খোকা তো আর আসেই না।
আমরা যেদিন মধুপুরে যাব সেদিন সে এল। আমাদের সঙ্গে স্টেশনে যাবে। জিনিসপত্র তুলতে সাহায্য করবে।
আমি ওকে একটু একা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—“খোকা তুমি আর আস না কেন ভাই? অন্তত তোমার সঙ্গে একটু ওর কথা তো বলতে পারি।”
খোকা নীরব। “কেন আস না, বল না?”
“আমি তোমার এত কষ্ট দেখতে পারি না রু, মানুষের তো সহ্যশক্তির একটা সীমা আছে।”
“কিন্তু তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলে আমার কষ্ট তো কমে। ও কি করছে এখন?”
“ও তো এখানে নেই, হিমালয়ে চলে গেছে।”
“হিমালয়ে! দার্জিলিং বল?”
“না না হিমালয়ে, দার্জিলিং নয় ঋষিকেশ—ও সন্ন্যাসী হয়ে গেছে।”
“সন্ন্যাসী হয়েছে? সে আবার কি? সন্ন্যাসী হওয়া কাকে বলে? তাই জন্যই কি চিঠির উত্তর দিচ্ছে না?”
ট্রেনে উঠে আমি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছি। এই অদ্ভুত খবরটার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছি না। কোথায় আমায় চিঠি লিখবে—একটা পরামর্শ করবে—তা নয় হিমালয় চলে গেল। আমি কাঁদছি। বাবা মা দুজনেই বুঝতে পারছেন আমি কাঁদছি। নিজেরা আস্তে আস্তে কথা বলছেন—ভাইবোনদের খাওয়াচ্ছেন শোয়াচ্ছেন, অবশ্য এ সব কাজ মা একলাই করছেন বাবা তো একেবারে শিশু, জীবনে বোধহয় নিজে এক গ্লাস জলও গড়িয়ে খান নি। কাঁদতে কাঁদতে আস্তে আস্তে আমার চোখের জল শুকিয়ে গেছে—যন্ত্রণা কমে এসেছে—দুঃখদহনের একটা অলৌকিক তৃপ্তি আছে তা আমার মনকে ঘুম পাড়িয়ে ফেলছে—আমি সেই স্তিমিত জগতে হঠাৎ শুনতে পেলাম বাবা মাকে বলছেন, “ওর দিকের জানালাগুলো বন্ধ করে দাও, যদি লাফ দিয়ে পড়ে।” তখন জানালায় রেলিং থাকত না। আমি মনে মনে ভাবছি অমন কাজ কখনো করব না—জীবন সুন্দর ও দুঃখও সুন্দর—এই জীবন আলোর মত জ্বলবে—‘বিরহানলে জ্বালোরে তারে জ্বালো’—এইবার এই গানটার অর্থ বুঝতে পেরেছি।
মধুপুরের বাড়িটা সুন্দর, চারদিকে খোলা প্রকৃতি, এখানে এসে শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। ওরও হয়ত হিমালয়ে গিয়ে ভালই লাগছে। প্রকৃতি আমাদের সেবা করে নিঃশব্দে—প্রকৃতি মার মতো। আমার সঙ্গে মাও আছেন। ওর কেউ নেই, ও একেবারে একা। একদিন পুকুরের ঘাটে বসে মা আমাকে আস্তে আস্তে বললেন—“মনটাকে ঠিক করে নাও রু——ওরসঙ্গে তোমার আর কোনো দিনও দেখা হবে না।”
“কেন মা, কেন মা?”
“তোমার নিষ্ঠুর বাবা ওকে দিয়ে ভীষণ করে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছেন যে তোমার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবে না।”
আমি তো মিশনারীদের স্কুলে পড়েছি—’নান’-দের ‘ভাউ’ নেবার কথা শুনেছি, আমার তাই হাসি পেল—“ও প্রতিজ্ঞা রাখবে কেন? ও কি ‘নান’ নাকি?”
