা বলেন–কত সাধ করে নাম রেখেছি, ও জ্ঞানের অমৃত পান করবে, ব্রহ্মবাদিনী হবে। তোমার বাবার আশাটা পূর্ণ কর মা। সামান্য কারণে জীবনটা তছনছ করে ফেল না।”
প্রথম যেদিন বাবার কাছে পড়তে বসলাম সে দিনের অভিজ্ঞতা দুঃখজনক তো বটেই, আজকালকার দিনে অবিশ্বাস্য। বাবা আমাকে বলছেন, ‘অভূততভাবে ছির” কতকগুলি দৃষ্টান্ত লেখ। আমি মন দিতেই পারছি না। বাবা ঘোরাফেরা করে এসে বসলেন। আমি শূন্য খাতা হাতে নিয়ে শূন্যদৃষ্টিতে বসে আছি—যাকে ব্ৰহ্মর জ্বলে যাওয়া বলে বাবার হয়েছে তাই, এতটুকু একটা মেয়েকে বশে আনতে পারছেন না?
“কি হয়েছে কি? সব কি গুলে খেয়েছ? লিখছ না কেন? লেখা লেখ।” আমার হাত আরো অনড় হয়ে গেছে, কিছু তো মনে পড়ছেই না। হঠাৎ বাবা আমার গালের উপর প্রকাণ্ড এক চড় মারলেন। পঁচ আঙ্গুলের দাগ বসে গেল কিন্তু কি আশ্চর্য আমার ব্যথা লাগল না। মা ছুটে এলেন, “কি, ব্যাপার কি? এত বড় মেয়েকে তুমি মারলে?”