কিন্তু কোনোদিনও দেখা হবে না, কথাটা মনের ভিতর ঘুরতেই লাগল একটা দীর্ঘশ্বাসকে পাক দিয়ে দিয়ে—যার নাম হাহাকার।
আমরা মধুপুরে থাকতে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের গল্প খুব হত, সম্ভবত সেই সময়ে ঘটনাটা ঘটল, তাছাড়া যাদের বাড়িতে ছিলাম তাঁরা এবং আমরাও ঐ ঘটনার স্থানটির সঙ্গে এবং পাত্রদের সঙ্গে বিশেষ পরিচিত। যে পাহাড়তলীতে যুদ্ধটা হল সে আমাদের চেনা জায়গা—ঐ সব ছেলেরা আমাদের বয়সী। তাই তাদের এই অসম সাহসে আমরা গর্বিত। বাবা যখন বলতে লাগলেন এরকম পাগলামির কোনো অর্থ হয় না, তখন আমরা খুব তর্ক করলাম। এর ফলাফলে স্বাধীনতা কতটা এগুবে তা কে জানে কিন্তু ওরা নিজেরা তো এগোল, এত বড় একটা কাজ করাই কি কম কথা? আমি ভাবছি এরকম একটা বড় কাজের মধ্যে যদি আমি যেতে পারতাম তাহলে আমার দুঃখটা নিশ্চয় চলে যেত। কিন্তু আমার যে কোনো উপায় নেই নিজের কোনো পথ খুঁজে নেবার। ওরা দেশকে স্বাধীন করতে চায়, মানুষকে স্বাধীন করবে কে? আমাকে, আমার মাকে? পুকুরের ধারে বসে আমি ভাবতাম যদি কোনোদিন সুযোগ পাই এই সমাজের সব সঙ্কীর্ণ নিয়মগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। আমি না হয় ছোট, মার পরাধীনতাই আমার খারাপ লাগছে বেশি। নিজের মেয়ের সম্বন্ধে তার কোনো অধিকার নেই। আমি জানি মার কতটা খারাপ লেগেছে। মা এই প্রেমকে সম্মান করছেন কিন্তু তাঁর উপায় নেই।
আমি যখন উনিশ শ ত্রিশ সালের কথা ভাবি তখন জানি বলেই ঐ বিশেষ বছরটা চিহ্নিত করতে পারি, নৈলে আমার অনুভূতিতে সাল তারিখ নেই। দিন বছর মাস সব অর্থহীন, আকাশে যেমন দিকচিহ্ন নেই, সীমাবদ্ধ পৃথিবীকে দিয়েই দিকের অর্থ বুঝতে হয়, তেমনি মহাকালে প্রবিষ্ট যে সব অনুভূতি তারও সন তারিখ, সকাল সন্ধ্যা নেই। তার বিপুল ব্যাপ্তি নিয়ে সে তখন ক্ষণকালিক উপস্থিতিকে অতিক্রম করে যায়, তখন দূরেও যা কাছেও তা। চলাও যা, না চলাও তাই—তদূরে তদ্বন্তিকে তদেজতি তন্নৈজতি।
আমি তাই ঠিক বলতে পারব না সেটা কবে এবং কোনদিন, মধুপুরে যাবার আগে কি পরে—কারণ আমি যেন একটা পড়া বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে যে ঘটনাটা পাতার ডান দিকে দেখব ভেবেছিলাম সেটা বয়ে দেখেছি। এরকম তো হয়।
আমার ঘরে আমি শুয়ে আছি। মা বসে বসে গল্প করছেন, গল্পের বিষয়বস্তু বাবার অসুখ। বাবার অসুখটা যে কত সাংঘাতিক তাই বলে মা আমার মনটাকে তার প্রতি অনুকূল করতে চাইছেন। বাবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা একটুও কমে নি, ভালোবাসা তো নয়ই। তবু বাবার অসুখ নিয়ে মা এত ব্যস্ত কিন্তু মার অসুখ হলে বাবাও গ্রাহ্য করেন না, মাও না, এটা কি রকম? কাজেই আমি মার কথায় সায় দিচ্ছি না। মা আমার বিমুখ মনের ভাব বুঝতে পেরে বিপন্ন বোধ করছেন, এমন সময় বাবার পায়ের শব্দ শোনা গেল, তিনি দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। বাবার চোখ খুব বড় বড়, খঙ্গনাসা, রং উজ্জ্বল তাম্রবর্ণ, রাগ হলে তা লাল হয়ে যায় আরো বেশি। এখন বাবার মুখ লাল।
